
প্রায় ১০ সপ্তাহের যুক্তরাষ্ট্র–ইরান যুদ্ধের পর যখন একটি সম্ভাব্য যুদ্ধবিরতির আলোচনা সামনে আসছে, তখন যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ ও বৈদেশিক নীতিতে নতুন করে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের বক্তব্য ও সিদ্ধান্তকে কেন্দ্র করে ওয়াশিংটনের দীর্ঘদিনের মিত্রদের মধ্যে আস্থার ঘাটতি স্পষ্ট হয়ে উঠছে।
ইউরোপ, মধ্যপ্রাচ্য এবং এশিয়া–প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের বহু দেশ এখন মনে করছে, ভবিষ্যতে কোনো বড় সংকটে যুক্তরাষ্ট্র আগের মতো নির্ভরযোগ্য নাও থাকতে পারে। এই শঙ্কা থেকেই কিছু ঐতিহ্যবাহী মিত্র দেশ বিকল্প কৌশল ও নিরাপত্তা ব্যবস্থা গড়ে তোলার দিকে ঝুঁকছে। ফলে যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বাধীন বৈশ্বিক জোট কাঠামোতে দীর্ঘমেয়াদি পরিবর্তনের সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।
একই সঙ্গে চীন ও রাশিয়ার মতো শক্তিগুলো এই পরিস্থিতিকে কৌশলগত সুযোগ হিসেবে দেখছে এবং নিজেদের প্রভাব বাড়ানোর চেষ্টা করছে।
যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে মিত্রদের পর্যাপ্ত সহযোগিতা না পাওয়ার অভিযোগ তুলেছেন ট্রাম্প। এ বিষয়ে হোয়াইট হাউসের মুখপাত্র আনা কেলি জানিয়েছেন, ট্রাম্প স্পষ্টভাবে ন্যাটোসহ অন্যান্য মিত্রদের প্রতি অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন। তার দাবি, ইরান যুদ্ধের সময় ইউরোপীয় কিছু দেশ মার্কিন সামরিক ঘাঁটি ব্যবহারের অনুরোধ প্রত্যাখ্যান করেছে।
ট্রাম্প এর আগে যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমারকেও উপহাস করেছেন। এমনকি ব্রিটিশ পণ্য আমদানিতে বড় ধরনের শুল্ক আরোপের হুমকিও দিয়েছেন তিনি। পেন্টাগন তো আরও এক ধাপ এগিয়ে ন্যাটো সদস্য হিসেবে স্পেনের সদস্যপদ স্থগিত করা এবং ফকল্যান্ড দ্বীপপুঞ্জের ওপর যুক্তরাজ্যের দাবির স্বীকৃতি পুনর্বিবেচনার কথা তুলেছে।
জবাবে ইউরোপীয় সরকারগুলো নিজেদের মধ্যে সহযোগিতা বৃদ্ধি করার ওপর জোর দিচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্রের ওপর নির্ভরশীলতা কমাতে তারা নিজেদের প্রতিরক্ষা বাজেট বৃদ্ধি করা এবং যৌথভাবে অস্ত্র তৈরির পরিকল্পনা করছে। জাপানের সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী তাকেশি ইওয়ায়া বলেন, ‘সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো, যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি আস্থা ও সম্মান দিন দিন কমছে। এটি পুরো অঞ্চলে দীর্ঘস্থায়ী ছায়া ফেলতে পারে।’
এদিকে চীন ও রাশিয়া এই পরিস্থিতির ওপর গভীর নজর রাখছে। যুদ্ধের কারণে জ্বালানির উচ্চমূল্য থেকে রাশিয়া লাভবান হচ্ছে। অন্যদিকে চীন নিজেকে ট্রাম্পের চেয়েও বেশি ‘নির্ভরযোগ্য’ বৈশ্বিক অংশীদার হিসেবে তুলে ধরার সুযোগ নিচ্ছে।
আগামী সপ্তাহে ট্রাম্পের চীন সফরের কথা রয়েছে। বিশ্লেষকেরা মনে করছেন, মিত্রদের সঙ্গে ট্রাম্পের এই ক্রমবর্ধমান দূরত্ব বৈশ্বিক ভূরাজনীতিতে যুক্তরাষ্ট্রের একক আধিপত্যকে এক অনিশ্চিত ভবিষ্যতের দিকে ঠেলে দিচ্ছে।
ইরানের সঙ্গে ট্রাম্পের এই যুদ্ধ বিশ্বরাজনীতিতে যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থানের স্থায়ী কোনো পরিবর্তন আনবে কি না, তা এখনো স্পষ্ট নয়। তবে অধিকাংশ বিশ্লেষক মনে করেন, ক্ষমতা গ্রহণের পর থেকে ট্রাম্পের খামখেয়ালি আচরণ বৈশ্বিক শৃঙ্খলাকে ওলটপালট করে দিয়েছে। বিশেষ করে যুদ্ধের সময় ট্রাম্পের দাবিগুলো না মানায় ন্যাটোর ওপর তার ক্ষোভ মার্কিন মিত্র জোটগুলোকে আরও দুর্বল করে দেবে।
মন্তব্য করুন