
ইসরাইল বর্তমানে গাজা, লেবানন এবং ইরানের সাথে চলমান সংঘাতে জড়িত থাকার পাশাপাশি অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক অস্থিরতার মধ্যেও রয়েছে। আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই বহুমুখী সংকটের কারণে সরকারের ওপর চাপ ক্রমেই বাড়ছে, বিশেষ করে প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু নেতৃত্বাধীন প্রশাসনের ওপর।
বিশ্লেষকরা বলছেন, ইসরাইলের ভেতরেই এখন একটি “রাজনৈতিক যুদ্ধ” চলছে, যেখানে নিরাপত্তা, বিচার বিভাগ এবং প্রশাসনিক কাঠামোর মধ্যে দ্বন্দ্ব স্পষ্ট হয়ে উঠছে।
জেরুজালেমের একটি সাধারণ ক্যাফেতে ঘটে যাওয়া একটি ঘটনা সম্প্রতি ইসরাইলের রাজনৈতিক বিভাজনের প্রতীক হয়ে উঠেছে। ঔপন্যাসিক অ্যালেক্স সিনক্লেয়ার সেখানে ল্যাপটপে কাজ করছিলেন এবং একটি বিশেষ কিপাহ (ইহুদি ধর্মীয় টুপি) পরেছিলেন, যেখানে ইসরাইল ও ফিলিস্তিন উভয়ের পতাকার চিহ্ন ছিল।
একজন ধর্মীয় ব্যক্তি এটিকে “অবৈধ” দাবি করলে দ্রুত পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছায়। পরে এক নারী পুলিশ কর্মকর্তা কিপাহটিকে অবৈধ ঘোষণা করেন এবং সিনক্লেয়ারকে আটক করার হুমকি দেন। যদিও তিনি আইন মেনে কিপাহটি জমা দেন, তবে তার ল্যাপটপ ও ফোনসহ ব্যক্তিগত জিনিসপত্র বাজেয়াপ্ত করা হয় এবং কিছু সময় তাকে থানার সেলে রাখা হয়।
পরবর্তীতে তার জিনিসপত্র ফেরত দেওয়া হলেও কিপাহ থেকে ফিলিস্তিন অংশটি আলাদা করে ফেলা হয়—যা সামাজিক মাধ্যমে ব্যাপক বিতর্ক তৈরি করে।
সিনক্লেয়ার অভিযোগ করেছেন, “অবৈধ আটক ও সম্পত্তি ধ্বংসের কারণে আমি অভ্যন্তরীণ তদন্ত ইউনিটে অভিযোগ করেছি। তবে খুব আশাবাদী নই।” তার কিপাহের আগে ও পরে ছবিগুলো অনলাইনে ভাইরাল হয়ে ইসরায়েলি গণমাধ্যমের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমেও ছড়িয়ে পড়ে। তিনি বলেন, “আমি পরিবর্তনের ছোট অনুঘটক হতে পেরে খুশি, তবে এতো মনোযোগ দেখে অপরাধবোধও কাজ করছে; আমরা এখনও আরও গুরুতর পুলিশি কর্মকাণ্ড উপেক্ষা করছি।”
বিশ্লেষকদের মতে, সিনক্লেয়ারের কিপাহ এখন ইসরায়েলের ভেতরের রাজনৈতিক যুদ্ধের প্রতীক। এটি ফিলিস্তিন-বিরোধী গোঁড়ামি, পুলিশের রাজনৈতিকীকরণ, আদালতের অবমাননা এবং ভিন্নমতাবলম্বী ইহুদিদের দমনকে তুলে ধরে। নেতানিয়াহু এমন পরিস্থিতি তৈরি করছেন যাতে সরকার পরবর্তী নির্বাচনে হেরে গেলেও নির্বাচনকে সন্দেহের মধ্যে রাখা যায়।
দ্য জেরুজালেম রিপোর্ট-এর অবসরপ্রাপ্ত সম্পাদক হিরশ গুডম্যান জানান, “নেতানিয়াহু ২০২২ সালে বেন-গভিরকে পুলিশের দায়িত্বে নিয়োগ দিয়েছেন এবং সম্প্রতি শিন বেতের কমান্ডে একজন উগ্র সেটলারকে যুক্ত করেছেন।” তিনি বলেন, সরকার সুপ্রিম কোর্ট ও অ্যাটর্নি জেনারেলের ওপর ক্রমাগত আক্রমণ চালাচ্ছে।
ইসরায়েল ডেমোক্র্যাসি ইনস্টিটিউটের প্রেসিডেন্ট ইয়োহানান প্লেসনার জানান, নেতানিয়াহুর সরকার বিচার বিভাগ ও বেসামরিক প্রশাসনকে দুর্বল করার জন্য প্রায় ৮০টি উদ্যোগ নিয়েছে। অ্যাটর্নি জেনারেল গালি বাহারেভ-মিয়ারা ৬৮ পৃষ্ঠার পিটিশন দিয়ে বেন-গভিরের বরখাস্ত দাবি করেছেন। অভিযোগ, তিনি পুলিশকে চরমপন্থী দিকের দিকে ঠেলছেন।
বেন-গভিরের দায়িত্ব নেওয়ার পর ইসরায়েলি আরব শহরগুলোর নিরাপত্তা শিথিল হয়ে ৭০০-এর বেশি নাগরিক নিহত হয়েছেন। ডেমোক্র্যাটিক পার্টির নেসেট সদস্য গিলাদ কারিভ বলেন, “এটি ব্যর্থতা নয়, এটি সুপরিকল্পিত ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত অবহেলা।”
গত ১৫ এপ্রিল পিটিশন সুপ্রিম কোর্টে পেশ হলে সরকারের আইনজীবী ডেভিড পিটার ‘অ্যাক্টিয়ন’-এর উদাহরণ টেনে আদালতকে পরোক্ষ হুমকি দেন। আদালত চূড়ান্ত রায় দেননি, বরং সমঝোতার নির্দেশ দিয়েছেন।
প্লেসনার সতর্ক করে বলেন, “সাধারণ পুলিশের পেশাদারিত্ব থাকলেও গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানের বৈধতা ধ্বংসের প্রক্রিয়া গভীর উদ্বেগের। নির্বাচনের পর মানুষ বলবে, এই ফলাফল সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণ চায়নি, বরং সুপ্রিম কোর্ট চেয়েছে।”
বিশ্লেষকদের মতে, সিনক্লেয়ারের কিপাহর ঘটনা শুধু প্রতীক নয়; মূল উদ্দেশ্য হলো ফিলিস্তিনিদের বাদ দেওয়া, যা ইসরায়েলি গণতন্ত্রের জন্য টেকসই নয়।
সূত্র: নিউ ইয়র্কার
মন্তব্য করুন