
রমজান মাস আত্মশুদ্ধি, সংযম ও তাকওয়া অর্জনের মহিমান্বিত সময়। কিন্তু এই পবিত্র মাসে যদি একজন রোজাদার মিথ্যা কথা বলা ও অসত্য আচরণ থেকে নিজেকে বিরত রাখতে না পারেন, তবে তার সিয়াম সাধনার মূল উদ্দেশ্য ব্যাহত হতে পারে। কোরআন ও হাদিসের আলোকে রমজানে মিথ্যার ভয়াবহতা এবং সত্যবাদিতার গুরুত্ব নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করা হলো।
রমজান মূলত তাকওয়া বা আল্লাহভীতির মাস। পবিত্র কোরআনে আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন— হে মুমিনগণ! তোমরা আল্লাহকে ভয় করো এবং সত্যবাদীদের সঙ্গে থাকো। — (সুরা তাওবা: ১১৯)
এই আয়াতে স্পষ্টভাবে সত্যবাদিতাকে তাকওয়া অর্জনের অন্যতম শর্ত হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। মিথ্যা মানুষের অন্তর কলুষিত করে, চরিত্র নষ্ট করে এবং ধীরে ধীরে তাকে আল্লাহর নৈকট্য থেকে দূরে সরিয়ে দেয়।
অন্য আয়াতে আল্লাহ বলেন— নিশ্চয়ই আল্লাহ তাকে পথ দেখান না, যে সীমালঙ্ঘনকারী ও মিথ্যাবাদী। — (সুরা মুমিন: ২৮)
অতএব, রোজার মাধ্যমে তাকওয়া অর্জন করতে হলে মিথ্যা পরিহার করা অপরিহার্য।
রোজা রেখে মিথ্যা বললে কী হয়? হজরত আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (স.) বলেছেন— যে ব্যক্তি (রোজা রেখে) মিথ্যা কথা বলা এবং সে অনুযায়ী আমল করা বর্জন করেনি, তার এই পানাহার পরিত্যাগ করায় আল্লাহর কোনো প্রয়োজন নেই। — সহিহ বুখারি: ১৯০৩
এই হাদিস থেকে বোঝা যায়, কেবল ক্ষুধা-তৃষ্ণা সহ্য করাই রোজার লক্ষ্য নয়। বরং জিহ্বা, আচরণ ও চরিত্রকে শুদ্ধ করা রোজার প্রকৃত উদ্দেশ্য।
একই সতর্কবাণী এসেছে সুনানে ইবনে মাজাহ (হাদিস: ১৬৮৯)-এ, যেখানে বলা হয়েছে, মিথ্যাচার ও মূর্খতাসুলভ আচরণ ত্যাগ না করলে আল্লাহর কাছে সেই উপবাসের কোনো মূল্য নেই।
ফিকহের দৃষ্টিতে রোজা ভাঙে কি? ধর্মীয় আইনের (ফিকহ) আলোকে রোজা রেখে মিথ্যা বললে রোজা ভেঙে যায় না। অর্থাৎ কাজা বা কাফফারা ওয়াজিব হয় না। তবে ইসলামী আলেমদের মতে, এতে রোজার সওয়াব মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
অর্থাৎ, শরিয়তের দৃষ্টিতে রোজা সহিহ থাকলেও তার আত্মিক মর্যাদা নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা থাকে। ফলে সেই রোজা কেবল একটি অর্থহীন উপবাসে পরিণত হতে পারে।
রোজা: কেবল উপবাস নয়, চরিত্র গঠনের প্রশিক্ষণ রমজান আমাদের শেখায়— জিহ্বার নিয়ন্ত্রণ, সত্যবাদিতার চর্চা, আত্মসংযম, সামাজিক দায়িত্ববোধ।
মিথ্যা মানুষের বিশ্বাসযোগ্যতা ধ্বংস করে এবং সমাজে অবিশ্বাস ও অস্থিরতা সৃষ্টি করে। রোজা যদি আমাদের জিহ্বাকে সত্যে অভ্যস্ত না করে, তবে সেই রোজার প্রকৃত শিক্ষা আমরা গ্রহণ করতে পারিনি।
সত্যবাদিতার অঙ্গীকার: রমজানের প্রকৃত শিক্ষা রমজান মাস হলো আত্মশুদ্ধির মহড়া। এই মাসে যদি আমরা মিথ্যা ত্যাগের দৃঢ় অঙ্গীকার না করি, তবে তাকওয়া অর্জনের লক্ষ্য অপূর্ণ থেকে যাবে।
রোজা কেবল পেট ও প্রবৃত্তির নিয়ন্ত্রণ নয়— এটি জিহ্বা, মন ও আচরণেরও নিয়ন্ত্রণ। তাই প্রত্যেক মুমিনের কর্তব্য— * মিথ্যা পরিহার করা * সত্যকে আঁকড়ে ধরা * আচরণে সততা বজায় রাখা
আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে রোজার হক আদায় করার এবং সত্যবাদিতায় অটল থাকার তাওফিক দান করুন। আমিন।
মন্তব্য করুন