
যুদ্ধের ‘কলাটেরাল ড্যামেজ’ বা আনুষঙ্গিক ক্ষয়ক্ষতি সাধারণত বেসামরিক প্রাণহানি ও তথ্যগত সত্যের ক্ষতির সঙ্গে সম্পর্কিত। তবে সাম্প্রতিক ভূ-রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে সেই প্রভাব এবার গিয়ে পড়েছে বিশ্বের অন্যতম শক্তিশালী সামরিক জোট ন্যাটোর ওপর। ইরানের বিরুদ্ধে ইসরায়েলের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের ঘনিষ্ঠ সামরিক অবস্থান ইউরোপীয় মিত্রদের মধ্যে গভীর উদ্বেগ তৈরি করেছে।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ন্যাটোকে নিয়ে কঠোর সমালোচনা করেছেন। তার অভিযোগ, কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালী পুনরায় চালু করার প্রচেষ্টায় ইউরোপীয় মিত্ররা যুক্তরাষ্ট্রকে পর্যাপ্ত সহায়তা দিচ্ছে না। ট্রাম্প এটিকে ‘বিশ্বাসঘাতকতা’ হিসেবে উল্লেখ করেন।
উল্লেখ্য, যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে তেহরান এই গুরুত্বপূর্ণ জলপথটি সাময়িকভাবে বন্ধ করে দিয়েছিল, যা বর্তমানে দুই সপ্তাহের যুদ্ধবিরতির ফলে আংশিকভাবে স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে এসেছে।
পরিস্থিতির অবনতির মধ্যে ন্যাটোর মহাসচিব মার্ক রুটে হোয়াইট হাউসে ট্রাম্পের সঙ্গে একটি জরুরি বৈঠকে বসেন। প্রায় আড়াই ঘণ্টার এই রুদ্ধদ্বার বৈঠককে একাধিক ইউরোপীয় কর্মকর্তা ‘অস্বস্তিকর ও কঠিন’ বলে বর্ণনা করেছেন।
একজন ইউরোপীয় কর্মকর্তার মতে, বৈঠকের পুরো সময়জুড়ে ট্রাম্প তীব্র সমালোচনা ও কঠোর ভাষা ব্যবহার করেন, যা মিত্রদের জন্য অস্বস্তিকর পরিস্থিতি তৈরি করে।
বৈঠকের পর ট্রাম্প তার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ‘ট্রুথ সোশ্যাল’-এ লেখেন, যখন যুক্তরাষ্ট্রের প্রয়োজন ছিল, তখন ন্যাটো পাশে ছিল না। তিনি জোটের ভবিষ্যৎ ভূমিকা নিয়েও সন্দেহ প্রকাশ করেন এবং ইউরোপের কিছু ভূখণ্ড নিয়ে কটাক্ষ করেন।
যদিও তিনি ন্যাটো থেকে যুক্তরাষ্ট্রের আনুষ্ঠানিক সরে যাওয়ার ঘোষণা দেননি, তবুও তার বক্তব্য মিত্রদের মধ্যে নতুন করে অনিশ্চয়তা তৈরি করেছে।
হোয়াইট হাউসের সেই তিক্ত অভিজ্ঞতার পরদিন এক ভাষণে ন্যাটো মহাসচিব মার্ক রুটে কিছুটা নমনীয় সুর অবলম্বন করেন। তিনি স্বীকার করেন যে, ইরান ইস্যুতে সমর্থন দিতে ইউরোপীয় দেশগুলো ‘কিছুটা ধীর’ ছিল। এমনকি ট্রাম্পের ‘সাহসী নেতৃত্ব ও দূরদর্শিতার’ প্রশংসা করে তিনি বলেন, ট্রাম্পের কঠোর অবস্থানের কারণেই ইউরোপীয় দেশগুলো এখন ন্যাটোর প্রতিরক্ষা বাজেটে জিডিপির ৫ শতাংশ ব্যয়ের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে।
তবে বিশ্লেষকরা মনে করছেন, ট্রাম্পের বক্তব্য ও কর্মকাণ্ড ন্যাটোর মূল স্তম্ভ ‘পারস্পরিক বিশ্বাসে’ ফাটল ধরিয়েছে। স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাসবিদ ফ্রান্সিস ফুকুয়ামা লিখেছেন, ন্যাটো বিশ্বাসের ওপর টিকে আছে। কিন্তু কোনো সদস্য দেশই আক্রমণাত্মক যুদ্ধে অংশ নেওয়ার চুক্তিতে সই করেনি। ট্রাম্প মিত্রদের বিরুদ্ধে যে বিশ্বাসঘাতকতার অভিযোগ তুলছেন, তা ন্যাটোর নিরাপত্তা কাঠামোতে একটি বড় বিচ্ছেদ ঘটাতে পারে।
কাউন্সিল অন ফরেন রিলেশনসের পরিচালক চার্লস কুপচান বলেন, ইউরোপীয় দেশগুলো ট্রাম্পের মেয়াদ শেষ হওয়া পর্যন্ত কোনোমতে টিকে থাকার চেষ্টা করছে। তবে তাদের মধ্যে দীর্ঘমেয়াদী ভয় কাজ করছে যে, যুক্তরাষ্ট্র এখন আদর্শবাদী শক্তির বদলে রাশিয়া বা চীনের মতো কেবল ‘রিয়েলপলিটিক’ বা ক্ষমতার রাজনীতিতে বিশ্বাসী হয়ে উঠছে।
ন্যাটো বিশেষজ্ঞ ক্রিস্টিন বারজিনা সতর্ক করে বলেছেন, পশ্চিম ইউরোপীয় দেশগুলো যদি ট্রাম্পের বিরুদ্ধে কড়া ভাষায় পাল্টা জবাব দেয়, তবে তিনি জোট ত্যাগ করতে পারেন। এতে পূর্ব ইউরোপের দেশগুলো রাশিয়ার আগ্রাসনের মুখে চরম ঝুঁকির মধ্যে পড়বে। তাঁর মতে, পরিস্থিতি যতই ‘অপ্রীতিকর ও চাপযুক্ত’ হোক না কেন, ইউরোপের জন্য যুক্তরাষ্ট্র এখনো অপরিহার্য।
তবে ৮০ হাজার মার্কিন সেনার উপস্থিতি ও ইউরোপজুড়ে বিস্তৃত সামরিক ঘাঁটির কারণে যুক্তরাষ্ট্র ন্যাটো পুরোপুরি ত্যাগ করবে—এমন সম্ভাবনা আপাতত কম বলে ধারণা করা হচ্ছে।
তবুও স্পষ্ট হচ্ছে, ন্যাটোর ভেতরে রাজনৈতিক ও আদর্শিক বিভাজন ক্রমেই গভীর হচ্ছে, যা ভবিষ্যতে বৈশ্বিক নিরাপত্তা ব্যবস্থায় বড় প্রভাব ফেলতে পারে।
সূত্র: দ্য গার্ডিয়ান
মন্তব্য করুন