
ইরানের সঙ্গে ক্রমবর্ধমান সামরিক ও কূটনৈতিক উত্তেজনার প্রেক্ষাপটে মার্কিন বিমানবাহী রণতরী ইউএসএস আব্রাহাম লিঙ্কন ও তার সহায়ক যুদ্ধজাহাজগুলো মধ্যপ্রাচ্যের গুরুত্বপূর্ণ জলসীমায় প্রবেশ করেছে। সোমবার (২৬ জানুয়ারি) মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্স-এ এক বার্তায় এই নৌবহরের মোতায়েনের বিষয়টি আনুষ্ঠানিকভাবে নিশ্চিত করে।
সেন্টকম জানায়, আঞ্চলিক নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতা বজায় রাখাই এই সামরিক উপস্থিতির মূল উদ্দেশ্য। বিশ্লেষকদের মতে, গত সপ্তাহে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানের বিরুদ্ধে সম্ভাব্য হামলার ইঙ্গিত দিয়ে ‘বিশাল নৌবহর’ পাঠানোর যে ঘোষণা দিয়েছিলেন, এই মোতায়েন তারই বাস্তব প্রতিফলন। এর ফলে মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন সামরিক শক্তি উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে, যা একটি বড় ধরনের সশস্ত্র সংঘাতের আশঙ্কা বাড়িয়ে তুলেছে।
এই সামরিক শক্তিবৃদ্ধির প্রতিক্রিয়ায় ইরান কঠোর হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেছে। দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই এক বিবৃতিতে বলেন, মার্কিন রণতরী মোতায়েন করে ইরানি জাতির আত্মরক্ষার দৃঢ় সংকল্প দুর্বল করা যাবে না। তেহরান স্পষ্টভাবে জানিয়েছে, যেকোনো সামরিক হামলাকে তারা ‘সর্বাত্মক যুদ্ধ’ হিসেবে বিবেচনা করবে এবং তার জবাব হবে ‘অনুতাপ উদ্রেককারী’।
বিশেষজ্ঞদের মতে, গত বছর ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচিতে মার্কিন হামলা এবং সাম্প্রতিক অভ্যন্তরীণ বিক্ষোভ দমনে তেহরানের কঠোর ভূমিকার জের ধরেই দুই দেশের মধ্যে এই যুদ্ধংদেহি পরিস্থিতি আরও ঘনীভূত হয়েছে।
এদিকে লেবাননের প্রভাবশালী সশস্ত্র সংগঠন হিজবুল্লাহর প্রধান নাঈম কাসেম এক টেলিভিশন ভাষণে সতর্ক করে বলেন, ইরানের ওপর যেকোনো হামলাকে হিজবুল্লাহ তাদের ওপর হামলা হিসেবেই বিবেচনা করবে। তিনি জানান, ইরানকে লক্ষ্য করে নতুন কোনো যুদ্ধ শুরু হলে তা গোটা মধ্যপ্রাচ্যকে অগ্নিগর্ভ করে তুলবে এবং সেই সংঘাতে হিজবুল্লাহ কখনোই নিরপেক্ষ থাকবে না।
অন্যদিকে সংযুক্ত আরব আমিরাত ঘোষণা দিয়েছে, তারা তাদের আকাশসীমা, স্থলভাগ বা জলসীমা ব্যবহার করে ইরানের বিরুদ্ধে কোনো সামরিক অভিযানের অনুমতি দেবে না। যদিও আবুধাবির দক্ষিণে অবস্থিত আল ধাফরা বিমান ঘাঁটি মার্কিন বিমান বাহিনীর একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র, তবুও আমিরাতের এই অবস্থান কূটনৈতিকভাবে বিশেষ তাৎপর্য বহন করছে।
পেন্টাগন সূত্রে জানা গেছে, রণতরীর পাশাপাশি মধ্যপ্রাচ্যে অতিরিক্ত যুদ্ধবিমান ও উন্নত আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা মোতায়েন করা হচ্ছে। সপ্তাহান্তে মার্কিন সামরিক বাহিনী ঘোষণা করেছে, তারা এই অঞ্চলে একটি বৃহৎ সামরিক মহড়া পরিচালনা করবে, যার লক্ষ্য প্রতিকূল পরিবেশে বিমান শক্তি মোতায়েন ও ধরে রাখার সক্ষমতা প্রদর্শন।
বিশ্লেষকদের মতে, ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে শুরু হওয়া বিক্ষোভ দমনে ইরানের কঠোর অবস্থানের পর ট্রাম্প প্রশাসনের এই সামরিক হুমকি যুক্তরাষ্ট্র-ইরান বৈরিতাকে এক নতুন ও বিপজ্জনক পর্যায়ে নিয়ে গেছে। বর্তমান পরিস্থিতিতে মধ্যপ্রাচ্য কার্যত একটি বারুদস্তূপে পরিণত হয়েছে, যেখানে সামান্য ভুল সিদ্ধান্তও দীর্ঘমেয়াদি ও বিধ্বংসী যুদ্ধের সূত্রপাত করতে পারে।
সূত্র: টিআরটি ওয়ার্ল্ড
মন্তব্য করুন