মঙ্গলবার
০৯ জুন ২০২৬, ২৬ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
মঙ্গলবার, ০৯ জুন ২০২৬, ২৬ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩

ইরানের হামলায় টিকতে না পেরে ইসরায়েলের ভূখণ্ড ছেড়ে পালাচ্ছে ইহুদিরা

আন্তর্জাতিক ডেস্ক
প্রকাশ : ০৬ এপ্রিল ২০২৬, ০৪:১৫ এএম
ইরানের হামলায় টিকতে না পেরে ইসরায়েলের ভূখণ্ড ছেড়ে পালাচ্ছে ইহুদিরা

১৯৪৮ সালে ফিলিস্তিনি ভূখণ্ড দখল করে ইসরায়েল রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পর থেকেই মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাত অব্যাহত রয়েছে। বিভিন্ন সময় মুসলিম দেশগুলোর সঙ্গে যুদ্ধ ও উত্তেজনায় জড়িয়ে পড়েছে দেশটি।

তবে ২০২৩ সালের হামাস-ইসরায়েল যুদ্ধ ২০২৩ পরিস্থিতিতে নতুন মাত্রা যোগ করে। দীর্ঘদিনের ক্ষোভের বিস্ফোরণ ঘটিয়ে হামাসের হামলা ইসরায়েলের নিরাপত্তা ব্যবস্থাকে বড় ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলে।

সম্প্রতি ইরানের সঙ্গে সরাসরি সংঘাতে জড়িয়ে পড়ে ইসরায়েল, যেখানে যুক্তরাষ্ট্রও জড়িত হয় বলে অভিযোগ ওঠে। এই সংঘাতে ইরান ব্যাপক ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছে—সামরিক ও বেসামরিক অবকাঠামো ধ্বংস এবং হাজারো প্রাণহানি ঘটেছে।

ফিলিস্তিনিদের ওপর টানা দু’বছর ধরে চালানো ইসরায়েলি নৃশংস গণহত্যাও ‘ব্যাক ফায়ার’ করেছে। ইরানের হামলায় টিকতে না পেরে অবৈধ এ ভূখণ্ড ছাড়তে ইহুদিদের মধ্যে প্রতিযোগিতা শুরু হয়।

ঢল নামে সীমান্ত এলাকা ও বিমানবন্দরগুলোতে। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্রকে নিয়ে ইরানে যৌথ আগ্রাসন শুরু করে ইসরায়েল। এতে বেশ ক্ষুব্ধ খোদ ইসরায়েলিরাই।

যুদ্ধের চিত্র বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, মার্কিন-ইসরায়েলি ভয়াবহ হামলায় সবচেয়ে বেশি ক্ষতি হয়েছে ইরানের। দেশটির সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনিসহ সরকার ও সামরিক বাহিনীর উচ্চপদস্থ অনেক নেতার মৃত্যু হয়েছে।

সব মিলিয়ে ইরানে নিহতের সংখ্যা দুই হাজার ছুঁই ছুঁই। এ ছাড়া সামরিক ও বেসামরিক হাজার হাজার অবকাঠামো বিধ্বস্ত হয়েছে, কিন্তু হাল ছাড়েনি ইরানিরা।

ধীরে ধীরে যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে একাট্টা হয়ে উঠছে সাধারণ নাগরিকরা। সর্বশেষ গত ৩ এপ্রিল ইরানে মার্কিন বিমান বিধ্বস্ত হওয়ার পর কিছু ভিডিও ছড়িয়ে পড়ে, যেখানে উপজাতি নারীদেরও বন্দুক হাতে মার্কিন পাইলটকে খুঁজতে দেখা যায়। এই দৃশ্য ইরানিদের যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে একাট্টা ও প্রতিবাদী হওয়ার স্পষ্ট প্রমাণ।

অপরদিকে ইসরায়েলের চিত্র পুরোপুরি উল্টো। ইরানের রেজিম চেঞ্জ বা শাসন ব্যবস্থা পরিবর্তনের জন্য আগ্রাসন শুরু করলেও সরকারবিরোধী আন্দোলন হচ্ছে ইসরায়েলে।

