
মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক উপস্থিতি এখন আর কেবল কূটনৈতিক সংকেত নয়—বরং সরাসরি সামরিক প্রস্তুতির ইঙ্গিত দিচ্ছে। ইরানি জলসীমার কাছাকাছি মার্কিন বিমানবাহী রণতরি ইউএসএস আব্রাহাম লিংকন-এর স্ট্রাইক গ্রুপের অবস্থানকে বিশ্লেষকরা গুরুতর পদক্ষেপ হিসেবে দেখছেন। একই সঙ্গে ইউএসএস জেরাল্ড আর. ফোর্ড পূর্বমুখী অগ্রসর হচ্ছে, যা সম্ভাব্য অভিযানের ইঙ্গিত বহন করছে।
অঞ্চলজুড়ে অতিরিক্ত সামরিক সরঞ্জাম ও জনবল মোতায়েন করা হলেও তেহরান এখনো তাদের অবস্থান থেকে সরে আসেনি।
ওয়াশিংটনের পক্ষ থেকে যেসব দাবি উত্থাপন করা হয়েছে, সেগুলো ইরানের কাছে আলোচনার ভিত্তি নয়; বরং আত্মসমর্পণের শর্ত হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। এগুলোর মধ্যে রয়েছে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ বন্ধ করা, ব্যালিস্টিক বা দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্রের পাল্লা এমনভাবে কমানো যাতে সেগুলো আর ইসরাইলের জন্য হুমকি না হয়, ঐ অঞ্চলের সশস্ত্রগোষ্ঠীগুলোর প্রতি সমর্থন বন্ধ করা এবং মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিওর ভাষায়, নিজের নাগরিকদের প্রতি ইরানের আচরণ পরিবর্তন করা।
ইরানি নেতৃত্বের জন্য এসব বিষয় গৌণ নয়। এগুলো তাদের দৃষ্টিতে দেশের নিরাপত্তা স্থাপত্যের কেন্দ্রীয় উপাদান। শক্তিশালী আন্তর্জাতিক মিত্র না থাকার কারণে তেহরান বহু বছর ধরে তাদের তথাকথিত প্রতিরোধের অক্ষ গড়ে তুলেছে। এটি হলো মিত্র সশস্ত্রগোষ্ঠীগুলোর একটি নেটওয়ার্ক, যার উদ্দেশ্য ইরানের সীমানা থেকে সংঘাত দূরে রাখা এবং চাপকে ইসরাইলের দিকে ঠেলে দেওয়া।
তেহরানের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি মূলত একটি বয়সি বিমানবাহিনী এবং উন্নত সামরিক প্রযুক্তিতে সীমিত প্রবেশাধিকারের বিকল্প হিসেবে কাজ করেছে। আনুষ্ঠানিকভাবে শান্তিপূর্ণ বলে বর্ণিত হলেও এর পারমাণবিক কর্মসূচিকে ব্যাপকভাবে প্রতিরোধমূলক মূল্যবোধের অধিকারী হিসেবে দেখা হয়।
ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনির দৃষ্টিতে এমন সব শর্ত মেনে নেওয়া হয়তো প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের অধীনে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সীমিত যুদ্ধের ঝুঁকি নেওয়ার চেয়েও বেশি বিপজ্জনক বলে মনে হতে পারে।
ব্যয়বহুল হলেও সামরিক সংঘাতকে হয়তো তারা টিকে থাকার মতো মনে করেন, কিন্তু সম্পূর্ণ কৌশলগত পশ্চাদপসরণকে নয়। তবে এই হিসাব-নিকাশের মধ্যে নিহিত ঝুঁকিগুলো গভীর এবং শুধু ইরানের জন্যই নয়।
মার্কিন সংবাদমাধ্যম অ্যাক্সিওস সূত্রের বরাত দিয়ে জানিয়েছে, যেকোনো মার্কিন অভিযান শুরুর প্রথম ধাপেই শীর্ষ নেতৃত্বকে লক্ষ্যবস্তু করতে পারে। খামেনি নিহত হলে শুধু তিন দশকেরও বেশি সময়ের শাসনের অবসানই হবে না; বরং সংবেদনশীল সময়ে নেতৃত্বের উত্তরাধিকারকেও অস্থিতিশীল করে তুলতে পারে। ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোর (আইআরজিসি) এবং অন্যান্য নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠানে হামলা সাম্প্র্রতিক ইতিহাসের অন্যতম মারাত্মক দমন-পীড়নের পর পুনর্গঠিত রাষ্ট্রীয় যন্ত্রকেও দুর্বল করে দিতে পারে।
সাম্প্র্রতিক সপ্তাহগুলোতে রাস্তায় নেমে আসা বিক্ষোভকারীরা যারা অভূতপূর্ব শক্তি প্রদর্শনের মুখে সরে দাঁড়াতে বাধ্য হয়েছিলেন, এখনো গভীরভাবে ক্ষুব্ধ। রাষ্ট্রীয় দমনযন্ত্রে হঠাত কোনো বড় ধাক্কা সৃষ্টি হলে দেশের অভ্যন্তরীণ ভারসাম্য অনিশ্চিতভাবে বদলে যেতে পারে।
যুক্তরাষ্ট্রের ঝুঁকি ওয়াশিংটনের ঝুঁকিও আসলে কম নয়। তাত্ত্বিকভাবে বললে, উত্তেজনা বাড়লে সশস্ত্র বাহিনী প্রেসিডেন্টের লক্ষ্য পূরণের মতো সক্ষমতা রাখে। কিন্তু যুদ্ধ কাগজে হয় না। এগুলো ভুল হিসাব, উত্তেজনার বিস্তার এবং অনাকাঙ্ক্ষিত পরিণতির মাধ্যমে গঠিত হয়।
ইসরাইলের সঙ্গে সাম্প্র্রতিক ১২ দিনের যুদ্ধ ইরানের কমান্ড বা নেতৃত্বের কাঠামো এবং সামরিক অবকাঠামোর দুর্বলতা উন্মোচিত করেছে। একই সঙ্গে চাপের মুখে আঘাত সহ্য করা, পুনর্গঠন এবং প্রতিক্রিয়া জানানোর বিষয়ে শিক্ষাও দিয়েছে। বৃহত্তর সংঘাত উভয় পক্ষের অপ্রত্যাশিত ফল বয়ে আনতে পারে।
তেহরানে কেন্দ্রীয় কর্তৃপক্ষ দুর্বল হয়ে গেলে তা স্বয়ংক্রিয়ভাবে স্থিতিশীলতা বা পশ্চিমা স্বার্থের সঙ্গে সামঞ্জস্য বয়ে আনবে না। ক্ষমতার শূন্যতা নতুন, খণ্ডিত বা আরো কট্টর প্রভাবকেন্দ্র তৈরি করতে পারে, যা ওয়াশিংটন ও তার মিত্রদের জন্য অনাকাঙ্ক্ষিত। —বিবিসি
মন্তব্য করুন