সোমবার
২৯ জুন ২০২৬, ১৫ আষাঢ় ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সোমবার, ২৯ জুন ২০২৬, ১৫ আষাঢ় ১৪৩৩

মমতার পরাজয়ে কি আঞ্চলিক নারী নেতৃত্বের যুগ শেষ হচ্ছে?

আন্তর্জাতিক ডেস্ক
প্রকাশ : ০৬ মে ২০২৬, ০২:৫৫ পিএম
মমতা ব্যানার্জীর উত্থান ছিল একেবারেই আলাদা।

ভারতের আঞ্চলিক রাজনীতিতে নারী নেতৃত্বের শক্তিশালী ধারার অন্যতম শেষ প্রতীক হিসেবে বিবেচিত হতো মমতা ব্যানার্জীকে। জে জয়ললিতা ও কুমারী মায়াবতীর পর তিনিই ছিলেন সেই প্রভাবশালী নেত্রী, যিনি দীর্ঘদিন একক নেতৃত্বে একটি রাজ্যের রাজনীতি নিয়ন্ত্রণ করেছেন।

তবে সাম্প্রতিক পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচনের ফলাফল সেই ধারাবাহিকতায় বড় ধরনের পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিয়েছে। নির্বাচনে বিজেপি ২০৭টি আসন জিতে স্পষ্ট সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করেছে, যেখানে তৃণমূল কংগ্রেস নেমে এসেছে মাত্র ৮০ আসনে।

সবচেয়ে প্রতীকী ধাক্কা এসেছে ভবানীপুর কেন্দ্র থেকে, যেখানে মমতা ব্যানার্জী নিজেই পরাজিত হয়েছেন তার সাবেক সহযোগী এবং বর্তমানে বিজেপির নেতা শুভেন্দু অধিকারীর কাছে। বিশ্লেষকদের মতে, এটি শুধুমাত্র একটি আসন হারানো নয়, বরং তার দীর্ঘ রাজনৈতিক আধিপত্যে বড় আঘাত।

‘অপরাজেয়’ ইমেজে ফাটল মমতা ব্যানার্জী দীর্ঘদিন ধরে ‘লড়াকু’ নেত্রী হিসেবে পরিচিত ছিলেন। ৩৪ বছরের বাম শাসনের অবসান ঘটিয়ে ক্ষমতায় আসা, তৃণমূল পর্যায়ে শক্তিশালী সংগঠন গড়ে তোলা এবং জনমুখী নীতির মাধ্যমে তিনি জনমানসে ‘দিদি’ হিসেবে বিশেষ অবস্থান তৈরি করেছিলেন।

কিন্তু এবারের নির্বাচনে সেই ইমেজ কার্যকর হয়নি। বরং তার সরকারের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ, প্রশাসনিক দুর্বলতা এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে প্রশ্ন ভোটারদের একাংশকে প্রভাবিত করেছে।

ভরাডুবির পেছনের কারণ বিশ্লেষকদের মতে, তৃণমূলের এই পরাজয়ের পেছনে একাধিক ফ্যাক্টর একসঙ্গে কাজ করেছে। শিক্ষা ও পৌর নিয়োগে দুর্নীতির অভিযোগ, রেশন কেলেঙ্কারি, দলীয় নেতাদের বিরুদ্ধে ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগ ও নারী নির্যাতনের ঘটনাকে ঘিরে আইনশৃঙ্খলা নিয়ে উদ্বেগ বিরোধীদের অভিযোগ অনুযায়ী ‘তোষণের রাজনীতি’ মতো নানা অভিযোগ ছিল।

এসব ইস্যুতে সাধারণ মানুষের মধ্যে ক্ষোভ তৈরি হয়েছিল, যা নির্বাচনের ফলাফলে প্রতিফলিত হয়েছে।

শুধু শাসকদলের দুর্বলতা নয়, বিরোধী বিজেপির কৌশলগত পরিবর্তনও বড় ভূমিকা রেখেছে। দলটি এবার স্থানীয় ইস্যুভিত্তিক প্রচারণা, শক্তিশালী বুথ ম্যানেজমেন্ট এবং সংগঠনের বিস্তারে বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছে। জাতীয় পর্যায়ের রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে তাদের উপস্থিতি রাজ্যের রাজনীতিকে নতুনভাবে প্রতিযোগিতামূলক করে তুলেছে।