দফায় দফায় প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহুর পদত্যাগ, যুদ্ধবন্ধসহ বিভিন্ন দাবিতে রাস্তায় নামছে ইসরায়েলিরা। সর্বশেষ শনিবার (৪ এপ্রিল) যুদ্ধবিরোধী ব্যানার বহন করে এবং প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর বিরুদ্ধে স্লোগান দিয়ে তেল আবিবে শত শত ইসরায়েলি ইরানের সঙ্গে যুদ্ধের প্রতিবাদে সমাবেশ করেছে।

ইরানের সঙ্গে সংঘাতের কারণে গণজমায়েতের ওপর বিধিনিষেধ থাকা সত্ত্বেও বিক্ষোভকারীরা একটি কেন্দ্রীয় চত্বরে জড়ো হন।

তাদের হাতে থাকা প্ল্যাকার্ডে লেখা ছিল: ‘বোমা নয়—আলোচনা করুন! অন্তহীন যুদ্ধ বন্ধ করুন!’

ইসরায়েলি-ফিলিস্তিনি তৃণমূল গোষ্ঠী ‘স্ট্যান্ডিং টুগেদার’ এর সহ-পরিচালক অ্যালন-লি গ্রিন ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘আমরা এখানে ইরান, লেবানন ও গাজায় চলমান যুদ্ধ বন্ধের পাশাপাশি পশ্চিম তীরে গণহত্যা বা পরিকল্পিত আক্রমণ বন্ধের দাবি জানাতে এসেছি।’

গ্রিন বলেন, ‘ইসরায়েলে সবসময়ই যুদ্ধ লেগে থাকে। তাই যদি আমাদের বিক্ষোভ করতে দেওয়া না হয়, তবে আমাদের কখনোই কথা বলতে দেওয়া হবে না।’

এর আগে ইসরায়েলি সংবাদমাধ্যম ওয়াইনেটের এক প্রতিবেদনে জানা যায়, যুদ্ধ অবসানের দাবিতে গত ২৮ মার্চও ইসরাইলজুড়ে হাজার হাজার বিক্ষোভকারী সমাবেশ করেছে। তেল আবিব, হাইফা ও জেরুজালেমে এ প্রতিবাদী কর্মসূচি পালিত হয়।

বিক্ষোভকারীরা জানান, চলমান ক্ষেপণাস্ত্র হামলার হুমকি সত্ত্বেও তারা ‘জীবনের জন্য’ এই বিক্ষোভে অংশ নিয়েছেন এবং যুদ্ধকালীন সরকারি নীতির তীব্র বিরোধিতা করছেন।

ইরানে মার্কিন-ইসরায়েলি আগ্রাসন শুরু হওয়ার পর জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়েছে ইসরায়েলিদের। ক্রমেই বাড়ছে মূল্যস্ফীতি। জ্বালানির মূল্য, খাবারের দাম, পরিবহন খরচ-সবই বেড়েছে। সঙ্গে বিঘ্ন ঘটছে বাণিজ্যে।

ইরানি ক্ষেপণাস্ত্র হামলা থেকে বাঁচতে ইসরায়েলিদের দিন-রাতের অধিকাংশ সময় থাকতে হচ্ছে বাঙ্কারে, যা তাদের উৎপাদন কমিয়ে ভোগ বাড়িয়ে দিয়েছে।

যেকোনো একটি শহরে ছোট্ট একটি ড্রোন বা একটি রকেট আঘাত হানলে সর্বোচ্চ ক্ষতি হতে পারে একটি ফ্ল্যাটের বা কোনো একটি দোকানের।

কিন্তু, আকাশে সেই বস্তুর আগমন শনাক্ত হওয়ার পর যে সাইরেন বাজে তাতে একটি শহরের সব বাসিন্দাকে পালাতে হয়। এক মাসের বেশি সময় ধরে এ লুকোচুরি খেলা খেলতে গিয়ে তাদের জীবন নাজেহাল হয়ে পড়েছে।

