
ইসলামে বোরকা ও হিজাব মুমিন নারীর পর্দার গুরুত্বপূর্ণ অংশ। তবে শুধু বোরকা বা হিজাব পরিধান করলেই পর্দার বিধান পূর্ণাঙ্গভাবে পালন হয় না। কোরআন ও সুন্নাহর নির্দেশনা অনুযায়ী পর্দা কেবল পোশাকের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; বরং দৃষ্টি, আচরণ, কথাবার্তা, চলাফেরা এবং সামগ্রিক শালীন জীবনযাপনের সঙ্গে এর গভীর সম্পর্ক রয়েছে।
ইসলামী শিক্ষায় বলা হয়েছে, কিছু সাধারণ ভুলের কারণে বোরকা-হিজাব পরিধান করেও পর্দার মূল উদ্দেশ্য ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। নিচে এমন সাতটি বিষয় তুলে ধরা হলো।
১. দৃষ্টি আকর্ষণকারী বোরকা বা হিজাব পরা পর্দার অন্যতম উদ্দেশ্য হলো সৌন্দর্য ও সাজসজ্জা গোপন রাখা। পবিত্র কোরআনে বলা হয়েছে— তারা যেন তাদের সৌন্দর্য প্রকাশ না করে, তবে যা সাধারণত প্রকাশমান, তা ছাড়া। (সুরা নূর: ৩১)
এ কারণে অতিরিক্ত ঝলমলে, ভারী কারুকাজযুক্ত, চকচকে পাথর বসানো বা অত্যন্ত উজ্জ্বল রঙের বোরকা ও হিজাব, যা মানুষের দৃষ্টি আকর্ষণ করে, পর্দার মূল উদ্দেশ্যের সঙ্গে সাংঘর্ষিক হতে পারে। তাফসিরবিদদের মতে, পোশাক এমন হওয়া উচিত নয় যা নিজেই প্রদর্শনের বস্তু হয়ে ওঠে।
২. আঁটসাঁট বা পাতলা পোশাক ব্যবহার সহিহ মুসলিমের একটি হাদিসে রাসুলুল্লাহ (সা.) এমন নারীদের সম্পর্কে সতর্ক করেছেন, যারা পোশাক পরিধান করেও কার্যত উলঙ্গের মতো থাকে।
ইসলামী চিন্তাবিদদের ব্যাখ্যা অনুযায়ী, এমন পোশাক যা শরীরের গঠন স্পষ্টভাবে ফুটিয়ে তোলে অথবা স্বচ্ছ হওয়ার কারণে শরীর দৃশ্যমান হয়, তা পর্দার বিধানের পরিপন্থী। তাই বোরকা ও হিজাব এমন হওয়া উচিত, যা শরীর যথাযথভাবে আবৃত রাখে।
৩. সুগন্ধি ব্যবহার করে বাইরে বের হওয়া হাদিসে এসেছে, কোনো নারী যদি সুগন্ধি ব্যবহার করে এমনভাবে জনসমাজে চলাফেরা করেন যাতে তার সুগন্ধ মানুষের দৃষ্টি বা মনোযোগ আকর্ষণ করে, তাহলে সে বিষয়ে কঠোর সতর্কতা রয়েছে। (আবু দাউদ: ৪১৭৩)
তাই বাইরে যাওয়ার সময় এমন সুগন্ধি ব্যবহার থেকে বিরত থাকার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে, যা গায়রে মাহরামের দৃষ্টি আকর্ষণের কারণ হতে পারে।
৪. হিজাবের ভেতরে চুল উঁচু করে বাঁধা বর্তমানে অনেক নারী হিজাবের ভেতরে চুল উঁচু করে এমনভাবে বাঁধেন, যাতে মাথার আকৃতি উঁচু দেখায়।
সহিহ মুসলিমে বর্ণিত একটি হাদিসে এমন নারীদের উল্লেখ রয়েছে, যাদের মাথা উটের হেলানো কুঁজের মতো হবে। বহু আলেম এই হাদিসের ব্যাখ্যায় বলেছেন, ইচ্ছাকৃতভাবে মাথার ওপর চুল উঁচু করে আকর্ষণীয় আকৃতি তৈরি করা পর্দার শালীনতার চেতনার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।
৫. গায়রে মাহরামের সামনে শিথিল আচরণ করা পর্দা শুধু পোশাকের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘তোমরা কথাবার্তায় কোমলতা অবলম্বন করো না, যাতে যার অন্তরে ব্যাধি আছে সে প্রলুব্ধ হয়।’ (সুরা আহজাব: ৩২)
অতএব বোরকা-হিজাব পরার পাশাপাশি কথাবার্তা, হাসি-ঠাট্টা, অঙ্গভঙ্গি ও আচরণেও শালীনতা বজায় রাখা জরুরি।
৬. দৃষ্টি ও চলাফেরায় পর্দার চেতনা বজায় না রাখা আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন, ‘মুমিন নারীদের বলুন, তারা যেন তাদের দৃষ্টি সংযত রাখে এবং নিজেদের পবিত্রতা রক্ষা করে।’ (সুরা নূর: ৩১)
একই আয়াতে আরও বলা হয়েছে, ‘তারা যেন এমনভাবে পদক্ষেপ না করে, যাতে তাদের গোপন সৌন্দর্য প্রকাশ পায়।’ (সুরা নূর: ৩১)
অর্থাৎ পর্দা শুধু শরীর ঢাকার নাম নয়; দৃষ্টি, চলাফেরা ও ব্যক্তিত্বেও শালীনতা প্রকাশ পাওয়া উচিত।
৭. সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পর্দার সীমা অমান্য করা অনেক নারী বাস্তবে বোরকা-হিজাব পরলেও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নিজের সাজসজ্জা, ছবি বা ব্যক্তিগত বিষয় এমনভাবে প্রকাশ করেন, যা পর্দার উদ্দেশ্যের পরিপন্থী হতে পারে। ইসলাম লজ্জাশীলতাকে অত্যন্ত গুরুত্ব দিয়েছে। রাসুলুল্লাহ (স.) বলেছেন, ‘লজ্জা ঈমানের অংশ।’ (সহিহ বুখারি)
তাই বাস্তব জীবনের মতো অনলাইন জগতেও পর্দা ও শালীনতার নীতিমালা মেনে চলা উচিত।
বোরকা-হিজাব ইসলামী পর্দার গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলেও এর মূল লক্ষ্য কেবল নির্দিষ্ট পোশাক পরিধান নয়। বরং আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন, আত্মমর্যাদা রক্ষা, নৈতিকতা প্রতিষ্ঠা এবং শালীন জীবনযাপনই পর্দার প্রকৃত উদ্দেশ্য।
ইসলামী শিক্ষার আলোকে একজন মুসলিম নারীর উচিত পোশাকের পাশাপাশি দৃষ্টি, আচরণ, কথাবার্তা, চলাফেরা এবং দৈনন্দিন জীবনযাপনের প্রতিটি ক্ষেত্রে পর্দার চেতনা ধারণ করা। কোরআন ও সুন্নাহর নির্দেশনা অনুযায়ী পর্দা পালন করলে তা ইবাদত হিসেবে গণ্য হয় এবং ব্যক্তি, পরিবার ও সমাজে পবিত্রতা, নিরাপত্তা ও নৈতিক মূল্যবোধ প্রতিষ্ঠায় ইতিবাচক ভূমিকা রাখে।
মন্তব্য করুন