
ইসলামের গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত ও পঞ্চস্তম্ভের অন্যতম হজ পালনের মাস হলো জিলহজ। এই মাসের প্রথম ১০ দিন মুসলিম উম্মাহর জন্য অত্যন্ত ফজিলতপূর্ণ ও বরকতময়। পবিত্র কোরআন ও হাদিসে এ সময়ের বিশেষ মর্যাদা বর্ণিত হয়েছে। আল্লাহ তাআলা এই দশকের রাতগুলোর শপথ করে বলেন, “শপথ প্রত্যুষের এবং দশ রাতের।” (সূরা ফাজর: ১-২)
তাফসিরবিদদের মতে, এখানে ‘দশ রাত’ বলতে জিলহজের প্রথম ১০ দিনকে বোঝানো হয়েছে। এছাড়া সূরা হজে আল্লাহ তাআলা নির্দিষ্ট দিনগুলোতে তাঁর নাম স্মরণের নির্দেশ দিয়েছেন, যা এ মাসের প্রথম দশকের গুরুত্ব আরও বাড়িয়ে দেয়।
হজরত ইবনে আব্বাস (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, “জিলহজের প্রথম ১০ দিনের আমলের চেয়ে আল্লাহর কাছে অধিক প্রিয় আর কোনো আমল নেই।” (সহিহ বুখারি ও তিরমিজি)
এমনকি আল্লাহর পথে জিহাদের চেয়েও এই দিনের নেক আমল অধিক প্রিয় বলে হাদিসে উল্লেখ করা হয়েছে, যদি না কেউ জীবন ও সম্পদ উৎসর্গ করে শহীদ হয়ে যায়।
জিলহজের প্রথম ১০ দিনের গুরুত্বপূর্ণ আমল ১. বেশি বেশি নেক আমল করা এই দশ দিনে অত্যধিক আমলে সালেহ তথা উত্তম আমল করা। কেননা, এ দিনগুলোতে যে আমল করা হয়, তা আল্লাহ তাআলার নিকট অন্য যেকোনো দিনের আমলের চেয়ে অধিক প্রিয়। জিকির, কোরআন তিলাওয়াত, নফল নামাজ ও নফল-রোজা সবই এর অন্তর্ভুক্ত।
২. তওবা ও ইস্তিগফার করা জিলহজ যেহেতু গুনাহ মাফের মাস, তাই বিগত জীবনের ভুলের জন্য আল্লাহর কাছে একনিষ্ঠভাবে তওবা করা উচিত। তওবা হলো পাপকর্ম থেকে ফিরে এসে আল্লাহর কাছে আন্তরিক ক্ষমা প্রার্থনা করা এবং পুনরায় সেই গুনাহ না করার দৃঢ় অঙ্গীকার করা। এটি একজন মুমিনকে নিষ্পাপ ও নিষ্কলুষ জীবনের পথে অনুপ্রাণিত করে। আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেছেন, ‘তোমরা তোমাদের রবের কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করো। অতঃপর তাঁর কাছেই ফিরে এসো। নিশ্চয়ই তোমার রব অতি দয়ালু ও অধিক মমতাময়।’ (সুরা হুদ: ৯০)
৩. অধিক পরিমাণে জিকির করা এই দিনগুলোতে অধিক পরিমাণে জিকির করা উচিত। বিশেষত, লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ, আল্লাহু আকবার ও আলহামদুলিল্লাহ পাঠে নিমগ্ন হওয়া চাই।
আল্লাহর নবী সা. হাদিসে ইরশাদ করেন, ‘আল্লাহ তায়ালার নিকট জিলহজের প্রথম দশকের আমলের চেয়ে অধিক মহৎ ও প্রিয় আমল আর নেই। সুতরাং তোমরা এ দিনগুলোতে বেশি বেশি ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ’ ‘আল্লাহু আকবার’ ও ‘আলহামদুলিল্লাহ’ পড়। (মুসনাদে আহমাদ, হাদিস : ৫৪৪৬)
৪. নখ-চুল ও পশম ইত্যাদি না কাটা জিলহজের চাঁদ ওঠার পর এই দশ দিন কোরবানি আদায় করা পর্যন্ত শরীরের কোনো প্রকার চুল-পশম ও নখ না কাটা মুস্তাহাব। এ বিষয়ে বর্ণিত সকল হাদিস এবং সাহাবায়ে কেরাম ও তাবেয়িদের আমল থেকে প্রতীয়মান হয় যে, যারা কোরবানি করবেন এবং যারা সামর্থ্যের অভাবে কোরবানি করবেন না- সবার জন্যই এই আমল করা উত্তম।
তবে যে ব্যক্তি কোরবানি করবে, তার জন্য এ আমলটি তুলনামূলক অত্যাধিক গুরুত্ব রাখে।