অপরদিকে কমছে আয়। উৎপাদন ব্যাহত হওয়া ও কাজ করতে না পারায় কমে যাচ্ছে ইসরায়েলিদের আয়। এর বিপরীতে বাড়ছে জীবনযাত্রার ব্যয়। এ ছাড়া যুদ্ধ চালাতে গিয়ে প্রতি সপ্তাহে ইসরায়েলের ৩০০ কোটি ডলারের বেশি খরচ হচ্ছে, যা তাদের সামগ্রিক অর্থনীতিতে ভয়াবহ সংকট তৈরি করছে। এতে কমে যাচ্ছে মুদ্রার মানও।

এসব কারণে যুদ্ধের বিরুদ্ধে ফুঁসে উঠছে ইসরায়েলিরা। ঘরের মধ্যে ইরানি ক্ষেপণাস্ত্রের হামলায় মৃত্যুর চেয়ে তারা রাস্তায় প্রতিবাদ করে জীবন দিতে চায়, তাই ঝুঁকি নিয়ে রাস্তায় নেমে যাচ্ছে। এ ছাড়া তাদের উল্লেখযোগ্য অংশ ভবিষ্যত নিয়ে অনিশ্চয়তায় ভুগছে, ডুবে যাচ্ছে হতাশার সাগরে।

টিআরটি ওয়ার্ল্ডের এক প্রতিবেদনে জানা যায়, গাজা সংঘাত ও অভ্যন্তরীণ অস্থিরতার মাঝে ২০২৩-২৪ সালে প্রায় ১ লাখ ইসরায়েলি দেশত্যাগ করেছে।

তেল আবিব বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি গবেষণা থেকে এ তথ্য পাওয়া গেছে। অথচ ইসরায়েলের মোট নাগরিকের সংখ্যা মাত্র এক কোটি। এদের মধ্যে আবার অনেকে অন্য দেশে থাকে।

নিরাপত্তাহীনতায় ভুগতে থাকায় তারা দেশে ছাড়ছেন। এ ছাড়া জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় কর্মের সন্ধানেও ছুটছে কেউ কেউ। এসব কারণে দক্ষ পেশাদাররা আর যুদ্ধ পরিস্থিতির ভার সইতে চাইছে না।

গবেষকরা সতর্ক করে বলেছেন, ‘অতিরিক্ত অর্থনৈতিক ধাক্কা—রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক বা নিরাপত্তা সংক্রান্ত—অভিবাসনের মাত্রায় একটি তীব্র ও আকস্মিক উল্লম্ফন ঘটাতে পারে। এই প্রবণতা ইসরায়েলের জন্য একটি অত্যন্ত বড় ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।’

এই পরিস্থিতি আরো প্রকট করে তুলেছে ইরানের প্রতিশোধমূলক আক্রমণগুলো। কারণ, ধীরে ইসলামি প্রজাতন্ত্রের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন ঠেকানোর সক্ষমতা কমে আসছে ইসরায়েলের, যা ক্ষয়ক্ষতির মাত্রা বাড়িয়ে দিচ্ছে। পালাতে পারে ঝাঁকে ঝাঁকে ইসরায়েলি।

যুগ যুগ ধরে ইসরায়েলি আক্রমণ থেকে বাঁচতে মিশর সীমান্ত দিয়ে পালিয়েছেন ফিলিস্তিনি মুসলিমরা। এখন পরিস্থিতি বদলে গেছে। গত বছর হামাসের সঙ্গে যুদ্ধবিরতি চুক্তি হওয়ার পর গণহত্যার মাত্রা কমিয়েছে ইসরায়েল, যাতে মিশর সীমান্তে জন্মভূমিতে ফেরা ফিলিস্তিনিদের ঢল নেমেছে। বিপরীতে, এই পথে এখন পালাচ্ছে ইসরায়েলিরা।

জেরুজালেম পোস্টের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানে আগ্রাসন শুরু করার পর ইসরায়েল জুড়ে মানুষের ফোনে হোম ফ্রন্ট কমান্ডের সতর্কবার্তা বেজে ওঠে।

