
বৃষ্টি মহান আল্লাহর অন্যতম শ্রেষ্ঠ নিয়ামত। এর মাধ্যমে মৃত ভূমি প্রাণ ফিরে পায়, ফসল উৎপন্ন হয় এবং মানুষ ও অন্যান্য প্রাণীর জীবনধারণের উপকরণ নিশ্চিত হয়। পবিত্র কোরআনে মহান আল্লাহ বলেন, "আকাশ থেকে আমি বর্ষণ করি কল্যাণকর বৃষ্টি এবং তা দ্বারা আমি সৃষ্টি করি উদ্যান ও উদগত করি শস্য।" (সুরা কাফ: ৯)
তবে কখনো কখনো এই রহমতের বৃষ্টি অতিবৃষ্টি, বন্যা কিংবা জলাবদ্ধতার কারণ হয়ে মানুষের জন্য দুর্ভোগ ও পরীক্ষার পরিস্থিতি সৃষ্টি করে। ইসলাম এমন পরিস্থিতিতে একজন মুমিনের জন্য কিছু গুরুত্বপূর্ণ করণীয় নির্দেশ করেছে।
১. ধৈর্য ধারণ করা অতিবৃষ্টিকে আল্লাহর পরীক্ষা হিসেবে গ্রহণ করতে হবে। মহান আল্লাহ বলেন, ‘আর আমি অবশ্যই তোমাদের পরীক্ষা করব কিছু ভয়, ক্ষুধা এবং জান-মাল ও ফল-ফলাদির স্বল্পতার মাধ্যমে। আর তুমি ধৈর্যশীলদের সুসংবাদ দাও।’ (সুরা : বাকারা, আয়াত : ১৫৫)
অতএব অতিবৃষ্টিতে কোনো মুমিনের ঘরবাড়ি, ফসল বা সম্পদের ক্ষতি হলে তার করণীয় হলো, ধৈর্য ধারণ করা এবং আল্লাহর কাছে উত্তম প্রতিদানের আশা রাখা। কেননা মুমিনের কোনো অবস্থাই প্রকৃতপক্ষে তাকে লোকসানে ফেলতে পারে না।
হাদিস শরিফে ইরশাদ হয়েছে, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, মুমিনের অবস্থা ভারি অদ্ভুত। তার সমস্ত কাজই তার জন্য কল্যাণকর। মুমিন ছাড়া অন্য কারো জন্য এ কল্যাণ লাভের ব্যবস্থা নেই। তারা আনন্দ (সুখশান্তি) লাভ করলে শুকরিয়া জ্ঞাপন করে, তা তার জন্য কল্যাণকর হয়, আর দুঃখকষ্টে আক্রান্ত হলে ধৈর্যধারণ করে, এও তার জন্য কল্যাণকর হয়। (মুসনাদে আহমাদ, হাদিস : ২২৮৪৮)
২. দোয়া করা বৃষ্টি শুরু হলে রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর শেখানো দোয়া পড়া সুন্নত। তিনি বৃষ্টি নেমে এলে বলতেন, ‘আল্লাহুম্মা সইয়্যিবান নাফিআ’ অর্থ: ‘হে আল্লাহ! মুষধারায় কল্যাণকর বৃষ্টি দাও।’ (বুখারি, হাদিস : ১০৩২)
আর যদি অতিবৃষ্টির কারণে মানুষের ক্ষতির আশঙ্কা দেখা দিত, তখন তিনি এই দোয়া করতেন, ‘আল্লাহুম্মা হাওয়ালাইনা ওয়া লা আলাইনা, আল্লাহুম্মা আলাল আকামি ওয়াজ জিরাবি, ওয়া বুত্বনিল আউদিয়াতি ওয়া মানাবিতিশ শাজার।’ অর্থ : ‘হে আল্লাহ! আমাদের আশপাশে, আমাদের ওপর নয়। হে আল্লাহ! টিলা, মালভূমি, উপত্যকায় এবং বনভূমিতে বর্ষণ করুন।’ (বুখারি, হাদিস : ১০১৪)
৩. মানুষের পাশে দাঁড়ানো বিপদে মানুষের পাশে দাঁড়ানো মুমিনের অন্যতম দায়িত্ব। অতিবৃষ্টিতে অনেক মানুষ খাদ্য, আশ্রয় ও চিকিৎসা সংকটে পড়ে। এ সময় সাধ্যমতো প্রতিবেশী, আত্মীয়-স্বজন ও অসহায় মানুষের সাহায্যে এগিয়ে আসা ইসলামের গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা। এটিও মহান আল্লাহর রহমত ও সাহায্যপ্রাপ্তির একটি মাধ্যম। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, বান্দা যতক্ষণ তার ভাইয়ের সাহায্যে থাকে, আল্লাহও ততক্ষণ তার বান্দার সাহায্য করেন। (আবু দাউদ, হাদিস : ৪৯৪৬)
৪. সংকট নিরসনে স্বেচ্ছাসেবক হওয়া যাদের মহান আল্লাহ সুস্থতা ও শক্তি-সামর্থ্য দিয়েছেন, বিশেষ করে যুবসমাজ, তাদের উচিত— জনসাধারণের দুর্ভোগ কমাতে স্বেচ্ছাসেবী উদ্যোগ। প্রয়োজনে নিজেদের উদ্যোগে রাস্তায় পড়ে থাকা গাছ সরানো, ড্রেন পরিষ্কার করা, জলাবদ্ধতা নিরসনে সহযোগিতা করা কিংবা ঝুঁকিপূর্ণ স্থান থেকে মানুষকে নিরাপদে পৌঁছে দেওয়া। মানুষের কষ্ট লাঘবে আত্মনিয়োগ করা মহান আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভে সহায়ক হয়। আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত একটি হাদিসে এসেছে, মহানবী (সা.) বলেছেন, ‘আমি এক ব্যক্তিকে জান্নাতে ঘোরাফেরা করতে দেখলাম। যে (পৃথিবীতে) রাস্তার মধ্য থেকে একটি গাছ কেটে সরিয়ে দিয়েছিল, যেটি মুসলিমদের কষ্ট দিচ্ছিল।’ (সহিহুল জামে)
৫. গুজব ও বিভ্রান্তিকর তথ্য থেকে দূরে থাকা দুর্যোগের সময় গুজব ছড়িয়ে আতঙ্ক সৃষ্টি করা কিংবা যাচাই-বাছাই ছাড়া তথ্য প্রচার করা ইসলামে নিষিদ্ধ। পবিত্র কোরআনে মহান আল্লাহ বলেন, হে ঈমানদাররা! যদি কোনো পাপাচারী ব্যক্তি তোমাদের কাছে কোনো সংবাদ নিয়ে আসে, তবে তোমরা তা ভালোভাবে যাচাই করে নেবে, যেন অজ্ঞতাবশত কোনো সম্প্রদায়ের ক্ষতি না করে বসো। (সুরা হুজুরাত: ৬)
অতিবৃষ্টি ও প্রাকৃতিক দুর্যোগ মানুষকে স্মরণ করিয়ে দেয় যে প্রকৃত ক্ষমতার মালিক একমাত্র মহান আল্লাহ। তাই এমন পরিস্থিতিতে বেশি বেশি তাওবা, ইস্তিগফার, দোয়া, আল্লাহর ওপর তাওয়াক্কুল এবং মানবসেবায় আত্মনিয়োগ করাই একজন প্রকৃত মুমিনের দায়িত্ব। মহান আল্লাহ আমাদের সবাইকে তাঁর নির্দেশনা অনুযায়ী আমল করার তাওফিক দান করুন। আমিন।
মন্তব্য করুন