
অশ্রু বা কান্নার একটি বিশেষ আধ্যাত্মিক গুরুত্ব রয়েছে। দুনিয়াবি কারণে হতাশা বা মোহে কান্না ইসলামী দৃষ্টিকোণ থেকে কাম্য নয়। বরং আল্লাহর ভয়ে, তাঁর ভালোবাসায় কিংবা আখিরাতের শাস্তির ভয়ে যে অশ্রু ঝরে—সেটিই প্রকৃত মুমিনের বৈশিষ্ট্য।
নবী-রাসুল (সা.) ও সালফে সালেহিনদের জীবনে এই ধরনের কান্নার উদাহরণ পাওয়া যায়, যা একজন মুমিনের জন্য আদর্শ হিসেবে বিবেচিত।
ইসলামে আল্লাহভীতিতে কান্নার বিশেষ মর্যাদা রয়েছে। এটি একজন মুমিনের অন্তরের পবিত্রতা ও ঈমানের গভীরতার প্রমাণ।
হাদিসে এসেছে, ইবনে আব্বাস (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন— “জাহান্নামের আগুন দুটি চোখকে স্পর্শ করবে না। ১. যে চোখ আল্লাহর ভয়ে কাঁদে। ২. যে চোখ আল্লাহর পথে পাহারা দিতে গিয়ে নির্ঘুম থাকে।” (তিরমিজি: ১৬৩৯)
এ হাদিস থেকে বোঝা যায়, আল্লাহভীতিতে অশ্রু বিসর্জনকারী মুমিন জাহান্নামের আগুন থেকে সুরক্ষিত থাকবেন।
রাসুল (সা.) আরও বলেছেন, কিয়ামতের দিন সাত শ্রেণির মানুষ আল্লাহর আরশের ছায়ায় আশ্রয় পাবেন। তাদের মধ্যে অন্যতম হলেন— “যে ব্যক্তি নির্জনে আল্লাহকে স্মরণ করে এবং তার চোখ অশ্রুসিক্ত হয়।” (সহিহ সহিহ বুখারি: ৬৮০৬)
এই হাদিস আল্লাহভীতিতে গোপনে কান্নার উচ্চ মর্যাদার প্রমাণ বহন করে।
ইসলামে একটি অশ্রুর ফোঁটার গুরুত্ব অসীম। আবু উমামা (রা.) থেকে বর্ণিত হাদিসে রাসুল (সা.) বলেন— “আল্লাহর কাছে দুটি ফোঁটা এবং দুটি চিহ্নের চেয়ে বেশি প্রিয় কিছু নেই— একটি হলো আল্লাহর ভয়ে পড়া অশ্রুর ফোঁটা, অন্যটি আল্লাহর পথে ঝরানো রক্তের ফোঁটা, এবং ফরজ আদায়ের চিহ্ন।” (তিরমিজি: ১৬৬৯)
এটি প্রমাণ করে, এক ফোঁটা অশ্রুও মানুষের আখিরাতে জান্নাত লাভের কারণ হতে পারে।
যে চোখ মহান আল্লাহর ভয়ে কাঁদে সে চোখকে জাহান্নামের আগুন স্পর্শ করবে না। ইবনে আব্বাস (রা.) বলেন, আমি রাসুল (সা.)-কে বলতে শুনেছি, জাহান্নামের আগুন দুটি চোখকে স্পর্শ করবে না। ১. মহান আল্লাহর ভয়ে যে চোখ কাঁদে। ২. আল্লাহ তাআলার রাস্তায় যে চোখ (নিরাপত্তার জন্য) পাহারা দিয়ে নির্ঘুম রাত পার করে। (তিরমিজি, হাদিস : ১৬৩৯)
আল্লাহর কাছে দুই ফোঁটা অশ্রুর মূল্য : আল্লাহর রাস্তায় জিহাদ করতে গিয়ে যেমন শরীরের তাজা রক্তের বিনিময়ে জান্নাত কেনা যায়, তেমনি মহান আল্লাহর দরবারে এক ফোঁটা অশ্রু ঢেলেও জান্নাত কেনা যায়।
আবু উমামা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুল (সা.) বলেন, দুটি ফোঁটা ও দুটি চিহ্নের চেয়ে বেশি প্রিয় আল্লাহ তাআলার কাছে আর কিছু নেই। আল্লাহ তাআলার ভয়ে যে অশ্রুর ফোঁটা পড়ে, আল্লাহ তাআলার পথে (জিহাদে) যে রক্তের ফোঁটা নির্গত হয় এবং আল্লাহ তাআলার নির্ধারিত কোনো ফরজ আদায় করতে গিয়ে যে চিহ্ন সৃষ্টি হয় (যেমন কপালে সিজদার চিহ্ন)। (তিরমিজি, হাদিস : ১৬৬৯)
অশ্রুবিসর্জনকারীর জন্য জাহান্নাম হারাম : আমরা অনেকে মনে করি, আমরা পাপের সাগরে ডুবে গেছি, আল্লাহ আমাদের হয়তো ক্ষমা করবেন না, আল্লাহ আমাদের দোয়া কবুল করবেন না; এগুলো ভুল ধারণা। আল্লাহ রহমানুর রহিম। তিনি দয়ার সাগর। বান্দার এক বিন্দু অনুশোচনার অশ্রু তিনি সহ্য করতে পারেন না। তাই এক ফোঁটা অশ্রু দিয়েই তিনি বান্দার হাজার-কোটি বছরের গুনাহ ধুয়ে সাফ করে দেন। বান্দার জন্য ওয়াজিব হয়ে থাকা জাহান্নামকে তার জন্য চিরতরে হারাম করে দেন।
আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসুল (সা.) বলেছেন, আল্লাহ তাআলার ভয়ে যে লোক কাঁদে, তার জাহান্নামে যাওয়া এরূপ অসম্ভব যেমন অসম্ভব দোহন করা দুধ আবার ওলানের মধ্যে ফিরে যাওয়া। আল্লাহ তাআলার পথের ধুলা এবং জাহান্নামের ধোঁয়া কখনো একত্র হবে না (আল্লাহ তাআলার পথের পথিক জাহান্নামে যাবে না)। (তিরমিজি,
তাই আমাদের উচিত, সুযোগ পেলেই মহান আল্লাহর দরবারে কান্নাকাটি করা। কৃত গুনাহ থেকে তাওবা করা। যেকোনো সমস্যায়, দুশ্চিন্তায় মহান আল্লাহর কাছে সাহায্য চাওয়া। ইনশাআল্লাহ, এসব আমলের মাধ্যমে আল্লাহ বান্দার গুনাহ মাফ করবেন এবং তাকে দুনিয়া ও আখিরাতে শান্তি ও সফলতা দান করবেন।
আল্লাহভীতিতে অশ্রু শুধু একটি আবেগ নয়, বরং এটি ঈমানের গভীরতার প্রতীক এবং জান্নাতের পথ সুগম করার অন্যতম মাধ্যম। তাই প্রতিটি মুমিনের উচিত আল্লাহর স্মরণে হৃদয়কে নরম রাখা এবং তাঁর দরবারে অশ্রুসিক্ত হওয়া।
মন্তব্য করুন