আল্লাহর নবী সা. বলেন, ‘যখন তোমরা জিলহজের চাঁদ দেখতে পাও এবং তোমাদের কেউ কোরবানি করতে চায়, সে যেন— তার চুল ও নখ কাটা থেকে বিরত থাকে। (মুসলিম, হাদিস : ১৯৭৭)
অন্য হাদিসে এসেছে, রাসুলুল্লাহ (সা.) এক ব্যক্তিকে বললেন- আমাকে কোরবানির দিন ঈদ পালনের আদেশ করা হয়েছে, যা আল্লাহ এ উম্মতের জন্য নির্ধারণ করেছেন। লোকটি বলল, হে আল্লাহর রাসুল! যদি আমার কাছে শুধু একটি মানিহা থাকে (অর্থাৎ অন্যের থেকে নেওয়া দুগ্ধ দানকারী উটনী) আমি কি তা দিয়ে কোরবানি করব? নবীজি (সা.) বললেন- না, তবে তুমি নখ, চুল ও মোঁচ কাটবে এবং নাভির নীচের পশম পরিস্কার করবে। এটাই আল্লাহর দরবারে তোমার পূর্ণ কোরবানি বলে গণ্য হবে। (সহিহ ইবনে হিব্বান, হাদিস : ৭৭৩, ৫৯১৪)
এমনকি সাহবায়ে কেরাম ও তাবেয়িরাও এ দিনগুলোতে শিশুদের চুল-নখ কাটা অপছন্দ করতেন। আবদুল্লাহ ইবনে উমর (রা.) এক নারীর পাশ দিয়ে অতিক্রম করছিলেন। ওই নারী জিলহজের দশকে ছেলের চুল কেটে দিচ্ছিলেন। তখন তিনি বললেন, সে যদি কোরবানির দিন পর্যন্ত অপেক্ষা করত— অনেক ভালো হতো। (মুস্তাদরাকে হাকিম, হাদিস : ৭৫৯৫)
৫. প্রথম দিন থেকে নবম দিন রোজা সম্ভব হলে জিলহজের প্রথম তারিখ থেকে নয় তারিখ পর্যন্ত রোজা রাখা। বা এরমধ্যে যে কয়দিন সম্ভব হয়— রোজা রাখা। তবে নয় তারিখ অর্থাৎ, ঈদের আগের দিন অবশ্যই রোজা রাখার চেষ্টা করা। কেননা এই এক দিনের রোজার ফলে এক বছর আগের ও এক বছর পরের মোট দুই বছরের গোনাহ মাফ করে দেওয়া হয়।
আল্লাহর নবী সা. বলেন, ‘আমি আশা করি, আরাফার দিন অর্থাৎ জিলহজের নয় তারিখের রোজার ফলে— আল্লাহ তাআলা এক বছর আগের ও এক বছর পরের গোনাহ মাফ করে দেবেন। (মুসলিম, হাদিস : ১১৬২)
জিলহজের প্রথম নয় দিন— রোজা রাখার বিষয়ে একাধিক হাদিস বর্ণিত হয়েছে, যেগুলো সনদের বিচারে দুর্বল হলেও মুহাদ্দিসগণ এ গুলোকে সমষ্টিগতভাবে আমলযোগ্য বলেছেন। (লাতায়িফুল মাআরিফ; ইমাম ইবনে রজব হাম্বলি, পৃষ্ঠা : ৩৫২-৩৫৩ )
৬. সামর্থ্যবান হলে হজ করা হজ ইসলামের পঞ্চম স্তম্ভ এবং একটি শারীরিক ও আর্থিক ইবাদত। জিলহজ মাসেই ইসলামের এই মহান রুকনটি পালন করতে হয়। সামর্থ্যবান ব্যক্তির ওপর জীবনে একবার হজ করা ফরজ। হজের মাধ্যমে মানুষ পাপমুক্ত হয়ে নতুন জীবনের প্রেরণা পায়। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘মাবরুর হজ তথা কবুল হজের প্রতিদান জান্নাত ছাড়া আর কিছুই নয়।’ (সহিহ বুখারি: ১৭৭৩)
৭. আরাফার দিনের রোজা জিলহজের প্রতিটি দিন গুরুত্বপূর্ণ হলেও ৯ জিলহজ অর্থাৎ আরাফার দিনটি বিশেষভাবে ফজিলতপূর্ণ। এ দিনে দোয়া-দরুদ ও ইবাদতে মশগুল থাকা উচিত। বিশেষ করে এ দিন রোজা রাখার গুরুত্ব অপরিসীম। রাসুলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেছেন, ‘আরাফার দিনের রোজার বিষয়ে আমি আল্লাহর কাছে প্রত্যাশা রাখি যে তিনি এর মাধ্যমে বিগত এক বছর এবং আগামী এক বছরের গুনাহসমূহ ক্ষমা করে দেবেন।’ (সহিহ মুসলিম: ১১৬২)
৮. তাকবিরে তাশরিক পাঠ জিলহজের নয় তারিখ ফজরের নামাজের পর থেকে তের তারিখ আসরের নামাজ পর্যন্ত প্রত্যেক ফরজের পর পুরুষদের জন্য উচ্চস্বরে আর মহিলাদের জন্য নিম্নস্বরে তাকবিরে তাশরিক পড়া ওয়াজিব।