বিশ্লেষকরা বলছেন, আগে পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতি অনেকটাই স্থানীয় নেটওয়ার্কনির্ভর ছিল। কিন্তু এখন সেই কাঠামো ভেঙে গিয়ে জাতীয় রাজনীতির প্রভাব স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।

নারী নেতৃত্বের ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট ভারতীয় রাজনীতিতে নারী নেতৃত্ব নতুন কিছু নয়। ইন্দিরা গান্ধী থেকে শুরু করে সুচেতা কৃপালনী— অনেকেই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন। তবে আঞ্চলিক রাজনীতিতে জে জয়ললিতা, মায়াবতী ও মমতা ব্যানার্জীর উত্থান ছিল একেবারেই আলাদা।

তিনজনের মধ্যেই কিছু মিল রয়েছে— ব্যক্তিনির্ভর দল গঠন, তৃণমূল পর্যায়ে শক্তিশালী সংগঠন, জনমুখী কল্যাণমূলক রাজনীতি ও পুরুষ-প্রধান রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে শক্ত অবস্থান তৈরি।

তবে তাদের রাজনৈতিক পথ ছিল ভিন্ন। জয়ললিতা উঠে এসেছেন চলচ্চিত্র জগত থেকে, মায়াবতী কাস্ট-ভিত্তিক রাজনীতির মাধ্যমে শক্তি অর্জন করেছেন, আর মমতা ব্যানার্জী আন্দোলন ও জনসংযোগের রাজনীতির ওপর দাঁড়িয়ে নিজের অবস্থান তৈরি করেছেন— কোনো ‘গডফাদার’ ছাড়াই।

জয়ললিতার মৃত্যু এবং মায়াবতীর রাজনৈতিক প্রভাব কমে আসার পর অনেকেই মনে করতেন, এই ধারার একমাত্র শক্তিশালী প্রতিনিধি মমতাই। কিন্তু এবারের পরাজয় সেই ধারণায় প্রশ্ন তুলেছে।

বিশ্লেষকদের মতে, এটি শুধু ব্যক্তিগত ব্যর্থতা নয়, বরং আঞ্চলিক রাজনীতির কাঠামোগত পরিবর্তনেরও প্রতিফলন। কেন্দ্রীয় শক্তির উত্থান, রাজনৈতিক প্রতিযোগিতার বৃদ্ধি এবং ভোটারদের প্রত্যাশার পরিবর্তন সব মিলিয়ে আগের মতো একক আধিপত্য ধরে রাখা এখন অনেক কঠিন।

শেষ না কি নতুন শুরু? তবে মমতা ব্যানার্জীর রাজনৈতিক ইতিহাস বলছে, তাকে সহজে ‘শেষ’ বলা যায় না। ২০০৪-২০০৬ সালের ধাক্কার পরও তিনি সিঙ্গুর-নন্দীগ্রাম আন্দোলনের মাধ্যমে শক্তিশালীভাবে ফিরে এসেছিলেন। এবারও তিনি পরাজয় মানতে নারাজ। তার দাবি, নির্বাচন কমিশনের সহায়তায় বিরোধীরা জয় পেয়েছে, কিন্তু নৈতিকভাবে জয় তাদেরই। তিনি স্পষ্ট করে জানিয়েছেন, তিনি পদত্যাগ করবেন না এবং রাজনৈতিক লড়াই চালিয়ে যাবেন।

মমতা ব্যানার্জীর এই পরাজয়, তার রাজনৈতিক ক্যারিয়ারের ইতি টানবে কি না সে নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

