
ভবানীপুর বিধানসভা আসনে ২০২৬ সালের নির্বাচনে এক বড় রাজনৈতিক পরিবর্তন দেখা গেছে। দীর্ঘদিনের শক্ত ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত এই আসনে এবার পরাজিত হয়েছেন তৃণমূল কংগ্রেস নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়।
গত প্রায় দেড় দশক ধরে ভবানীপুর ছিল তৃণমূল কংগ্রেসের অন্যতম নিরাপদ আসন। ২০১১ সাল থেকে এই এলাকায় ধারাবাহিকভাবে জয় পেয়ে এসেছে দলটি। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়সহ দলের অন্যান্য প্রার্থীরাও বড় ব্যবধানে জয়লাভ করেছেন।
রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, ভবানীপুরকে দীর্ঘদিন ধরে তৃণমূলের “অকেলনীয় ঘাঁটি” হিসেবে ধরা হতো। তবে ২০২৬ সালের ফলাফল সেই সমীকরণ বদলে দিয়েছে।
২০২১ সালের উপনির্বাচনের পর মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় আবারও ভবানীপুরে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন। সেখানে গিয়ে রাস্তার পাশে বসে ছোট ছোট সভা করা, চা খাওয়া, মানুষের সঙ্গে আড্ডা—এভাবেই তিনি মানুষের আরো কাছাকাছি পৌঁছানোর চেষ্টা করেছিলেন।
স্থানীয় মানুষের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ, ছোট সভা, রাস্তায় সাধারণ মানুষের সঙ্গে আলাপচারিতার মাধ্যমে তিনি জনসংযোগ বাড়ানোর চেষ্টা করেন। তবে এসব প্রচার সত্ত্বেও ভোটের ফলাফল প্রত্যাশিত হয়নি।
তখন বোঝা যায়নি, পথটা এত কঠিন হবে। কিন্তু ৪ মে ফল প্রকাশের দিন সেটা স্পষ্ট হয়ে যায়। ভোট গণনার দিন শাখাওয়াত স্মৃতি হলের গণনাকেন্দ্রে সকাল থেকেই হাড্ডাহাড্ডি লড়াই চলছিল। রাতে ২০ দফা গণনা শেষে দেখা যায়, মমতা পেয়েছেন ৫৮ হাজার ৩৪৯ ভোট। আর তার প্রতিদ্বন্দ্বী শুভেন্দু অধিকারী পেয়েছেন ৭৩ হাজার ৪৬৩ ভোট। ফলে প্রায় ১৫ হাজার ভোটে হেরে যান মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়।
কিন্তু কেন এই হার? প্রথমত, ভবানীপুরে সব ধর্মের মানুষের বসবাস, বিশেষ করে অনেক অবাঙালি ভোটার আছেন। তাদের বড় একটি অংশ বিজেপিকে ভোট দিয়েছেন।
দ্বিতীয়ত, এখানে অনেক অভিজাত আবাসন রয়েছে। এসব জায়গার মানুষ সাধারণত খুব বেশি মিশেন না। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় সেখানে গিয়ে প্রচার করলেও তেমন প্রভাব ফেলতে পারেননি।
তৃতীয়ত, এই আবাসনগুলোতেই অন্যভাবে প্রচার করেছেন অমিত শাহ। প্রায় ৫০টির মতো আবাসনে প্রচার চালিয়ে বিজেপির পক্ষে ভোট টানতে সক্ষম হয়েছেন।
১৯৮৪ সালের লোকসভা নির্বাচন থেকে যে জয়ের ধারা শুরু হয়েছিল, ২০২৬ সালে এসে তা থেমে গেল। ৪ মের রাত মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনের এক কঠিন ও হতাশার মুহূর্ত হিসেবে ধরা পড়ল।
এসআইআরে লাখ লাখ ভোটারের নাম বাদ পড়েছিল। এর পরেই নির্বাচন কমিশনকে চ্যালেঞ্জ জানিয়েছিলেন মমতা। তিনি বলেছিলেন, ‘এই লড়াই আমি একাই লড়ব।’ এসআইআর লড়াই লড়েছিলেন সুপ্রিম কোর্ট পর্যন্ত। তবে তা ছাব্বিশের ভোট ময়দানে বিন্দুমাত্র প্রভাব ফেলল না। বরং মানুষ গেরুয়া শিবিরের ভোটবাক্স ভরিয়ে দিয়েছেন।
নিজের ভবানীপুরেই ১৫ হাজারের বেশি ভোট পরাজয়ের মুখে পড়তে হলো ‘ঘরের মেয়েকে’। রাজ্যের মানুষ দেখল, রাজনৈতিক জীবনের শেষদিকে যেন এক ট্র্যাজিক চরিত্র হয়ে উঠেছেন মমতা। ১৯৮৪ সাল থেকে চলমান এক দীর্ঘ রাজনৈতিক জয়ের ধারায় এবার প্রথম বড় ধাক্কা খেলেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। ভবানীপুরের এই ফলাফল রাজ্যের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ সমীকরণে নতুন প্রশ্ন তুলেছে।
মন্তব্য করুন