
যুক্তরাষ্ট্রের নিউ ইয়র্ক সিটির ইতিহাসে নজিরবিহীন এক নার্স ধর্মঘটে অংশ নিয়েছেন প্রায় ১৫ হাজার স্বাস্থ্যকর্মী। বেতন-ভাতা বৃদ্ধি, নিরাপদ কর্মপরিবেশ নিশ্চিতকরণ এবং পর্যাপ্ত নার্স নিয়োগের দাবিতে সোমবার (১২ জানুয়ারি) ভোর থেকে শহরের তিনটি প্রধান বেসরকারি হাসপাতাল—মাউন্ট সিনাই, মন্টিফিওর ও নিউ ইয়র্ক-প্রেসবিটেরিয়ান—এর নার্সরা একযোগে কর্মবিরতি শুরু করেন।
দীর্ঘদিন ধরে চলা চুক্তিভিত্তিক আলোচনা ব্যর্থ হওয়ার পর নিউ ইয়র্ক স্টেট নার্সিং অ্যাসোসিয়েশন এই ধর্মঘটের ডাক দেয়। ধর্মঘটরত নার্সদের সঙ্গে সংহতি জানিয়ে রাস্তায় নেমেছেন নিউ ইয়র্ক সিটির নবনির্বাচিত মেয়র জোহরান মামদানিসহ একাধিক রাজনৈতিক নেতা। মেয়রের প্রকাশ্য সমর্থন শহরের প্রভাবশালী হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের ওপর বাড়তি রাজনৈতিক ও নৈতিক চাপ সৃষ্টি করেছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
নার্সিং অ্যাসোসিয়েশনের বিবৃতিতে বলা হয়, কয়েক মাসের আলোচনার পরও হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ নিরাপদ স্টাফিং রেশিও বা পর্যাপ্ত নার্স নিয়োগের বিষয়ে কোনো কার্যকর প্রতিশ্রুতি দেয়নি। উল্টো লাভজনক হাসপাতালগুলো নার্সদের বিদ্যমান স্বাস্থ্য বিমা ও অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা কমানোর হুমকি দিয়েছে বলে অভিযোগ করা হয়।
অথচ প্রকাশিত আর্থিক নথি অনুযায়ী, ২০২৪ সালে নিউ ইয়র্ক-প্রেসবিটেরিয়ান হাসপাতাল প্রায় ৫৪৭ মিলিয়ন ডলার এবং মন্টিফিওর হাসপাতাল প্রায় ২৮৯ মিলিয়ন ডলার নিট মুনাফা করেছে। নার্সদের অভিযোগ, বিপুল মুনাফা সত্ত্বেও কর্মীদের নিরাপত্তা ও কল্যাণে প্রয়োজনীয় বিনিয়োগ করা হচ্ছে না।
ধর্মঘটরত নার্সরা হাসপাতালের প্রবেশপথে মেটাল ডিটেক্টর স্থাপন, কর্মস্থলে সহিংসতা প্রতিরোধে কঠোর ব্যবস্থা এবং নিরাপত্তা জোরদারের দাবি জানিয়েছেন। সম্প্রতি মাউন্ট সিনাই ও নিউ ইয়র্ক-প্রেসবিটেরিয়ান হাসপাতালে ঘটে যাওয়া গোলাগুলির ঘটনায় চিকিৎসাকর্মীদের মধ্যে গভীর উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
এই ধর্মঘট শুরু হয়েছে এমন এক সময়ে, যখন নিউ ইয়র্ক সিটি তীব্র ইনফ্লুয়েঞ্জা মৌসুমের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। গত ডিসেম্বরের শেষ দিকে জরুরি বিভাগে আসা রোগীদের প্রায় ৯ শতাংশই ফ্লু আক্রান্ত ছিলেন। কানি গ্র্যাজুয়েট স্কুল অব পাবলিক হেলথ-এর অধ্যাপক ব্রুস ওয়াই লি সতর্ক করে বলেন, এই সংকটকালে নার্সদের অনুপস্থিতি স্বাস্থ্যসেবাকে বড় ধরনের ঝুঁকির মুখে ফেলতে পারে।
তবে মেয়র জোহরান মামদানি নার্সদের এই আন্দোলনকে একটি ‘নৈতিক লড়াই’ হিসেবে আখ্যা দিয়েছেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্স-এ দেওয়া এক পোস্টে তিনি লেখেন, আমাদের নার্সরা সবচেয়ে কঠিন সময়ে এই শহরকে বাঁচিয়ে রেখেছেন। তাদের মর্যাদা ও স্বাস্থ্যসেবা নিয়ে কোনো আপস করা হবে না।
সোমবার তিনি নিজেই পিকেট লাইনে যোগ দিয়ে হাসপাতাল মালিকদের অতিরিক্ত মুনাফাকেন্দ্রিক মানসিকতার তীব্র সমালোচনা করেন।
অন্যদিকে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের দাবি, তারা নার্সদের জন্য এমন বেতন বৃদ্ধির প্রস্তাব দিয়েছে, যা তাদের নিউ ইয়র্ক সিটির সর্বোচ্চ বেতনভুক্ত স্বাস্থ্যকর্মীদের তালিকায় রাখবে। নিউ ইয়র্ক-প্রেসবিটেরিয়ান হাসপাতালের এক মুখপাত্র জানান, তারা এখনো একটি ন্যায্য ও টেকসই চুক্তিতে পৌঁছাতে আগ্রহী।
তবে নার্সিং ইউনিয়নের ভাষ্য, কর্তৃপক্ষের প্রস্তাবিত এককালীন বা ল্যাম্প-সাম অর্থ সহায়তা দীর্ঘমেয়াদে স্বাস্থ্য বিমা, জীবনযাত্রার ব্যয় ও কর্মপরিবেশের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সম্পূর্ণ অপর্যাপ্ত।
এই আন্দোলন এখন আর শুধু স্বাস্থ্যখাতের দাবি-দাওয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। বিশ্লেষকদের মতে, এটি গভর্নর ক্যাথি হোকুলের আসন্ন পুনর্নির্বাচন এবং মেয়র জোহরান মামদানির রাজনৈতিক অবস্থানের জন্যও একটি বড় পরীক্ষা হয়ে দাঁড়িয়েছে। চলমান অচলাবস্থার অবসানে এখনো কোনো পক্ষই চূড়ান্ত সমঝোতায় পৌঁছাতে পারেনি।
সূত্র: আল জাজিরা
মন্তব্য করুন