
ইসলাম শুধুমাত্র একটি ধর্ম নয়; বরং এটি একটি পূর্ণাঙ্গ জীবনব্যবস্থা। “ইসলাম” শব্দটি এসেছে আরবি মূল ধাতু স-ল-ম (س-ل-م) থেকে, যার অর্থ আত্মসমর্পণ, আনুগত্য এবং শান্তি। আল্লাহর প্রতি পূর্ণ আত্মসমর্পণের মাধ্যমেই ব্যক্তি, সমাজ এবং বিশ্বে শান্তি প্রতিষ্ঠাই ইসলামের মূল লক্ষ্য।
ইসলাম মানবজীবনের নিরাপত্তা, মর্যাদা এবং ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেয়। ইসলামের দৃষ্টিতে একজন নিরপরাধ মানুষকে হত্যা করা শুধু একটি অপরাধ নয়, বরং সমগ্র মানবতাকে হত্যা করার শামিল।
একজন মানুষ হত্যা মানে গোটা মানবজাতিকে হত্যা। আল্লাহ তায়ালা বলেন, مَنْ قَتَلَ نَفْسًا بِغَيْرِ نَفْسٍ أَوْ فَسَادٍ فِي الْأَرْضِ فَكَأَنَّمَا قَتَلَ النَّاسَ جَمِيعًا
যে কেউ কাউকে হত্যা করে, সে যেন সমগ্র মানব জাতিকে হত্যা করল। (সুরা মায়েদা:৩২)
ইসলামের দৃষ্টিতে একটি প্রাণই একটি জগতের সমান। ফলে একজন মানুষকে বিনা কারণে হত্যা করা সমগ্র মানবতাবিরোধী অপরাধ।
আল্লাহ সুবহানাতায়ালা কুরাআনের অন্য আয়াতে বলেন, যে ব্যক্তি ইচ্ছাকৃতভাবে কোনো মুমিনকে হত্যা করে, তার প্রতিদান জাহান্নাম, সেখানে সে চিরকাল থাকবে। আল্লাহ তার ওপর ক্রুদ্ধ, তাকে অভিশাপ দিয়েছেন এবং তার জন্য কঠিন শাস্তি প্রস্তুত রেখেছেন। (সুরা নিসা: ৯৩) এই আয়াত অত্যন্ত ভীতিকর। এতে বলা হয়েছে, ইচ্ছাকৃতভাবে মুমিন হত্যা করলে চিরস্থায়ী জাহান্নাম ও আল্লাহর গজব অবধারিত।
রসুলুল্লাহ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন بَاب الْوُقُوفِ وَالْبَوْلِ عِنْدَ سُبَاطَةِ قَوْمٍ
حَدَّثَنَا سُلَيْمَانُ بْنُ حَرْبٍ عَنْ شُعْبَةَ عَنْ مَنْصُورٍ عَنْ أَبِي وَائِلٍ عَنْ حُذَيْفَةَ قَالَ لَقَدْ رَأَيْتُ رَسُولَ اللهِ صلى الله عليه وسلم أَوْ قَالَ لَقَدْ أَتَى النَّبِيُّ صلى الله عليه وسلم سُبَاطَةَ قَوْمٍ فَبَالَ قَائِمًا
আল্লাহ বলেন, যে ব্যক্তি অন্যায়ভাবে কোনো মানুষকে হত্যা করে, কিয়ামতের দিন আমি নিজেই তার বিরুদ্ধে বাদী হবো। (সহিহ বুখারি:২৪৭১) কিয়ামতের দিন আল্লাহ নিজেই হত্যাকারীর বিরুদ্ধে মামলা করবেন।
হত্যা জাহান্নামে যাওয়ার অন্যতম কারণ রসুলুল্লাহ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, بَابُ قَوْلِ اللَّهِ تَعَالَى: {إِنَّ الَّذِينَ يَأْكُلُونَ أَمْوَالَ الْيَتَامَى ظُلْمًا إِنَّمَا يَأْكُلُونَ فِي بُطُونِهِمْ نَارًا وَسَيَصْلَوْنَ سَعِيرًا
তোমরা সাতটি ধ্বংসকারী গোনাহ থেকে বাঁচো. এর মধ্যে একটি হলো,যে প্রাণকে আল্লাহ হারাম করেছেন তাকে অন্যায়ভাবে হত্যা করা। ( সহিহ বুখারি: ২৭৬৬, সহিহ মুসলিম:৮৯) অন্যায়ভাবে হত্যা এমন এক পাপ, যা ধ্বংসকারী এবং জাহান্নামের দিকে ধাবিত করে।
কিয়ামতের ভয়াবহ দৃশ্য রসুলুল্লাহ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, بَاب عَرْضِ مَقْعَدِ الْمَيِّتِ مِنْ الْجَنَّةِ أَوْ النَّارِ عَلَيْهِ وَإِثْبَاتِ عَذَابِ الْقَبْرِ وَالتَّعَوُّذِ مِنْهُ
কিয়ামতের দিন হত্যাকারী ও নিহত ব্যক্তি উপস্থিত হবে। নিহত ব্যক্তি বলবে, হে আমার রব! এ লোকটি আমাকে কেন হত্যা করল তাকে জিজ্ঞাসা করুন? (সহিহ মুসলিম:২৮৭০) সেই দিন কোনো অজুহাত কাজে আসবে না, হত্যাকারীকে উত্তরদায়ী হতে হবে আল্লাহর আদালতে।
ইসলামে হত্যার অনুমতি কখন? ইসলাম কেবলমাত্র তিনটি ক্ষেত্রে শাস্তি বা প্রাণহানির অনুমতি দেয় بَاب قَوْلِ اللهِ تَعَالَى {أَنَّ النَّفْسَ بِالنَّفْسِ وَالْعَيْنَ بِالْعَيْنِ وَالأَنْفَ بِالأَنْفِ وَالْأُذُنَ بِالْأُذُنِ وَالسِّنَّ بِالسِّنِّ وَالْجُرُوحَ قِصَاصٌ فَمَنْ تَصَدَّقَ بِهِ فَهُوَ كَفَّارَةٌ لَهُ وَمَنْ لَمْ يَحْكُمْ بِمَا أَنْزَلَ اللهُ فَأُولَئِكَ هُمْ الظَّالِمُونَ
মুসলমানের রক্ত কেবল তিনটি কারণে হালাল হতে পারে। ১. বিবাহিত অবস্থায় ব্যভিচার, ২. কিসাসের মাধ্যমে হত্যা, ৩. ইসলাম থেকে বের হওয়া (মুরতাদ)। (সহিহ বুখারি:৬৮৭৮, সহিহ মুসলিম:১৬৭৬) ব্যক্তি বা সমাজ নয়, শুধু শরিয়তের বিধান অনুযায়ীই শাস্তি কার্যকর হবে।
ইসলামে মানুষের জীবন সর্বোচ্চ মর্যাদার অধিকারী। যিনি অন্যায়ভাবে কাউকে হত্যা করেন, তিনি শুধু একজন মানুষকেই হত্যা করেন না, বরং পুরো মানবতাকে আঘাত করেন। ইসলামের মূল শিক্ষা হলো শান্তি, ন্যায়বিচার এবং মানবতার কল্যাণ। অন্যায়ভাবে হত্যা শুধু একটি ব্যক্তিকে নয়, পুরো মানবজাতির বিরুদ্ধে অপরাধ হিসেবে গণ্য করা হয়। তাই একজন মুসলমানের দায়িত্ব হলো মানবজীবন রক্ষা করা এবং সমাজে শান্তি প্রতিষ্ঠায় কাজ করা।
মন্তব্য করুন