
ভারতের প্রতিরক্ষা শিল্পে এক ঐতিহাসিক অধ্যায়ের সূচনা হয়েছে। দেশটির বহুল আলোচিত ‘অ্যাডভান্সড মিডিয়াম কমব্যাট এয়ারক্রাফট’ (এএমসিএ) প্রকল্পের জন্য আনুষ্ঠানিকভাবে ‘রিকোয়েস্ট ফর প্রপোজাল’ (আরএফপি) জারি করেছে ভারত সরকার। এই প্রকল্পের মাধ্যমে তৈরি হতে যাচ্ছে ভারতের প্রথম নিজস্ব প্রযুক্তিনির্ভর পঞ্চম প্রজন্মের স্টেলথ যুদ্ধবিমান।
সবচেয়ে বড় চমক হিসেবে এবার এই প্রকল্প থেকে সম্পূর্ণভাবে বাদ পড়েছে রাষ্ট্রায়ত্ত বিমান নির্মাতা প্রতিষ্ঠান হিন্দুস্তান অ্যারোনটিকস লিমিটেড (এইচএএল)। এর পরিবর্তে চূড়ান্ত প্রতিযোগিতায় জায়গা পেয়েছে তিনটি শক্তিশালী দেশীয় বেসরকারি প্রতিষ্ঠান ও কনসোর্টিয়াম।
মোট ১৫ হাজার কোটি রুপির বিশাল বাজেটের এই মহাপ্রকল্পে যে প্রতিষ্ঠান বা কনসোর্টিয়াম বিজয়ী হবে, তারা অন্ধ্র প্রদেশের পুট্টাপার্থিতে ৬৫০ একর জমির ওপর নির্মিত একটি সম্পূর্ণ নতুন গ্রিনফিল্ড স্থাপনায় কাজ করার সুযোগ পাবে। সেখানে তারা এএমসিএ যুদ্ধবিমানের প্রাথমিক পাঁচটি প্রোটোটাইপ বা পরীক্ষামূলক সংস্করণ তৈরি করবে।
প্রতিরক্ষা বিশেষজ্ঞদের মতে, সরকারের এই সাহসী সিদ্ধান্ত ভারতের সামরিক বিমান উৎপাদন খাতে বেসরকারি পুঁজিপতি ও প্রাতিষ্ঠানিক অংশগ্রহণের এক নতুন দিগন্তের উন্মোচন করল। একই সঙ্গে এর মাধ্যমে অত্যাধুনিক মহাকাশ ও প্রতিরক্ষা প্রযুক্তিতে বাইরের দেশের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে পুরোপুরি আত্মনির্ভরশীল হয়ে ওঠার জাতীয় প্রচেষ্টাও কয়েক গুণ জোরদার হবে।
এই প্রকল্পের পেছনের ইতিহাস ঘেঁটে জানা যায়, বিগত ২০২৫ সালের মাঝামাঝি সময়ে এই এএমসিএ প্রকল্পের জন্য প্রাথমিক আগ্রহপত্র (ইওআই) আহ্বান করা হয়েছিল। সে সময় ভারতের নামী-দামি মোট সাতটি বড় প্রতিষ্ঠান এই দৌড়ে শামিল হতে আবেদন জমা দেয়। পরবর্তীতে কঠোর ও দীর্ঘ প্রযুক্তিগত মূল্যায়নের পর বাকিদের পেছনে ফেলে এই তিনটি শক্তিশালী বেসরকারি প্রতিষ্ঠানকে চূড়ান্ত আরএফপি তালিকার জন্য মনোনীত করা হয়।
বর্তমানে চূড়ান্ত তালিকায় থাকা এই তিন প্রতিযোগী প্রতিষ্ঠানকে তাদের নিজস্ব নকশা ও উৎপাদন কৌশলের বিস্তারিত প্রস্তাব জমা দেওয়ার জন্য দুই থেকে তিন মাস সময় বেঁধে দেওয়া হয়েছে। সরকারি পরিকল্পনা অনুযায়ী, ২০২৭ সালের জানুয়ারি থেকে মার্চের মধ্যে চূড়ান্ত মূল্যায়ন শেষে বিজয়ী প্রতিষ্ঠানের নাম ঘোষণা এবং আনুষ্ঠানিক চুক্তি সম্পন্ন হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
সবকিছু ঠিকঠাক থাকলে এই প্রকল্পের অধীনে তৈরি প্রথম প্রোটোটাইপ যুদ্ধবিমানটি ২০২৮ থেকে ২০৩২ সালের মধ্যে আকাশে ডানা মেলতে পারে। আর সমস্ত পরীক্ষা-নিরীক্ষা সফলভাবে সম্পন্ন করে ২০৩৫ সালের পর এটি আনুষ্ঠানিকভাবে ভারতীয় বিমানবাহিনীতে যুক্ত হতে শুরু করবে।
এই এএমসিএ যুদ্ধবিমানটি সফলভাবে প্রতিরক্ষা পরিষেবায় যুক্ত হতে পারলে ভারত বিশ্বের বুক ফুলিয়ে পঞ্চম প্রজন্মের স্টিলথ ফাইটার জেট প্রযুক্তিসম্পন্ন হাতেগোনা কয়েকটি দেশের অভিজাত ক্লাবে প্রবেশ করবে। বর্তমানে এই অনন্য তালিকায় কেবল যুক্তরাষ্ট্রের এফ-২২ ও এফ-৩৫, চীনের জে-২০ এবং রাশিয়ার সু-৫৭ যুদ্ধবিমানের আধিপত্য রয়েছে।
বিশেষ করে ইন্টারনাল ওয়েপন বে ব্যবহারের কারণে যুদ্ধবিমানটি রাডারে সহজে শনাক্ত হবে না, যা আধুনিক স্টেলথ প্রযুক্তির অন্যতম প্রধান বৈশিষ্ট্য।
ভারতের প্রতিরক্ষা শিল্পে এই এএমসিএ প্রকল্পকে ভবিষ্যতের গেম-চেঞ্জার হিসেবে দেখা হচ্ছে। দেশটির সামরিক সক্ষমতা, প্রযুক্তিগত আত্মনির্ভরতা এবং বৈশ্বিক প্রতিরক্ষা বাজারে অবস্থান শক্তিশালী করতে এটি বড় ভূমিকা রাখতে পারে।
মন্তব্য করুন