
ইসলাম শুধুমাত্র আল্লাহর সঙ্গে বান্দার সম্পর্ককেই গুরুত্ব দেয় না; বরং মানুষের সঙ্গে মানুষের সম্পর্ক—অর্থাৎ হক্কুল ইবাদ—কেও অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করে। নামাজ, রোজা, হজ ও অন্যান্য ইবাদতের মাধ্যমে একজন বান্দা আল্লাহর নৈকট্য অর্জন করতে পারে; কিন্তু মানুষের প্রতি জুলুম, অপবাদ, গীবত, সম্মানহানি বা অধিকার হরণ করলে সেই ইবাদত কিয়ামতের দিন বিপদের কারণ হয়ে দাঁড়াবে।
রাসুলুল্লাহ (সা.) এই বাস্তবতাকে গভীরভাবে স্মরণ করিয়ে দিয়ে উম্মতকে নির্দেশ দিয়েছেন—দুনিয়াতেই মানুষের অধিকার আদায় করতে হবে। মানুষের হক এমন এক ঋণ, যা আল্লাহর কাছে তাওবা করলেও ক্ষমা হয় না যতক্ষণ না হকদার ক্ষমা করে।
এ বিষয়ে রাসুলুল্লাহ (সা.) অত্যন্ত হৃদয়স্পর্শী ও ভীতিকর সতর্কবাণী উচ্চারণ করেছেন—
عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ قَالَ قَالَ رَسُولُ اللهِ صلى الله عليه وسلم مَنْ كَانَتْ لَهُ مَظْلَمَةٌ لأَخِيهِ مِنْ عِرْضِهِ أَوْ شَيْءٍ فَلْيَتَحَلَّلْهُ مِنْهُ الْيَوْمَ قَبْلَ أَنْ لاَ يَكُونَ دِينَارٌ وَلاَ دِرْهَمٌ إِنْ كَانَ لَهُ عَمَلٌ صَالِحٌ أُخِذَ مِنْهُ بِقَدْرِ مَظْلَمَتِهِ وَإِنْ لَمْ تَكُنْ لَهُ حَسَنَاتٌ أُخِذَ مِنْ سَيِّئَاتِ صَاحِبِهِ فَحُمِلَ عَلَيْهِ
আবু হুরাইরাহ (রা.) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, যে ব্যক্তি তার ভাইয়ের সম্ভ্রমহানি বা অন্য কোনো বিষয়ে যুলুমের জন্য দায়ী থাকে, সে যেন আজই তার কাছ হতে মাফ করিয়ে নেয়, সে দিন আসার পূর্বে যে দিন তার কোনো দ্বীনার বা দিরহাম থাকবে না। সে দিন তার কোনো সৎকর্ম না থাকলে তার যুলুমের পরিমাণ তা তার নিকট হতে নেয়া হবে আর তার কোনো সৎকর্ম না থাকলে তার প্রতিপক্ষের পাপ হতে নিয়ে তা তার উপর চাপিয়ে দেয়া হবে। (বুখারি, হাদিস : ২৪৪৯)
সম্ভ্রমহানি কেন আলাদা উল্লেখ? ইমাম ইবন হাজার আল-আসকালানি (রহ.) বলেন, মানুষের ইজ্জত ও সম্মান ক্ষুণ্ণ করা, গীবত, অপবাদ ও অপমান এমন জুলুম যা সহজে ক্ষমা হয় না। আজকের সমাজে কলম, মাইক, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের পোস্ট কিংবা কথার মাধ্যমে যে সম্ভ্রমহানি হয়, এই হাদিস সরাসরি প্রযোজ্য।
দুনিয়াতেই মাফ করানোর তাগিদ রাসুল (সা.) বলেছেন: “আজই” (فَلْيَتَحَلَّلْهُ الْيَوْمَ)। ইমাম নববী (রহ.) ব্যাখ্যা করেছেন, এটি প্রমাণ করে যে হক্কুল ইবাদ আদায়ে দেরি মারাত্মক পরিণতি আনতে পারে। (শরহু সহিহ মুসলিম, ১৬/১৪০)
এই হাদিসটি মূলত সেই প্রসিদ্ধ ধারণার সাথে সম্পর্কিত, যাকে অন্য হাদিসে বলা হয়েছে-মুফলিস (দেউলিয়া ব্যক্তি)। ইমাম কুরতুবী (রহ.) তাঁর প্রসিদ্ধ কিতাব আত-তাযকিরা ফি আহওয়ালিল মাওতা ওয়াল আখিরা-তে ‘মুফলিস (দেউলিয়া)’ সংক্রান্ত হাদিস আলোচনা করতে গিয়ে বলেন: ‘প্রকৃত দেউলিয়াত্ব দুনিয়ার সম্পদের অভাব নয়; বরং আখিরাতে মানুষের অধিকার আদায় করতে গিয়ে আমল নিঃশেষ হয়ে যাওয়া। (আত-তাযকিরা, পৃ. ৩৪৯)
পাপ স্থানান্তরের ভয়াবহতা হাদিসের সবচেয়ে ভীতিকর অংশ হলো—যদি জালিমের কোনো নেক আমল না থাকে, তবে মজলুমের গুনাহ তার উপর চাপানো হবে। ইবন তাইমিয়্যাহ (রহ.) বলেন, এটি আল্লাহর ন্যায়বিচারের পূর্ণ প্রকাশ, যেখানে কোনো জুলুম বিনা প্রতিদানে মাফ হয় না। (মাজমু‘উল ফাতাওয়া, ১৮/৩২১)
এই হাদিস আমাদের শেখায়, ইবাদত শুধু আল্লাহর প্রতি নয়, মানুষের প্রতি দায়বদ্ধতাও অপরিহার্য। মানুষের অধিকার হালকাভাবে নিলে কিয়ামতের দিন ভয়াবহ ক্ষতির সম্মুখীন হতে হবে। আজ ক্ষমা চাওয়া কোনো অপমান নয়; বরং এটি আখিরাতের মুক্তির পথ। যে জুলুমকে আমরা আজ তুচ্ছ মনে করি, সেটিই আগামীদিনে মুক্তির পথে সবচেয়ে বড় বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে।
মন্তব্য করুন