
মধ্যপ্রাচ্যের চলমান অস্থিরতা নিরসনের প্রেক্ষাপটে ইরানের ওপর চাপ বাড়াতে নতুন করে হাজার হাজার সেনাসদস্য মোতায়েন করছে যুক্তরাষ্ট্র। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসন তেহরানকে একটি স্থায়ী চুক্তিতে আনতে সামরিক ও অর্থনৈতিক—উভয় দিক থেকেই চাপ প্রয়োগের কৌশল গ্রহণ করেছে বলে জানা গেছে।
মার্কিন কর্মকর্তাদের মতে, এই পদক্ষেপের মূল উদ্দেশ্য হলো একদিকে ইরানকে আলোচনার টেবিলে নমনীয় করা, অন্যদিকে যুদ্ধবিরতি ভেঙে গেলে সম্ভাব্য বড় ধরনের সামরিক অভিযান বা স্থল যুদ্ধের প্রস্তুতিও বজায় রাখা।
মার্কিন প্রতিরক্ষা দপ্তর সূত্রে জানা গেছে, নতুন মোতায়েনের অংশ হিসেবে বিমানবাহী রণতরি ‘ইউএসএস জর্জ এইচ ডব্লিউ বুশ’ এবং এর সঙ্গে থাকা যুদ্ধজাহাজগুলোতে প্রায় ৬ হাজার সেনা অবস্থান করছেন। পাশাপাশি বক্সার অ্যামফিবিয়াস রেডি গ্রুপ এবং ১১তম মেরিন এক্সপেডিশনারি ইউনিটের আরও ৪ হাজার ২০০ মেরিন চলতি মাসের শেষ নাগাদ এই অঞ্চলে পৌঁছানোর কথা রয়েছে।
বর্তমানে ইরানে চলমান অভিযানে প্রায় ৫০ হাজার মার্কিন সেনা যুক্ত রয়েছে, নতুন এই সদস্যরা তাদের শক্তি আরও বৃদ্ধি করবে। বিশেষ করে ২২ এপ্রিল ইরানের সাথে বিদ্যমান দুই সপ্তাহের যুদ্ধবিরতির মেয়াদ শেষ হওয়ার আগেই এই বিশাল সামরিক উপস্থিতি নিশ্চিত করছে পেন্টাগন।
প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানকে অর্থনৈতিকভাবে পঙ্গু করে দিতে দেশটির বন্দরগুলোর ওপর কঠোর নৌ-অবরোধ আরোপের ঘোষণা দিয়েছেন। তার মূল লক্ষ্য হলো তেহরানকে হরমুজ প্রণালি উন্মুক্ত রাখতে বাধ্য করা এবং ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্সের নেতৃত্বে আলোচনার মাধ্যমে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি পুরোপুরি বন্ধ করা।
ট্রাম্প সম্প্রতি ফক্স বিজনেসকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন যে, ইরানের সাথে এই সংঘাত ‘খুব দ্রুত’ শেষ হতে পারে। তিনি মনে করেন, ইরানকে পারমাণবিক অস্ত্র থেকে দূরে রাখা গেলে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের দাম যুদ্ধপূর্ববর্তী পর্যায়ে নেমে আসবে, যা মার্কিন অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতেও ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে।
যুক্তরাষ্ট্রের এই কঠোর অবস্থানের বিপরীতে ইরানও পাল্টা হুমকি দিয়ে রেখেছে। দেশটির সামরিক কমান্ডার মেজর জেনারেল আলী আবদোল্লাহি হুঁশিয়ারি দিয়েছেন যে, মার্কিন অবরোধ অব্যাহত থাকলে তারা পারস্য উপসাগর, ওমান উপসাগর ও লোহিত সাগর দিয়ে সব ধরনের আন্তর্জাতিক বাণিজ্য বন্ধ করে দেবে।
ইরানের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, নিজেদের জাতীয় সার্বভৌমত্ব রক্ষায় তারা যেকোনো শক্তিশালী পদক্ষেপ নিতে প্রস্তুত। এমন উত্তেজনাকর পরিস্থিতিতে হোয়াইট হাউসের প্রেস সেক্রেটারি ক্যারোলিন লেভিট জানিয়েছেন, ইরান যদি তাদের পারমাণবিক উচ্চাকাঙ্ক্ষা ত্যাগ না করে, তবে ট্রাম্প প্রশাসন সব ধরনের কঠোর বিকল্প ব্যবহারের পথ খোলা রেখেছে।
বর্তমানে মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের তিনটি শক্তিশালী বিমানবাহী রণতরি অবস্থান করছে, যার প্রতিটিতে রয়েছে কয়েক ডজন অত্যাধুনিক যুদ্ধবিমান। ইউএসএস আব্রাহাম লিংকন এবং ইউএসএস জেরাল্ড আর ফোর্ডের সাথে এখন যোগ দিচ্ছে ইউএসএস জর্জ এইচ ডব্লিউ বুশ। সামরিক বিশ্লেষকদের মতে, অতিরিক্ত এই যুদ্ধজাহাজ ও সেনাসদস্য মোতায়েনের ফলে মার্কিন কমান্ডের হাতে যুদ্ধের বিকল্প অনেক বেড়ে যাবে। যদি কূটনৈতিক আলোচনা ব্যর্থ হয়, তবে এই বিশাল সামরিক শক্তি ইরানকে সামরিকভাবে মোকাবিলায় যুক্তরাষ্ট্রকে সুবিধাজনক অবস্থানে রাখবে। মূলত অবরোধ ও সামরিক উপস্থিতির দ্বিমুখী চাপে ইরানকে একটি প্রতিকূল চুক্তিতে সই করতে বাধ্য করাই ওয়াশিংটনের বর্তমান কৌশল।
মন্তব্য করুন