কলকাতার সেন্টার ফর স্টাডিজ ইন সোশ্যাল সায়েন্সেসের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক মইদুল ইসলাম বলেছেন, নারী মুখ্যমন্ত্রী হিসাবে মমতার এই পরাজয় অবশ্যই রাজনৈতিক দিক থেকে গুরুত্বপূর্ণ। সাম্প্রতিক অতীতে আমরা ন্যাশানাল পার্টিগুলোর মধ্যে শীলা দিক্ষিত, বসুন্ধরা রাজের মতো মুখ্যমন্ত্রীদের দেখেছি। কিন্তু আঞ্চলিকস্তরে ক্ষমতাশালী নেত্রী হিসাবে জয়ললিতা, মায়াবতী ও মমতাকেই ধরা হয়েছে। এদের মধ্যে জয়ললিতার মৃত্যু হয়েছে। নির্বাচনে হারের সম্মুখীন হওয়ার পর মায়াবতীর পুনরুত্থান হয়নি। মমতার ক্ষেত্রে কী হয় সেটাই দেখার।

এই প্রসঙ্গে একটা উল্লেখযোগ্য বিষয় উল্লেখ করেছেন দিল্লির পলিটিক্যাল ইকোনমিস্ট ড. রোহিত জ্যোতিষ। তার কথায়, আমরা যদি মমতাকে জয়ললিতা ও মায়াবতীর সঙ্গে তুলনা করি, তাহলে বলা দরকার এরা অত্যন্ত কেন্দ্রীভূত আঞ্চলিক নেতৃত্বের অংশ ছিলেন যেখানে তাদের কর্তৃত্ব গড়ে উঠেছিল দলের সংগঠন এবং স্থানীয় রাজনৈতিক নেটওয়ার্কের উপর কড়া নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে।

ওপি জিন্দাল গ্লোবাল ইউনিভার্সিটির ড. জ্যোতিষ বলেছেন, এখন আমরা সেই ভারসাম্যের এক ধরনের বিচ্যুতি দেখছি। এখন আঞ্চলিক রাজনীতিতে জাতীয় স্তরে সমর্থিত প্রতিদ্বন্দ্বীর উত্থান ঘটেছে, যা এই প্রতিযোগিতাকে অনেক বেশি উন্মুক্ত ও তীব্র করে তুলেছে। এটা তামিলনাড়ুতে জয়ললিতা যে বিরোধী দলের মুখোমুখি হয়েছিলেন তার থেকে অনেকটাই আলাদা। মায়াবতীর ক্ষেত্রে আবার বিরোধিতা সর্বদাই স্থিতিশীল স্থানীয় জোটকে কেন্দ্র করে দেখা গিয়েছে। আমার মনে হয় মমতার এই পরাজয় তার ব্যক্তিগত পতন নয়। সেন্ট্রালাইজড লোকাল লিডারশিপকে এখন আরও অনেক বেশি পরিমাণে প্রতিযোগিতামূলক রাজনৈতিক পরিবেশের সম্মুখীন হতে হচ্ছে।

বিষয়টি ব্যাখ্যা করে ড. কুমার বলছেন, বর্তমান ফলাফল উল্লেখযোগ্যভাবে কাঠামোগত এবং রাজনৈতিক প্রতিবন্ধকতাকেই দর্শায়। গভীর সরকার-বিরোধী মনোভাব, মমতা সরকারের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ এবং বিশেষ নিবিড় সংশোধন (এসআইআর) চলাকালীন ভোটার তালিকা থেকে ভোটারদের নাম বাদ দেওয়ার মতো বিষয়গুলো নির্বাচনী পরিবেশকে রূপ দিয়েছে বলে মনে হচ্ছে।

বিধানসভা নির্বাচনের ফলাফলে মমতা ব্যানার্জীর ক্যারিয়ারে ইতি হবে কি না এই প্রসঙ্গে অধ্যাপক মইদুল ইসলাম বলেছেন, এর আগে ২০০৪-২০০৬ সালে সেটব্যাকের পর অনেকেই মনে করেছিলেন তার পলিটিক্যাল অবিচ্যুয়ারি লেখার সময় হয়েছে। উনি আর ফিরবেন না। কিন্তু ২০০৬ সালের পর থেকে সিঙ্গুর-নন্দীগ্রামে আন্দলনের হাত ধরে আবার তার রাজনৈতিক পুনরুত্থান হয়। সেই মমতাই আবার ২০২৬ সালে হারলেন। তার কাছে এখন অবকাশ রয়েছে, সরকার চালাতে হচ্ছে না। এই সময়কে তিনি কীভাবে ব্যবহার করবেন, সাংগঠনিক ভিতকে আবার পোক্ত করবেন, না কি রাজনৈতিক সন্ন্যাস নেবেন না কি আবার ঘুরে দাঁড়াবেন সেটা দেখার। তবে উনি লড়াই করে বারবার ফেরত এসেছেন কাজেই কী হয় সেটা দেখার জন্য অপেক্ষা করতে হবে।

