
মানব ইতিহাসে বহু শক্তিশালী ও রহস্যময় জাতির উল্লেখ পাওয়া যায়। এর মধ্যে ‘আদ’ জাতি বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। হজরত নূহ (আ.)-এর মহাপ্লাবনের পর পৃথিবীতে তাদের আধিপত্য প্রতিষ্ঠিত হয়। কোরআনের বহু সূরায় তাদের শক্তি, উন্নত স্থাপত্য এবং চূড়ান্ত ধ্বংসের বর্ণনা রয়েছে—যা মানবজাতির জন্য এক গভীর শিক্ষা।
আদ জাতি ছিল হজরত নূহ (আ.)-এর পুত্র সাম (আ.)-এর বংশধর। তারা আরব উপদ্বীপের দক্ষিণাঞ্চলে, বর্তমান ইয়েমেন ও ওমানের মধ্যবর্তী ‘আহকাফ’ নামক বালুকাময় মরুভূমিতে বসবাস করত। পবিত্র কোরআনে এই অঞ্চলের উল্লেখ এসেছে সুরা আহকাফে (৪৬:২১)। প্রখ্যাত মুফাসসির ইমাম ইবনে কাসির (রহ.)-এর মতে, তারা ছিল তৎকালীন বিশ্বের সবচেয়ে সমৃদ্ধ ও প্রভাবশালী জনপদ।
পবিত্র কোরআনের বিভিন্ন আয়াত এবং নির্ভরযোগ্য তাফসির গ্রন্থগুলোতে তাদের শারীরিক সক্ষমতা ও বিস্ময়কর কার্যক্ষমতার বিবরণ পাওয়া যায়- ১. বিশাল দৈহিক গঠন: আল্লাহ তাআলা তাদের সৃষ্টিগতভাবেই বিশাল দেহ দান করেছিলেন। কোরআনে ইরশাদ হয়েছে- وَاذۡكُرُوۡۤا اِذۡ جَعَلَـكُمۡ ۚ خُلَفَآءَ مِنۡۢ بَعۡدِ قَوۡمِ نُوۡحٍ وَّزَادَكُمۡ فِى الۡخَـلۡقِ بَصۜۡطَةً ‘আর তোমরা স্মরণ কর, যখন তিনি তোমাদেরকে নূহের কওমের পর স্থলাভিষিক্ত করেছিলেন এবং সৃষ্টিতে তোমাদেরকে দৈহিক গঠন ও শক্তিতে সমৃদ্ধ করেছেন।’ (সুরা আরাফ: ৬৯) ইমাম ইবনে কাসির (রহ.)-এর মতে, তারা শারীরিক গড়নে নূহ (আ.)-এর জাতির তুলনায় অনেক বেশি শক্তিশালী ছিল।
২. অবিশ্বাস্য শারীরিক ক্ষমতা (তাফসিরবিদদের বর্ণনা): বিভিন্ন নির্ভরযোগ্য তাফসির ও ঐতিহাসিক বর্ণনায় এসেছে, আদ জাতির মানুষগুলো সাধারণ মানুষের কল্পনার বাইরে শক্তিশালী ছিল। তাফসিরে কুরতুবি ও তাবারিতে বর্ণিত হয়েছে, তাদের একেকজন মানুষের গায়ে এত শক্তি ছিল যে, তারা বিশালাকার কোনো বৃক্ষকে হাত দিয়ে টেনে মাটির গভীর থেকে উপড়ে ফেলতে পারত। এছাড়াও আধুনিক কোনো ক্রেন বা যন্ত্র ছাড়াই তারা মাইলের পর মাইল বড় বড় পাথর অনায়াসে কাঁধে করে বহন করত।
৩. পাহাড় কেটে অট্টালিকা নির্মাণ: তারা কেবল সমতলে নয়, বিশাল বিশাল পাহাড়ের বুক চিরে সুনিপুণ অট্টালিকা তৈরি করত। আল্লাহ বলেন- أَتَبْنُونَ بِكُلِّ رِيعٍ ءَايَةً تَعْبَثُونَ وَتَتَّخِذُونَ مَصَانِعَ لَعَلَّكُمْ تَخْلُدُونَ ‘তোমরা কি প্রতিটি উচ্চস্থানে অনর্থক স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণ করছ এবং তোমরা প্রাসাদ তৈরি করছ এই আশায় যে, তোমরা চিরকাল বেঁচে থাকবে?’ (সুরা শুআরা: ১২৮-১২৯)
