
ইসরায়েলের দীর্ঘমেয়াদি অবরোধের কারণে জরুরি ওষুধ ও চিকিৎসা সরঞ্জাম প্রবেশ করতে না পারায় ফিলিস্তিনের গাজা উপত্যকায় দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে একটি ভয়াবহ শ্বাসতন্ত্রজনিত ভাইরাস। এতে সবচেয়ে বেশি প্রাণহানি ঘটছে শিশু, বয়স্ক ব্যক্তি এবং দীর্ঘমেয়াদি রোগে আক্রান্ত মানুষের মধ্যে। গাজার শীর্ষ স্বাস্থ্য কর্মকর্তারা এটিকে একটি নজিরবিহীন মানবিক ও স্বাস্থ্য বিপর্যয় হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন।
গাজা সিটির আল-শিফা মেডিকেল কমপ্লেক্সের পরিচালক মোহাম্মদ আবু সালমিয়া সোমবার আনাদোলু এজেন্সিকে জানান, ভাইরাসটিতে আক্রান্ত হয়ে ইতোমধ্যে বহু মানুষের মৃত্যু হয়েছে। তিনি বলেন, আমরা এমন এক স্বাস্থ্য বিপর্যয়ের মুখোমুখি হয়েছি, যার গতি ও ভয়াবহতা আগে কখনও দেখিনি।
আবু সালমিয়া জানান, এই ভাইরাসটি সম্ভবত ফ্লু বা করোনাভাইরাসের সঙ্গে সম্পর্কিত। সব বয়সী মানুষের মধ্যেই এটি ছড়িয়ে পড়ছে। তীব্র অপুষ্টি, দীর্ঘদিনের মানসিক আঘাত এবং টিকাদানের প্রায় অভাবে এই সংক্রমণ আরও ভয়াবহ হয়ে উঠেছে। তার মতে, আক্রান্ত রোগীদের উপসর্গ অনেক সময় টানা দুই সপ্তাহ পর্যন্ত স্থায়ী হচ্ছে। এর মধ্যে রয়েছে উচ্চমাত্রার জ্বর, গিঁট ও হাড়ে তীব্র ব্যথা, লাগাতার মাথাব্যথা ও বমি। অনেক ক্ষেত্রে এই অসুস্থতা পরে তীব্র নিউমোনিয়ায় রূপ নিচ্ছে।
তিনি বলেন, ‘এই জটিলতাগুলো প্রাণঘাতী হয়ে উঠছে, বিশেষ করে যেসব বাস্তুচ্যুত পরিবার ঠান্ডা, আর্দ্রতা বা গাদাগাদি থেকে সুরক্ষা না পাওয়া তাঁবুতে বাস করছে তাদের জন্য।’
আবু সালমিয়া জানান, ইসরায়েলের গণহত্যা শুরুর পর থেকে গাজার স্বাস্থ্যব্যবস্থা এখন পর্যন্ত সবচেয়ে ভয়াবহ অবস্থায় রয়েছে। যুদ্ধবিরতির চুক্তির ১০০ দিনের বেশি সময় পার হলেও এই ধস আরও দ্রুত ঘটছে বলে তিনি সতর্ক করেন। তিনি বলেন, হাসপাতালগুলোতে ন্যূনতম চিকিৎসা সরঞ্জামেরও মারাত্মকভাবে ঘাটতি রয়েছে। আর এখন এভাবেই চলছে হাসপাতালগুলো।
তার ভাষায়, ‘আমাদের কাছে জীবাণুমুক্ত গজ বা অস্ত্রোপচারের গাউন পর্যন্ত নেই। অ্যান্টিবায়োটিকের ভয়াবহ সংকট রয়েছে। ক্যানসারের ওষুধ পুরোপুরি নেই। কিডনি ডায়ালাইসিসের রোগী ও দীর্ঘমেয়াদি অসুস্থতায় ভোগা মানুষের চিকিৎসার ওষুধও নেই’। তিনি মানসিক স্বাস্থ্য সংকটের কথাও তুলে ধরেন। তিনি বলেন, মানসিক রোগীদের চিকিৎসাকেন্দ্রগুলো ধ্বংস হয়ে গেছে এবং প্রয়োজনীয় ওষুধ প্রায় নেই বললেই চলে। এতে শুধু রোগীরাই নয়, পুরো সমাজই ঝুঁকির মধ্যে পড়ছে।
আবু সালমিয়া আরও জানান, গাজার প্রায় ৭০ শতাংশ চিকিৎসা পরীক্ষাগার এখন আর কাজ করছে না। প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি ও উপকরণের অভাবে চিকিৎসকেরা এমনকি সাধারণ পরীক্ষা-নিরীক্ষাও করতে পারছেন না।
আল-শিফার এই পরিচালক অভিযোগ করেন, ইসরায়েল ইচ্ছাকৃতভাবে গাজায় চিকিৎসা সরঞ্জাম ও ওষুধ প্রবেশে বাধা দিচ্ছে। এমনকি বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) ও ইউনিসেফের মতো আন্তর্জাতিক সংস্থার সুপারিশ করা সরঞ্জামও ঢুকতে দেয়া হচ্ছে না। তিনি বলেন, ‘প্রাণরক্ষাকারী ওষুধ ও যন্ত্রপাতি আটকে দেয়া হচ্ছে, অথচ কোমল পানীয়, স্ন্যাকস ও মোবাইল ফোনের মতো অপ্রয়োজনীয় জিনিস ঢুকতে দেয়া হচ্ছে’। তিনি একে পরিকল্পিতভাবে ক্ষতি করার চেষ্টা বলে অভিহিত করেন।
এমন অবস্থায় অবিলম্বে হস্তক্ষেপ করে চিকিৎসা সরঞ্জাম, পরীক্ষাগারের উপকরণ ও প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি অবাধে গাজায় ঢোকার ব্যবস্থা করতে আবু সালমিয়া আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের প্রতি আহ্বান জানান।
ফিলিস্তিনি স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে শুরু হওয়া ইসরায়েলি সামরিক অভিযানে এখন পর্যন্ত ৭১ হাজারের বেশি মানুষ নিহত হয়েছেন, যাদের বেশিরভাগই নারী ও শিশু। আহত হয়েছেন অন্তত ১ লাখ ৭১ হাজারের বেশি মানুষ।
যদিও গত ১০ অক্টোবর যুদ্ধবিরতি কার্যকর হয়, তবে তা বারবার লঙ্ঘনের অভিযোগ রয়েছে। যুদ্ধবিরতির পর থেকে ইসরায়েলি হামলায় অন্তত ৪৬৫ ফিলিস্তিনি নিহত এবং প্রায় ১,২৮৭ জন আহত হয়েছেন বলে জানিয়েছে স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষ।
মন্তব্য করুন