
জিলহজ ইসলামি বর্ষপঞ্জির শেষ মাস এবং ইসলামের অন্যতম মর্যাদাপূর্ণ সময়। পবিত্র কোরআনে আল্লাহ তাআলা যে চারটি মাসকে বিশেষ সম্মানিত ঘোষণা করেছেন, জিলহজ তার অন্যতম। (সুরা তাওবা: ৩৬) হজ ও কোরবানির মতো গুরুত্বপূর্ণ ইবাদতের কারণে এ মাসের গুরুত্ব মুসলিম উম্মাহর কাছে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ।
বিশেষ করে জিলহজের প্রথম ১০ দিনকে ইসলামি শরিয়তে অত্যন্ত ফজিলতপূর্ণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। পবিত্র কোরআনের সুরা ফজরে আল্লাহ তাআলা “দশ রজনীর” শপথ করেছেন। তাফসিরবিদদের মতে, এখানে জিলহজের প্রথম দশ দিনকেই বোঝানো হয়েছে।
হাদিসে রাসুলুল্লাহ (স.) বলেছেন, “আল্লাহর কাছে এই দশ দিনের নেক আমল অন্য যেকোনো দিনের চেয়ে বেশি প্রিয়।” (সহিহ বুখারি: ৯৬৯)
তাই এই বরকতময় সময়কে কাজে লাগাতে একজন মুমিনের প্রয়োজন পরিকল্পিত ইবাদত ও আত্মশুদ্ধির প্রস্তুতি।
জিলহজে করণীয় গুরুত্বপূর্ণ আমল ১. রোজা রাখা জিলহজের প্রথম নয় দিন রোজা রাখা বিশেষ সওয়াবের কাজ। বর্ণিত আছে যে, রাসুলুল্লাহ (স.) এই দিনগুলোতে রোজা রাখতেন (আবু দাউদ: ২৪৩৭) বিশেষত ৯ই জিলহজ বা আরাফার দিনের রোজার ফজিলত সবচেয়ে বেশি। রাসুলুল্লাহ (স.) বলেছেন, ‘আরাফার দিনের রোজার বিষয়ে আমি আশাবাদী যে, এর মাধ্যমে বিগত এক বছর ও আগামী এক বছরের গুনাহের ক্ষতিপূরণ হয়ে যাবে।’ (সহিহ মুসলিম: ১১৬২)
২. বেশি বেশি জিকির ও তাসবিহ কোরআনের নির্দেশ অনুযায়ী এই দিনগুলোতে আল্লাহর নাম বেশি বেশি স্মরণ করা উচিত। হাদিসে বিশেষ করে ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ’, ‘আল্লাহু আকবার’ ও ‘আলহামদুলিল্লাহ’ পাঠ করার তাগিদ দেওয়া হয়েছে (মুসনাদে আহমদ: ৫৪৪৬) এছাড়া ৯ই জিলহজ ফজর থেকে ১৩ই জিলহজ আছর পর্যন্ত প্রতিটি ফরজ নামাজের পর উচ্চস্বরে একবার ‘তাকবিরে তাশরিক’ পাঠ করা হানাফি মাজহাব অনুযায়ী ওয়াজিব। তাকবির: আল্লাহু আকবার, আল্লাহু আকবার, লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু ওয়াল্লাহু আকবার, আল্লাহু আকবার ওয়া লিল্লাহিল হামদ।
৩. কোরবানির প্রস্তুতি সামর্থ্যবান মুসলিমের জন্য কোরবানির দিনগুলোতে পশু জবাই করা ইসলামের একটি মৌলিক ইবাদত। হাদিসে এসেছে, কোরবানির দিন রক্ত প্রবাহিত করার চেয়ে আল্লাহর কাছে প্রিয় কোনো আমল নেই। (তিরমিজি: ১৪৯৩, হাসান গরিব)। কোরবানি দাতার জন্য ১০ই জিলহজ কোরবানির পশুর গোশত দিয়ে দিনের প্রথম আহার শুরু করা মোস্তাহাব।
৪. চুল ও নখ না কাটা রাসুলুল্লাহ (স.) বলেছেন, ‘তোমাদের কেউ কোরবানির নিয়ত করলে সে যেন জিলহজের চাঁদ দেখার পর থেকে কোরবানি করা পর্যন্ত চুল ও নখ না কাটে।’ (আবু দাউদ: ২৭৯১; নাসায়ি: ৪৩৬২) এ ছাড়া কোনো কোনো বর্ণনায় এসেছে, যারা কোরবানি করতে পারছেন না, তারাও জিলহজের চাঁদ ওঠার পর চুল-নখ না কেটে ১০ই জিলহজ ঈদের নামাজের পর কাটার মাধ্যমে কোরবানির সওয়াব পাওয়ার আশা রাখতে পারেন। (আবু দাউদ: ২৭৮৯)
৫. রাতের ইবাদত ও দান-সদকা জিলহজের রাতগুলোতে নফল নামাজ, তেলাওয়াত ও দান-সদকা বাড়িয়ে দেওয়া উত্তম। তাবেয়ি সাঈদ ইবনে জুবাইর (রহ.) এই দিনগুলোতে ইবাদতে উৎসাহ দিতে বলতেন, ‘এই রাতগুলোতে তোমরা ঘরের বাতি নিভিও না।’ (অর্থাৎ দীর্ঘ সময় জেগে ইবাদত করো)। প্রতিটি নেক কাজই এই সময়ে বিশেষ মর্যাদাপূর্ণ।
বর্জনীয় বিষয়সমূহ ১. গুনাহ থেকে বিরত থাকা সম্মানিত মাসগুলোতে পাপাচার করা সাধারণ সময়ের চেয়েও গুরুতর। আল্লাহ তাআলা এই মাসগুলো সম্পর্কে বলেছেন, ‘তোমরা এতে নিজেদের ওপর জুলুম (গুনাহ) করো না।’ (সুরা তাওবা: ৩৬) তাই প্রস্তুতির প্রথম ধাপই হওয়া উচিত নিজেকে সব ধরনের অন্যায় থেকে মুক্ত রাখা।
২. নিষিদ্ধ দিনগুলোতে রোজা না রাখা ১০ থেকে ১৩ই জিলহজ- ঈদুল আজহার দিন ও পরবর্তী তিন দিন রোজা রাখা শরিয়তে নিষিদ্ধ। রাসুলুল্লাহ (স.) বলেছেন, ‘আইয়ামে তাশরিক হলো খাওয়া, পান করা ও আল্লাহর জিকিরের দিন।’ (সহিহ মুসলিম: ১১৪১)
জিলহজ শুধু হজ ও কোরবানির মাস নয়, এটি আত্মশুদ্ধি, ত্যাগ ও আল্লাহর নৈকট্য অর্জনের এক অনন্য সুযোগ। সঠিক পরিকল্পনা, বেশি বেশি ইবাদত এবং গুনাহ থেকে বেঁচে থাকার মাধ্যমে একজন মুমিন এই সময়ের পূর্ণ বরকত লাভ করতে পারেন।
মন্তব্য করুন