৪. সুউচ্চ স্তম্ভের শহর ‘ইরাম’: তারা বিশালাকার পাথরের স্তম্ভ ও খিলান স্থাপন করে শহর সাজাত। কোরআন তাদের এ কারণেই ‘যাতুল ইমাদ’ বা ‘সুউচ্চ স্তম্ভের অধিকারী’ বলেছে- إِرَمَ ذَاتِ الْعِمَادِ الَّتِي لَمْ يُخْلَقْ مِثْلُهَا فِي الْبِلَادِ ‘ইরামের সাথে- যারা ছিল সুউচ্চ স্তম্ভের অধিকারী, যাদের মতো সৃষ্টি কোনো দেশে হয়নি।’ (সুরা ফাজর: ৭-৮)
৫. যুদ্ধে অপ্রতিদ্বন্দ্বী ও নিষ্ঠুর শক্তি: তারা যুদ্ধে ছিল অপরাজেয়। কোরআনে তাদের নিষ্ঠুর আক্রমণের বিষয়ে হূদ (আ.)-এর মুখে বলা হয়েছে- وَإِذَا بَطَشْتُم بَطَشْتُمْ جَبَّارِينَ ‘আর তোমরা যখন কাউকে আক্রমণ করো, তখন আক্রমণ করো নিষ্ঠুর মালিকের মতো।’ (সুরা শুআরা: ১৩০)
এই শক্তিশালী জাতিকে সঠিক পথ দেখাতে আল্লাহ তাআলা তাদের মধ্য থেকেই হজরত হূদ (আ.)-কে নবী হিসেবে পাঠান। তিনি তাদের অত্যন্ত মমতার সাথে ডাক দিয়েছিলেন- ‘হে আমার কওম! তোমাদের রবের কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করো... তিনি তোমাদের শক্তির ওপর আরও শক্তি বৃদ্ধি করবেন।’ (সুরা হূদ: ৫২) কিন্তু আদ জাতি জবাব দিয়েছিল- وَقَالُوا مَنْ أَشَدُّ مِنَّا قُوَّةً ‘আদ জাতি বলল- আমাদের চেয়ে শক্তিশালী কে আছে?’ (সূরা ফুসিলাত: ১৫) মহাপ্রলয়: সাত রাত ও আট দিনের সেই ধ্বংসযজ্ঞ
দীর্ঘ খরার পর আকাশে ঘন কালো মেঘ দেখে আদ জাতি আনন্দে মেতে উঠল, ভাবল বৃষ্টি আসবে। কিন্তু বলা হলো- ‘বরং এটা তা-ই যা তোমরা ত্বরান্বিত করতে চেয়েছিলে- এক ঝড়, যাতে রয়েছে যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি।’ (সুরা আহকাফ: ২৪)
আল্লাহ তাদের ওপর প্রচণ্ড শীতল ও বিধ্বংসী ঝড় পাঠালেন- ‘আল্লাহ সেই ঝড়কে তাদের ওপর সাত রাত ও আট দিন অবিচ্ছিন্নভাবে প্রবাহিত রাখলেন। ফলে তুমি সেই কওমকে দেখতে পাবে, তারা সেখানে এমনভাবে পড়ে আছে যেন তারা শূন্য খেজুরগাছের কাণ্ড।’ (সুরা হাক্কাহ: ৭)
প্রলয়ঙ্করী ঝড়ে বিশাল দেহের আদ জাতির মানুষগুলো ছিন্নমস্তক হয়ে জনপদ জুড়ে পড়ে ছিল। রক্ষা পেলেন কেবল হূদ (আ.) ও তাঁর মুমিন অনুসারীরা। হাদিসের সতর্কবার্তা
সহিহ বুখারিতে (হাদিস: ৪৮২৯) বর্ণিত হয়েছে- রাসুলুল্লাহ (স.) যখনই আকাশে কালো মেঘ বা ঝড়ো হাওয়া দেখতেন, উদ্বিগ্ন হয়ে পড়তেন। উম্মুল মুমিনিন আয়েশা (রা.) কারণ জিজ্ঞেস করলে তিনি বলতেন- ‘হে আয়েশা! আমি ভয় পাই- সেই জাতির মতো কোনো আজাব না আসে। তারা মেঘ দেখে ভেবেছিল বৃষ্টি আসবে, অথচ তাতে ছিল ধ্বংস।’
আদ জাতির ইতিহাস আমাদের একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা দেয়, শুধু শক্তি, ক্ষমতা বা প্রযুক্তিগত উন্নতি কোনো জাতিকে স্থায়ী করতে পারে না।
অহংকার ও অবাধ্যতা একটি শক্তিশালী জাতিকেও ধ্বংস করে দিতে পারে। একসময়কার গৌরবময় ‘ইরাম’ নগরী আজ বালুর নিচে চাপা পড়ে আছে।
এই ইতিহাস মানবজাতিকে সতর্ক করে দেয়, অহংকার পতনের মূল, আর আল্লাহর আনুগত্যই নিরাপত্তার একমাত্র পথ।
মন্তব্য করুন