এক যুদ্ধকালীন পরিস্থিতিতে বাসিন্দাদের ঘুম ভাঙে। আকাশপথ বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিল এবং বেন-গুরিয়ন বিমানবন্দরে কোনো ফ্লাইট ওঠানামা করছিল না। কিন্তু, সর্বত্র আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ায় নাগরিক ও পর্যটকরা এই ভূমি ছাড়তে মরিয়া হয়ে উঠে।

২ মার্চ ইসরায়েলি পর্যটন মন্ত্রণালয় মিসরের তাবা সীমান্ত পারাপারের জন্য শাটল সার্ভিস পরিচালনা শুরু করেছে। এভাবেই মিশরের তাবা ও ইসরায়েলের আইলাতের মধ্যে অবস্থিত এ ক্রসিং ইসরায়েলিদের পালানোর পথে পরিণত হয়।

ইরান ভয়াবহ পাল্টা হামলা শুরু করার পর ইসরায়েলিদের মধ্যে উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা বাড়তে থাকায় জন্মভূমি ছেড়ে চলে যাওয়া ও প্রতিবাদী হয়ে ওঠার প্রবণতা দেখা দিলেও তেল আবিব দিচ্ছে উল্টো তথ্য।

ইসরায়েলি ইমিগ্রেশন কর্মকর্তার সূত্র দিয়ে রয়টার্সের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, ইরানে আগ্রাসন শুরু করার পর ২০ হাজারের মতো ইহুদি ইসরায়েলে ফিরেছে।

আমাদের ইউটিউব চ্যানেল সাবস্ক্রাইব করুন

মন্তব্য করুন

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

এস আলমের প্রভাবমুক্ত ইসলামী ব্যাংকের দাবিতে রাজশাহীতে মানববন্ধন

কেশবপুরে ভূমি সহকারীর বাড়িতে অজ্ঞান পার্টির হানা

একনেক সভায় ১০ উন্নয়ন প্রকল্পের অনুমোদন

জামায়াতের ৮.৩৯ লাখ কোটি টাকার ছায়া বাজেট প্রস্তাব

পুরুষ বন্ধুদের কাছ থেকে উপহার পেতে আনুশকার অস্বস্তি!

মণিরামপুরে নাতনীকে উত্যক্তের প্রতিবাদ করায় নানাকে কুপিয়ে হত্যা, আটক-১

তথ্য উপদেষ্টা / স্থানীয় সরকার নির্বাচন হবে নির্দলীয়, থাকবে না দলীয় প্রতীক

যশোরসহ ২০ অঞ্চলে ঝড়ের সম্ভাবনা

উত্তাল বঙ্গোপসাগর, চার সমুদ্রবন্দরে ৩ নম্বর সতর্ক সংকেত

ঘুসের টাকা গুনে নেওয়ার ভিডিও ভাইরাল, বাগমারা থানার পুলিশ পরিদর্শক প্রত্যাহার

মহম্মদপুরে মেয়াদোত্তীর্ণ কীটনাশকে নতুন সিল

রামিসা হত্যা: সোহেল ও স্বপ্না ‘কনডেম সেলে’

কেশবপুরে শরীকানা পুকুরের মাছ লুটের অভিযোগ

রাজশাহীতে বিভাগীয় পর্যায়ে জাতীয় প্রাথমিক শিক্ষা পদক প্রতিযোগিতার উদ্বোধন

পাবনায় হত্যা মামলার আসামিদের বাড়িতে অগ্নিসংযোগ, নিহত ৩

রাজশাহীতে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের বিক্ষোভ মিছিল

বিশ্ববাজারে আবারও বাড়লো স্বর্ণের দাম

ফের বাড়ল তেলের দাম

বিশ্বকাপ ইতিহাসে পেনাল্টি গোলের রেকর্ডে লিওনেল মেসি

দেশে ফিরলেন ৪৫১৫৮ হাজি, মৃত্যু ৪৯

X