
মিয়ানমারের প্রেসিডেন্ট উ মিন অং হ্লাইং ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিকে আশ্বস্ত করেছেন যে, মিয়ানমারের ভূখণ্ড কোনোভাবেই ভারতের নিরাপত্তা স্বার্থবিরোধী কর্মকাণ্ডে ব্যবহারের সুযোগ দেওয়া হবে না। সোমবার ভারত সফরকালে তিনি এ আশ্বাস দেন। ভারতীয় সংবাদমাধ্যম ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস এ তথ্য জানিয়েছে।
ভারত দীর্ঘদিন ধরে অভিযোগ করে আসছে যে, উত্তর-পূর্বাঞ্চলের কিছু বিচ্ছিন্নতাবাদী গোষ্ঠী অতীতে মিয়ানমারের সীমান্তবর্তী এলাকায় ঘাঁটি গড়ে তৎপরতা চালিয়েছে। এ প্রেক্ষাপটে মোদি ও মিন অং হ্লাইংয়ের দ্বিপক্ষীয় বৈঠকের পর ভারতের পররাষ্ট্রসচিব বিক্রম মিশ্রি বলেন, মিয়ানমারের শান্তি ও স্থিতিশীলতা ভারতের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
গত ৩০ মে পাঁচ দিনের সফরে ভারতে যান মিন অং হ্লাইং। প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর এটিই তাঁর প্রথম বিদেশ সফর। এর আগে ২০২১ সালে সামরিক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে নির্বাচিত সরকারকে ক্ষমতাচ্যুত করে তিনি দেশের নিয়ন্ত্রণ নেন। চলতি বছরের ৩ এপ্রিল তিনি প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন।
বিক্রম মিশ্রি জানান, বৈঠকে দুই নেতা প্রতিরক্ষা ও নিরাপত্তা সহযোগিতা, গুরুত্বপূর্ণ খনিজ সম্পদ ও রেয়ার আর্থ খনিজ, পাশাপাশি আঞ্চলিক সংযোগ অবকাঠামো প্রকল্প নিয়ে আলোচনা করেছেন। একই সঙ্গে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি নোবেলজয়ী অং সান সু চির বিষয়টিও উত্থাপন করেন, যিনি ২০২১ সালের সামরিক অভ্যুত্থানের পর থেকে আটক রয়েছেন।
মিশ্রি বলেন, ভারত মিয়ানমারের সার্বভৌমত্ব ও ভৌগোলিক অখণ্ডতার প্রতি তার সমর্থন পুনর্ব্যক্ত করেছে। উভয় পক্ষই একমত হয়েছে যে, কোনো দেশের ভূখণ্ড যেন অন্য দেশের নিরাপত্তা স্বার্থের বিরুদ্ধে ব্যবহৃত না হয়। এ সময় মিন অং হ্লাইং পুনরায় আশ্বাস দেন যে, মিয়ানমারের মাটি ভারতের নিরাপত্তাবিরোধী কর্মকাণ্ডে ব্যবহার করতে দেওয়া হবে না।
তিনি আরও বলেন, মিয়ানমারের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা পরিস্থিতি দেশটির চলমান শান্তি প্রক্রিয়ার সঙ্গে গভীরভাবে সম্পর্কিত। বিভিন্ন জাতিগত সশস্ত্র গোষ্ঠীকে একটি অভিন্ন রাজনৈতিক প্রক্রিয়ার আওতায় এনে শান্তি প্রতিষ্ঠার যে উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, তাতে ভারতের স্বাভাবিকভাবেই আগ্রহ রয়েছে। কারণ, মিয়ানমারের স্থিতিশীলতা শুধু ভারত-মিয়ানমার সীমান্ত নিরাপত্তার জন্য নয়, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সঙ্গে ভারতের যোগাযোগ ও অর্থনৈতিক স্বার্থের সঙ্গেও জড়িত।
পররাষ্ট্রসচিবের ভাষ্য, মিয়ানমারের নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতা পুরো আসিয়ান অঞ্চলের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ। আঞ্চলিক এই জোটে মিয়ানমার একটি গুরুত্বপূর্ণ সদস্যরাষ্ট্র হিসেবে ভূমিকা পালন করে।
