
মানুষের জীবন আবর্তিত হয় আশা, ভয়, দুঃখ ও গভীর আকাঙ্ক্ষার মধ্য দিয়ে। দিনের কোলাহল ও ব্যস্ততা শেষে যখন রাত নীরবতায় ডুবে যায়, তখনই বান্দার সামনে খুলে যায় তার রবের নৈকট্য লাভের শ্রেষ্ঠ সুযোগ। ইসলামে রাতের ইবাদতকে বিশেষ মর্যাদা দেওয়া হয়েছে, কারণ এই সময় বান্দা একান্তভাবে নিজের দুঃখ, আকুতি ও প্রার্থনা আল্লাহর দরবারে পেশ করতে পারে।
পবিত্র কোরআন রাতের ইবাদতের গুরুত্ব স্মরণ করিয়ে দিয়ে ঘোষণা করেছে— রাতের একাংশে তাহাজ্জুদ আদায় করো, এটি তোমার জন্য নফল। (সুরা ইসরা, আয়াত: ৭৯)
রাতই হলো বান্দার কান্নার সময়, গোপন দুঃখ উজাড় করে দেওয়ার সময় এবং রবের কাছে নিঃশব্দে ফিরে যাওয়ার সময়।
মহানবী হজরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর উম্মতকে এই অপার আধ্যাত্মিক সম্পদ থেকে বঞ্চিত না হওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন। এ প্রসঙ্গে তিনি এক অত্যন্ত আশাব্যঞ্জক সুসংবাদ দিয়েছেন।
জাবির ইবনে আবদুল্লাহ (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে বলতে শুনেছি- রাতের মধ্যে এমন একটি বিশেষ সময় আছে, যখন কোনো মুসলিম যদি আল্লাহর কাছে দুনিয়া ও আখিরাতের কোনো কল্যাণ প্রার্থনা করে, তবে আল্লাহ তা তাকে দান করেন। আর এই সময়টি প্রত্যেক রাতেই রয়েছে। (সহিহ মুসলিম)
ইমাম নববী তাঁর শরহ সহিহ মুসলিম-এ বলেন, এই বিশেষ সময়টি নির্দিষ্ট করে জানানো হয়নি; ঠিক যেমন লাইলাতুল কদর গোপন রাখা হয়েছে। উদ্দেশ্য হলো—বান্দা যেন পুরো রাত জুড়েই ইবাদতে মনোযোগী হয়। তবে সবচেয়ে সম্ভাব্য সময় হলো রাতের শেষ তৃতীয়াংশ, বিশেষ করে ফজরের পূর্ব মুহূর্ত।
ইমাম ইবনে হাজার আল-আসকালানী (রহ.) বলেন, এই সময় আল্লাহ বান্দাদের প্রতি বিশেষ রহমত প্রকাশ করেন এবং ঘোষণা করেন— কে আমাকে ডাকবে, আমি তার ডাকে সাড়া দেবো? বিভিন্ন হাদিস পর্যালোচনায় তিনি রাতের শেষ তৃতীয়াংশকেই সবচেয়ে শক্তিশালী সম্ভাবনা হিসেবে উল্লেখ করেছেন। (ফাতহুল বারী)
ইমাম ইবনে তাইমিয়া (রহ.)'র মতে, রাতের শেষ অংশ হলো আল্লাহর নৈকট্য লাভের সময়। অধিকাংশ দোয়া কবুলের হাদিস এই সময়ের সঙ্গেই সম্পৃক্ত। তবে আল্লাহ চাইলে রাতের অন্য সময়েও তাঁর রহমতের দরজা খুলে দেন। (মাজমুআ ফাতাওয়া)
ইমাম কুরতুবী (রহ.) বলেন, এই হাদিসের উদ্দেশ্য সময় নির্দিষ্ট করা নয়; বরং মানুষকে পুরো রাতজুড়ে ইবাদতে উৎসাহিত করা। কারণ রাতের যে কোনো মুহূর্তে বান্দার দোয়া কবুল হয়ে যেতে পারে। (তাফসির কুরতুবী)
ইবনু রাজব আল-হানবালী (রহ.) বলেন, যে ব্যক্তি রাতের বিভিন্ন অংশে দোয়া, ইস্তিগফার ও কিয়ামুল লাইল আদায় করে, সে অবশ্যই এই বিশেষ মুহূর্তের অংশীদার হবে। তিনি একে আল্লাহর পক্ষ থেকে ‘গোপন ধন’ বলে আখ্যায়িত করেছেন। (লাতায়িফুল মা‘আরিফ)
মন্তব্য করুন