পুরুষরা ঈদের নামাজে যাওয়ার সময়ও উচস্বরে তাকবিরে তাশরিক পাঠ করবে। তাকবিরে তাশরিকের জন্য বিভিন্ন শব্দ হাদিস শরিফে উল্লেখিত হয়েছে। তার মধ্যে সর্বোত্তম ও সর্বজনবিদিত পাঠ হলো এই—
الله أكبر، الله أكبر، لا إله إلا الله، و الله إكبر، الله أكبر، و لله الحمد
উচ্চারণ : আল্লাহু আকবার, আল্লাহু আকবার; লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু ওয়াল্লাহু আকবার, আল্লাহু আকবার; ওয়া লিল্লাহিল হামদ। (মুসান্নাফে ইবনে আবি শায়বাহ, হাদিস : ৫৬৯৬-৫৬৯৯; সুনানু ইবনিল মুনযির : ৪/৩৪৯)
৯. গুনাহ থেকে বেঁচে থাকা পবিত্র এই দিনগুলোতে ইবাদতের সওয়াব যেমন বেশি, গুনাহের লিপ্ত হওয়াও তেমনি ভয়াবহ। পরকালীন মুক্তি ও জান্নাত লাভের প্রধান শর্ত হলো পাপাচার বর্জন করা। আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেছেন, ‘তোমরা প্রকাশ্য ও গোপন সকল গুনাহ ছেড়ে দাও। যারা গুনাহ করে, শিগগিরই তাদেরকে তাদের কৃতকর্মের শাস্তি দেওয়া হবে।’ (সুরা আনআম: ১২০)
ইবনুল কাইয়ুম (রহ.) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি নিজেকে ভালোভাবে চিনতে পেরেছে, সে অন্যের দোষ না খুঁজে নিজের সংশোধনে ব্যস্ত হয়ে পড়ে।’
তাই নফসকে নিয়ন্ত্রণ করে সমস্ত কবিরা ও সগিরা পাপ থেকে নিজেকে বাঁচিয়ে রাখা জরুরি। মনে রাখতে হবে, বড় নেক আমল করতে না পারলেও অন্তত পাপ থেকে যেন বেঁচে থাকি।
১০. কোরবানি করা কোরবানি করা জিলহজের অন্যতম মহৎ ও গুরুত্বপূর্ণ আমল। আল্লাহর রাসুল সা. বলেছেন, ‘যে ব্যক্তির কোরবানি করার সামর্থ্য আছে, কিন্তু কোরবানি করে না সে যেন আমাদের ঈদগাহে উপস্থিত না হয়।’ (মুসতাদরাকে হাকিম, হাদিস : ৭৬৩৯)
১১. দোয়ার পরিমাণ বৃদ্ধি করা দোয়া ইবাদতের মূল এবং স্রষ্টার সঙ্গে সৃষ্টির সেতুবন্ধন। আল্লাহ তাআলা বলেছেন, ‘তোমরা আমাকে ডাকো, আমি তোমাদের ডাকে সাড়া দেব।’ (সুরা মুমিন: ৬০)। জিলহজের প্রথম নয় দিন যারা রোজা রাখবেন, তাদের জন্য ইফতারের পূর্বমুহূর্ত দোয়া কবুলের এক বিশেষ সময়। এ ছাড়া বছরের শ্রেষ্ঠ দিন হিসেবে এই সময়ে বেশি বেশি মোনাজাত করা বাঞ্ছনীয়।
১২. আত্মীয়তার সম্পর্ক জোরদার করা ইসলামে আত্মীয়তার সম্পর্ক বজায় রাখা ইমানের অপরিহার্য অংশ। এটি রিজিক ও আয়ু বৃদ্ধি করে এবং জান্নাতের পথ সুগম করে। জিলহজ মাসে এই বন্ধন আরও মজবুত করা উচিত। এ কারণেই কোরবানির গোশতের একটি অংশ আত্মীয়দের মাঝে বণ্টন করা মুস্তাহাব। রাসুলুল্লাহ (সা.) কঠোর হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছেন, ‘আত্মীয়তার বন্ধন ছিন্নকারী জান্নাতে প্রবেশ করবে না।’ (সহিহ বুখারি: ৫৯৮৪)
জিলহজের প্রথম ১০ দিন মুসলমানদের জন্য ইবাদত, আত্মশুদ্ধি ও আল্লাহর নৈকট্য লাভের সুবর্ণ সুযোগ। এই সময় নেক আমল বৃদ্ধি, গুনাহ বর্জন, রোজা, জিকির, দোয়া ও কোরবানির মাধ্যমে একজন মুমিন তার ঈমানকে আরও শক্তিশালী করতে পারে। তাই এই বরকতময় দিনগুলোকে যথাযথভাবে কাজে লাগানো প্রত্যেক মুসলমানের দায়িত্ব।
মন্তব্য করুন