
ইরান সরকার দেশটিকে বৈশ্বিক ইন্টারনেট থেকে কার্যত স্থায়ীভাবে বিচ্ছিন্ন করার পথে—এমন আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন ডিজিটাল অধিকারকর্মীরা। নতুন ব্যবস্থায় সাধারণ নাগরিকরা আর আন্তর্জাতিক ইন্টারনেট ব্যবহারের অধিকার পাবেন না; বরং সীমিত সরকারি অনুমোদিত গ্রুপই বৈশ্বিক নেটওয়ার্কে প্রবেশ করতে পারবে।
ইন্টারনেট সেন্সরশিপ পর্যবেক্ষণকারী সংস্থা ফিল্টারওয়াচ-এর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইরানে ইন্টারনেট ব্যবহারের ধারণাই বদলে দেওয়া হচ্ছে। সরকার যাচাই-বাছাই করে যাদের ‘বিশেষ ছাড়পত্র’ দেবে, কেবল তারাই ফিল্টার করা আন্তর্জাতিক ইন্টারনেট ব্যবহার করতে পারবে। অন্য সাধারণ নাগরিকদের জন্য চালু থাকবে সম্পূর্ণ দেশীয় জাতীয় ইন্টারনেট, যা বৈশ্বিক নেটওয়ার্ক থেকে আলাদা।
ফিল্টারওয়াচের প্রধান আমির রাশিদি জানান, জাতীয় ইন্টারনেট মূলত সরকার নিয়ন্ত্রিত সমান্তরাল নেটওয়ার্ক। এতে কেবল সরকার অনুমোদিত সার্চ ইঞ্জিন, মেসেজিং অ্যাপ এবং দেশীয় স্ট্রিমিং সেবা থাকবে। বৈশ্বিক প্ল্যাটফর্ম বা উন্মুক্ত তথ্যভান্ডারে প্রবেশের সুযোগ থাকবে না।
ডিজিটাল অধিকারকর্মীরা অভিযোগ করেছেন, এই নজরদারি ও সেন্সরশিপ অবকাঠামো তৈরিতে চীনা প্রযুক্তি এবং হুয়াওয়ের উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন সরঞ্জাম ব্যবহার করা হয়েছে। এসব সরঞ্জামের মাধ্যমে ইন্টারনেট ট্রাফিক পর্যবেক্ষণ, নিয়ন্ত্রণ এবং প্রয়োজন অনুযায়ী ব্লক করা সম্ভব।
৮ জানুয়ারি থেকে শুরু হওয়া ইন্টারনেট ব্ল্যাকআউট ইতিমধ্যেই ইতিহাসের দীর্ঘতমগুলোর মধ্যে পড়েছে। নেটব্লকস-এর তথ্য অনুযায়ী, দেশজুড়ে ২০০ ঘণ্টারও বেশি সময় ধরে কার্যকর ইন্টারনেট নেই। এটি ২০১১ সালের মিসরের তাহরির স্কয়ার আন্দোলনের সময়কার শাটডাউনকেও ছাড়িয়ে গেছে।
সরকারি মুখপাত্র ফাতেমেহ মোহাজেরানি ইঙ্গিত দিয়েছেন, ইরানি নববর্ষ নওরোজ (২০ মার্চ) পর্যন্ত এই পরিস্থিতি অব্যাহত থাকতে পারে।
মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের এক সাবেক কর্মকর্তা দ্য গার্ডিয়ানকে জানিয়েছেন, ‘ইরান স্থায়ীভাবে বৈশ্বিক ইন্টারনেট ব্যবস্থা থেকে বিচ্ছিন্ন হতে পারে।’ বিশ্লেষকদের মতে, বর্তমান পরিস্থিতি হঠাৎ কোনো সিদ্ধান্ত নয়, এটি গত দেড় দশকের পরিকল্পনার চূড়ান্ত ধাপ।
২০০৯ সালে সাবেক প্রেসিডেন্ট মাহমুদ আহমাদিনেজাদের পুনর্নির্বাচনের পর ইন্টারনেট ব্ল্যাকআউটের ফলে সরকার বুঝতে পারে, পূর্ণাঙ্গ ব্ল্যাকআউট অর্থনৈতিকভাবে ব্যয়বহুল। ২০১২ সালে গঠিত হয় সুপ্রিম কাউন্সিল অব সাইবারস্পেস এবং দেশীয় ইন্টারনেট অবকাঠামো তৈরি শুরু হয়।
পরবর্তীতে চালু হয় হোয়াইটলিস্টিং, যেখানে ফেসবুক, টুইটার ও গুগল বন্ধ থাকলেও অর্থনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ কিছু সেবা চালু রাখা হয়। এর কেন্দ্রে রয়েছে ‘মিডলবক্স’ প্রযুক্তি, যা ইন্টারনেট ট্রাফিক নজরদারি, নিয়ন্ত্রণ এবং নির্দিষ্ট টুল ব্লক করতে সক্ষম।
বিক্ষোভকারীদের শেষ ভরসা ছিল ইলন মাস্কের স্টারলিংক, তবে ২০২৫ সালের এক আইনে ইরানে স্টারলিংক টার্মিনাল রাখা ‘ইসরায়েলের জন্য গুপ্তচরবৃত্তি’ হিসেবে ধরা হয়েছে, যার শাস্তি মৃত্যুদণ্ড পর্যন্ত হতে পারে। তেহরানের নিরাপত্তা বাহিনী রাশিয়া ও চীনা প্রযুক্তি ব্যবহার করে স্টারলিংকের সিগন্যালও বাধাগ্রস্ত করার চেষ্টা চালাচ্ছে।
মন্তব্য করুন