
মানুষের জীবনে আরাম-আয়েশের আকাঙ্ক্ষা চিরন্তন। একটু স্বস্তি, আরামদায়ক বিছানা বা উন্নত জীবনযাপনকে অনেকেই সুখের মানদণ্ড হিসেবে মনে করেন। কিন্তু সমগ্র মানবজাতির পথপ্রদর্শক মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর জীবন ছিল অবিশ্বাস্য রকমের সরল, সংযমী এবং দুনিয়াবিমুখতার উজ্জ্বল উদাহরণ।
তার জীবন আমাদের শেখায়—প্রকৃত মর্যাদা ও সফলতা বিলাসিতায় নয়; বরং আল্লাহমুখী হৃদয়, সংযমী জীবনযাপন এবং আখিরাতমুখী দৃষ্টিভঙ্গির মধ্যেই নিহিত।
হজরত আবদুল্লাহ (রা.) থেকে বর্ণিত একটি হাদিসে বলা হয়েছে—
عَنْ عَبْدِ اللَّهِ، قَالَ نَامَ رَسُولُ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم عَلَى حَصِيرٍ فَقَامَ وَقَدْ أَثَّرَ فِي جَنْبِهِ فَقُلْنَا يَا رَسُولَ اللَّهِ لَوِ اتَّخَذْنَا لَكَ وِطَاءً . فَقَالَ " مَا لِي وَمَا لِلدُّنْيَا مَا أَنَا فِي الدُّنْيَا إِلاَّ كَرَاكِبٍ اسْتَظَلَّ تَحْتَ شَجَرَةٍ ثُمَّ رَاحَ وَتَرَكَهَا " .
অর্থাৎ, আবদুল্লাহ (রা.) বলেন—একবার রাসুলুল্লাহ (সা.) খেজুর পাতার মাদুরে শুয়ে ছিলেন। ঘুম থেকে উঠলে দেখা গেল মাদুরের দাগ তার শরীরে পড়ে গেছে। আমরা বললাম, হে আল্লাহর রাসুল! আমরা কি আপনার জন্য একটি নরম বিছানার ব্যবস্থা করব না? তখন তিনি বললেন, দুনিয়ার সঙ্গে আমার কী সম্পর্ক! দুনিয়ায় আমি এমন একজন পথিকের মতো, যে একটি গাছের ছায়ায় কিছুক্ষণ বিশ্রাম নেয়, তারপর আবার তা ছেড়ে নিজের পথে চলে যায়। (তিরমিজি, হাদিস: ২৩৭৭)
এই হাদিসে মহানবী (সা.) অত্যন্ত হৃদয়গ্রাহী উপমার মাধ্যমে দুনিয়ার প্রকৃত বাস্তবতা তুলে ধরেছেন। মানুষের জীবন যেন দীর্ঘ সফরের মাঝখানে ক্ষণিকের বিশ্রাম। যেমন একজন পথিক গাছের ছায়ায় কিছুক্ষণ বিশ্রাম নিয়ে আবার তার গন্তব্যের পথে যাত্রা শুরু করে, তেমনি মানুষের আসল গন্তব্য আখিরাত।
এ কারণেই একজন মুমিনের জন্য দুনিয়ার আরাম-আয়েশ, ভোগ-বিলাস বা প্রাচুর্যের প্রতি অতিরিক্ত আসক্ত হওয়া সমীচীন নয়।
এ হাদিস আমাদের কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা দেয়। প্রথমত, সরল জীবনযাপন মানুষের মর্যাদা কমায় না; বরং তা হৃদয়কে পরিশুদ্ধ ও আল্লাহর নিকটবর্তী করে। দ্বিতীয়ত, দুনিয়ার সাময়িক কষ্ট বা অভাব নিয়ে অতিরিক্ত দুঃখিত হওয়ার কিছু নেই, কারণ এটি চিরস্থায়ী নয়। তৃতীয়ত, জীবনের মূল প্রস্তুতি হওয়া উচিত আখিরাতের জন্য, দুনিয়াকে লক্ষ্য নয়, বরং মাধ্যম হিসেবে গ্রহণ করা।
অর্থাৎ, একজন মুমিনের দৃষ্টিতে দুনিয়া হলো ক্ষণিকের সফরের পথ, আর আখিরাত হলো চিরস্থায়ী ঠিকানা। যে ব্যক্তি এ সত্য উপলব্ধি করতে পারে, তার জীবন হয়ে ওঠে সংযমী, সচেতন ও উদ্দেশ্যময়। তখন সে দুনিয়ার মোহে আটকে না থেকে চিরস্থায়ী সফলতার পথেই এগিয়ে চলে।
মন্তব্য করুন