
উত্তর আফ্রিকার দেশ লিবিয়ার সাবেক শাসক মুয়াম্মার গাদ্দাফির ছেলে সাইফ আল-ইসলাম গাদ্দাফি নিহত হয়েছেন। দেশটির পশ্চিমাঞ্চলীয় শহর জিনতানে তাকে গুলি করে হত্যা করা হয়েছে বলে জানিয়েছে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম আল জাজিরা। দীর্ঘ এক দশক ধরে তিনি এই এলাকাতেই অবস্থান করছিলেন।
আল জাজিরা আরবি’র লিবিয়ায় কর্মরত সংবাদদাতা আহমেদ খলিফা মঙ্গলবার জানান, জিনতান শহরে সাইফ আল-ইসলাম গাদ্দাফিকে লক্ষ্য করে গুলি চালানো হয় এবং এতে তার মৃত্যু ঘটে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
৫৩ বছর বয়সী সাইফ আল-ইসলামের মৃত্যুর বিষয়টি তার রাজনৈতিক উপদেষ্টা আবদুল্লাহ ওসমান নিশ্চিত করেছেন। তবে ঠিক কী পরিস্থিতিতে তিনি নিহত হয়েছেন, সে বিষয়ে এখনও বিস্তারিত তথ্য প্রকাশ করা হয়নি। এ ঘটনায় লিবিয়ার কর্তৃপক্ষ এখন পর্যন্ত আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো মন্তব্য করেনি।
সাইফ আল-ইসলাম গাদ্দাফি কখনোই লিবিয়ার কোনও সরকারি পদে ছিলেন না। তবে ২০০০ সাল থেকে ২০১১ সাল পর্যন্ত সময়কালে তাকে কার্যত তার বাবার দ্বিতীয় ব্যক্তি হিসেবে বিবেচনা করা হতো। ২০১১ সালে লিবিয়ার বিরোধী শক্তির হাতে মুয়াম্মার গাদ্দাফি নিহত হওয়ার মধ্য দিয়ে তার কয়েক দশকের শাসনের অবসান ঘটে।
অন্যদিকে ২০১১ সালে রাজধানী ত্রিপোলি বিরোধীদের দখলে যাওয়ার পর দেশ ছাড়ার চেষ্টা করলে সাইফ আল-ইসলাম গাদ্দাফি ধরা পড়েন। পরে তাকে জিনতানে আটক রাখা হয়। এরপর ২০১৭ সালে সাধারণ ক্ষমার আওতায় তাকে মুক্তি দেয়া হয়।
পশ্চিমা শিক্ষায় শিক্ষিত সাইফ আল-ইসলাম গাদ্দাফি তার বাবার দমনমূলক শাসনের একটি তুলনামূলক ‘সংস্কারপন্থি’ মুখ হিসেবে পরিচিত ছিলেন। ২০০০ দশকের শুরু থেকে পশ্চিমা দেশগুলোর সঙ্গে লিবিয়ার সম্পর্ক স্বাভাবিক করতে নেয়া উদ্যোগে তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিলেন।
২০০৮ সালে তিনি যুক্তরাজ্যের লন্ডন স্কুল অব ইকোনমিকস (এলএসই) থেকে পিএইচডি ডিগ্রি অর্জন করেন। তার গবেষণাপত্রে বৈশ্বিক শাসনব্যবস্থা সংস্কারে নাগরিক সমাজের ভূমিকা বিশ্লেষণ করা হয়।
আরব বসন্তের পর লিবিয়ায় সহিংসতা ছড়িয়ে পড়লেও তিনি দীর্ঘ সময় আলোচনায় ছিলেন। ২০১১ সালে লিবিয়ায় গণঅভ্যুত্থানের সময় রয়টার্সকে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, ‘আমরা লিবিয়াতেই লড়ব, লিবিয়াতেই মরব’। তিনি সতর্ক করে বলেন, রক্তের নদী বইবে এবং সরকার শেষ মানুষ, শেষ নারী ও শেষ গুলি পর্যন্ত লড়াই করবে।
তিনি আরও বলেন, ‘পুরো লিবিয়া ধ্বংস হয়ে যাবে। দেশ চালানোর বিষয়ে ঐকমত্যে পৌঁছাতে আমাদের ৪০ বছর লাগবে। কারণ আজ সবাই প্রেসিডেন্ট বা আমির হতে চাইবে, সবাই দেশ চালাতে চাইবে।’
তার বিরুদ্ধে বাবার শাসনামলের বিরোধীদের ওপর নির্যাতন ও চরম সহিংসতায় জড়িত থাকার বহু অভিযোগ রয়েছে। ২০১১ সালের ফেব্রুয়ারিতে তাকে জাতিসংঘের নিষেধাজ্ঞার তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা হয় এবং বিদেশ ভ্রমণে নিষেধাজ্ঞা দেয়া হয়।
এছাড়া ২০১১ সালে লিবিয়ায় সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত (আইসিসি) তাকে অভিযুক্ত করে। দীর্ঘ আলোচনার পর আইসিসির কাছ থেকে লিবিয়ার কর্তৃপক্ষ তাকে যুদ্ধাপরাধের অভিযোগে বিচারের ক্ষমতা পায়। ২০১৫ সালে ত্রিপোলির একটি আদালত তার অনুপস্থিতিতেই তাকে মৃত্যুদণ্ড দেয়।
২০১৭ সালে মুক্তি পাওয়ার পর হত্যার আশঙ্কায় তিনি জিনতানে দীর্ঘ সময় আত্মগোপনে ছিলেন। লিবীয় বিশ্লেষক ও গাদ্দাফির ঘনিষ্ঠ মহলের সঙ্গে যোগাযোগ থাকা মুস্তাফা ফেতৌরি জানান, ২০১৬ সাল থেকে তাকে লিবিয়ার ভেতরে ও বাইরে মানুষের সঙ্গে যোগাযোগের অনুমতি দেয়া হয়েছিল।
মন্তব্য করুন