ভারতীয় বিদ্রোহী গোষ্ঠীগুলোর সীমান্তবর্তী এলাকায় তৎপরতার বিষয়টিও বৈঠকে গুরুত্ব পেয়েছে। মিশ্রি জানান, এ বিষয়ে মোদি সরাসরি উদ্বেগের কথা তুলে ধরেন। জবাবে মিন অং হ্লাইং বলেন, ভারত যে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে সে বিষয়ে মিয়ানমার সংবেদনশীল এবং প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে, যাতে এসব কর্মকাণ্ড ভারতের নিরাপত্তার জন্য হুমকি হয়ে না দাঁড়ায়।
মিয়ানমারের সঙ্গে ভারতের যোগাযোগ ও সম্পৃক্ততা নিয়ে মিশ্রি বলেন, এটি দেশটির অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক ব্যবস্থার ওপর মন্তব্য করার উদ্দেশ্যে নয়। বরং ভারত বিশ্বাস করে, সংলাপের মাধ্যমেই সমস্যার সমাধান সম্ভব। প্রতিবেশী রাষ্ট্র হিসেবে ভারত গণতন্ত্র, শান্তি প্রক্রিয়া, অন্তর্ভুক্তিমূলক আলোচনা এবং সব পক্ষের অংশগ্রহণের পক্ষে নিজের অবস্থান তুলে ধরে আসছে।
তিনি বলেন, মিয়ানমারের চলমান সংকটের স্থায়ী সমাধান শেষ পর্যন্ত দেশটির জনগণকেই নিজেদের মধ্যে আলোচনার মাধ্যমে খুঁজে বের করতে হবে। সেই সমাধান হতে হবে মিয়ানমারের নেতৃত্বাধীন এবং মিয়ানমারের বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ।
প্রতিরক্ষা সহযোগিতা প্রসঙ্গে মিশ্রি জানান, দুই দেশের মধ্যে সহযোগিতার প্রধান ক্ষেত্র হলো প্রশিক্ষণ, সক্ষমতা বৃদ্ধি, প্রতিষ্ঠান গঠন এবং জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা কার্যক্রম। ১ হাজার ৬৪৩ কিলোমিটার দীর্ঘ সীমান্তকে কেন্দ্র করে উভয় দেশের গুরুত্বপূর্ণ নিরাপত্তা স্বার্থ রয়েছে, যা নিয়মিত বৈঠকগুলোতে আলোচনায় আসে।
সংযোগ অবকাঠামো প্রকল্পের মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দুটি হলো কালাদান মাল্টিমোডাল ট্রানজিট ট্রান্সপোর্ট প্রকল্প এবং ভারত-মিয়ানমার-থাইল্যান্ড ত্রিপক্ষীয় মহাসড়ক। মিশ্রি বলেন, দীর্ঘদিন ধরে চলমান এসব প্রকল্প নিরাপত্তাজনিত কারণে বিলম্বের মুখে পড়েছে। বিশেষ করে রাখাইন রাজ্যসহ কয়েকটি অঞ্চলে চলমান সংঘাত প্রকল্প বাস্তবায়নে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
তবে তিনি জানান, মিয়ানমার কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ অব্যাহত রয়েছে। যেখানে যুদ্ধবিরতি বা নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সম্ভব হয়েছে, সেখানে কাজও এগিয়েছে। প্রধানমন্ত্রী মোদি বৈঠকে বিষয়টি উত্থাপন করলে মিন অং হ্লাইং প্রকল্পগুলো দ্রুত সম্পন্ন করতে সর্বাত্মক সহযোগিতার আশ্বাস দেন।
ভারত সফরকালে মিন অং হ্লাইং রাষ্ট্রপতি দ্রৌপদী মুর্মু, পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্কর এবং জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা অজিত দোভালের সঙ্গেও সাক্ষাৎ করেছেন। শনিবার বুদ্ধগয়া সফর শেষে তিনি দিল্লিতে পৌঁছান। মঙ্গলবার তাঁর মুম্বাই সফরের কথা রয়েছে।
মন্তব্য করুন