একই মত পোষণ করেন ড. রোহিত জ্যোতিষ, জয়ললিতা, মায়াবতীর সঙ্গে তুলনা করলে আমার মনে হয় না মমতার এই পতন পার্মানেন্ট। এখনই তার ক্যারিয়ারে ইতি হবে ভাবারও কারণ নেই।

মমতা ব্যানার্জীও অবশ্য হার মানছেন না বলে জানিয়েছেন। এই ফল কে না মেনে তিনি বলেছেন, উই উইল ফাইট ইট আউট।

এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন এই পরাজয়ের পর মমতা কি আবার সংগঠনকে পুনর্গঠন করে ঘুরে দাঁড়াতে পারবেন? নাকি ভারতীয় আঞ্চলিক রাজনীতিতে নারী নেতৃত্বের এক যুগের কার্যত অবসান ঘটতে যাচ্ছে?

সূত্র: বিবিসি বাংলা

আমাদের ইউটিউব চ্যানেল সাবস্ক্রাইব করুন

মন্তব্য করুন

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

মহেশপুরে গাজীরননেছা বালিকা বিদ্যালয়ে বৃক্ষরোপণ কর্মসূচি উপলক্ষে র‌্যালি ও আলোচনা সভা

মোরেলগঞ্জে ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক কৃষকদের মাঝে নারিকেল চারা ও কৃষি প্রণোদনা বিতরণ

শৈলকুপায় পাঁচ দিনের ব্যবধানে দুই কিশোরের মৃত্যু

সুনামগঞ্জ পৌরসভায় ৫৪ কোটি ১৫ লাখ টাকার বাজেট ঘোষণা

মণিরামপুরে সেতুর কাজ থমকে, দুর্ভোগে ২০ গ্রাম

আগামী ইউপি নির্বাচন ঘিরে মণিরামপুরে বিএনপির ঐক্যের শপথ

নড়াইলে গণতন্ত্র অলিম্পিয়াড, অংশ নিলেন ২৭৫ শিক্ষার্থী

যশোর নওয়াপাড়ায় কৃষক দলের কর্মী সমাবেশ অনুষ্ঠিত

কেশবপুরে মাইকেল মধুসূদনের ১৫৩তম মৃত্যুবার্ষিকী পালিত

কেশবপুরে মাদ্রাসার কমিটি গঠন নিয়ে বিরোধ, সংবাদ সম্মেলনে মারধরের অভিযোগ

যশোরে পৃথক অভিযানে মাদক ও চাকুসহ তিনজন আটক

যশোরে আওয়ামী লীগের দুই কর্মীর বিরুদ্ধে বিএনপি নেতাকে হত্যার হুমকির অভিযোগ, তদন্তে পুলিশ

হেরোইনের মামলায় বেনাপোলের জামাল হোসেনের যাবজ্জীবন কারাদণ্ড

যশোরে যত্রতত্র গাড়ি পার্কিং রোধে ট্রাফিক পুলিশের বিশেষ অভিযান শুরু

পলাশবাড়ীতে মারধর ও বাড়িঘর ভাঙচুরের প্রতিবাদে সংবাদ সম্মেলন

রাম মন্দিরের অনুদান আত্মসাৎ, বিপাকে মোদি সরকার

সুনামগঞ্জ মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল দ্রুত চালুর দাবিতে বিক্ষোভ-সমাবেশ

শৈলকূপায় বিদ্যালয়ের আঙিনায় বৃক্ষরোপণ কর্মসূচির উদ্বোধন

যশোর জেনারেল হাসপাতালে দালাল চক্রের সন্দেহে একজন আটক

চৌগাছায় ট্রলির সঙ্গে মোটরসাইকেল সংঘর্ষে স্কুলশিক্ষক আহত

X