
হাদিস মানবজীবনের এক অনন্য দিকনির্দেশনা, যেখানে মানুষের সৃষ্টি, স্বভাব, নৈতিকতা, সমাজব্যবস্থা ও রাষ্ট্রনীতির গভীরতম শিক্ষাগুলো স্পষ্টভাবে তুলে ধরা হয়েছে। মানুষের জন্মগত পবিত্রতা, শয়তানের প্ররোচনা, হালাল-হারামের সীমারেখা, দুনিয়া–আখিরাতের পরীক্ষা এবং গুনাহগারের পরিণতি—এসব বিষয়ে বহু হাদিসে বিস্তৃত আলোচনা পাওয়া যায়।
ইয়ায ইবনু হিমার আল-মুজাশিঈ (রা.) বর্ণিত একটি দীর্ঘ হাদিসে রাসুলুল্লাহ (সা.) একদিন খুতবাহে মানবজীবনের আদি প্রকৃতি, নৈতিক পতনের কারণ, নবীদের দায়িত্ব এবং জান্নাতী–জাহান্নামী মানুষের বৈশিষ্ট্য স্পষ্টভাবে তুলে ধরেন। এই হাদিসটি মানবসমাজের জন্য আদর্শিক পথ ও বিপথগামিতার পথ—উভয়টির চিত্র তুলে ধরেছে।
মানুষের জন্মগত ফিতরাহ ও শয়তানের প্রতারণা রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, আল্লাহ তাআলা মানুষকে পবিত্র ফিতরাহ নিয়ে সৃষ্টি করেছেন। তারা একনিষ্ঠ ও সৎ প্রাকৃতিক প্রবৃত্তির অধিকারী। কিন্তু শয়তান এসে মানুষকে সত্যপথ থেকে দূরে সরিয়ে দেয়, তাদের জন্য বৈধ বিষয়গুলোকে হারাম করে দেয় এবং এমন বিষয়েও আল্লাহর সঙ্গে অংশীদার করতে উদ্বুদ্ধ করে, যা আল্লাহ কখনও অনুমোদন করেননি।
আল্লাহ তাআলা পৃথিবীর মানুষের অবস্থার দিকে তাকিয়ে আরব-অনারব সকলের প্রতি অসন্তুষ্ট হন—কিছু কিতাবধারী লোক ব্যতীত। এরপর তিনি নবীজিকে জানান যে, তাঁর প্রেরণের উদ্দেশ্য হলো পরীক্ষার মাধ্যমে মানুষকে সত্যপথে ফিরিয়ে আনা।
ওহি ও দায়িত্ব: কুরআনের মর্যাদা হাদিসে নবীজিকে জানানো হয়: তোমার প্রতি এমন কিতাব নাজিল করেছি, যা পানি দিয়েও ধুয়ে-মুছা যাবে না; তুমি তা ঘুমন্ত অবস্থায়ও, জাগ্রত অবস্থায়ও পাঠ করবে।
অর্থাৎ, কুরআন এমন এক স্থায়ী ও অটুট সত্য, যা কখনও নাশ হওয়ার নয়।
কুরাইশদের সঙ্গে সংঘাত ও আল্লাহর প্রতিশ্রুতি নবীজিকে আল্লাহ কুরাইশদের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নেওয়ার নির্দেশ দেন। নবীজি আশঙ্কা প্রকাশ করলে আল্লাহ বলেন, যেমনিভাবে তারা তোমাকে বহিষ্কার করেছে, তুমিও তাদেরকে বের করে দাও; তুমি আক্রমণ করলে আমি তোমাকে সাহায্য করব। আরো বলেন, তুমি আল্লাহর পথে ব্যয় করো, তোমার ওপরও ব্যয় করা হবে। তুমি বাহিনী পাঠাবে—আমি তোমার জন্য তার পাঁচগুণ সমর্থন পাঠাব।
জান্নাতী মানুষের ৩ শ্রেণি রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, জান্নাতীরা তিন ধরনের— ন্যায়পরায়ণ শাসক – যিনি ইনসাফ করেন, দানশীল ও নেক কাজে তাওফীকপ্রাপ্ত। দয়ালু মানুষ – আত্মীয়-স্বজন ও মুসলিম সমাজের প্রতি কোমলচিত্ত। পবিত্র চরিত্রের মানুষ – যারা শালীন, দীনদার এবং পরিবার–সন্তানাদি নিয়ে সৎভাবে জীবনযাপন করেন।
জাহান্নামী মানুষের ৫ শ্রেণি নবীজি পাঁচ ধরনের ব্যক্তির পরিণতি সম্পর্কে সতর্ক করেছেন, দুর্বল চরিত্রের মানুষ, যাদের কোনো দৃঢ়তা নেই; যে কারও অনুসারী হয়ে যায়। খিয়ানতকারী ব্যক্তি, যে ছোট-বড় কোনো লোভই লুকায় না এবং প্রতিটি ক্ষেত্রে বিশ্বাসঘাতকতা করে। প্রতারক ব্যক্তি, যে সকাল–সন্ধ্যা মানুষের পরিবার ও সম্পদের বিষয়ে প্রতারণায় লিপ্ত। কৃপণ ব্যক্তি, যে দানশীলতার বিপরীত আচরণ করে। মিথ্যুক বা অশ্লীলভাষী, যারা গালি-গালাজ ও মন্দভাষায় অভ্যস্ত।
এই দীর্ঘ হাদিসে মানবজীবন, নৈতিকতা, ঈমান, ন্যায়নীতি ও চরিত্র গঠনের পূর্ণাঙ্গ নির্দেশনা পাওয়া যায়। মানুষের জন্মগত পবিত্রতা রক্ষা, শয়তানের প্রতারণা থেকে দূরে থাকা, আল্লাহর পথে ব্যয় করা, ন্যায়পরায়ণ হওয়া এবং উদার ও সত্যবাদী আচরণ—এসব গুণই মানুষকে জান্নাতের পথে নিয়ে যায়। আর প্রতারণা, খিয়ানত, কৃপণতা ও অশ্লীলতা মানুষকে ধ্বংসের দিকে ঠেলে দেয়।
মন্তব্য করুন