
ইরানে নিয়ন্ত্রণহীনভাবে জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি ও গভীর অর্থনৈতিক সংকটের বিরুদ্ধে শুরু হওয়া বিক্ষোভ ক্রমেই সহিংস ও রক্তক্ষয়ী রূপ নিচ্ছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সঙ্গে বিক্ষোভকারীদের সংঘর্ষে এখন পর্যন্ত অন্তত ৬ জন নিহত হওয়ার খবর নিশ্চিত করেছে আন্তর্জাতিক ও স্থানীয় সংবাদমাধ্যম।
কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল জাজিরা এবং ইরানের আধা-সরকারি বার্তা সংস্থা ফার্স নিউজ এজেন্সি জানায়, রাজধানী তেহরান থেকে শুরু হওয়া এই গণবিক্ষোভ বর্তমানে দেশের বিভিন্ন প্রদেশে ছড়িয়ে পড়েছে। সাধারণ জনগণের ক্ষোভ এখন সরাসরি সরকারবিরোধী আন্দোলনে রূপ নিয়েছে।
বিক্ষোভের অন্যতম কেন্দ্রস্থল লরেস্তান প্রদেশের আজনা শহরে গত বৃহস্পতিবার রাতে ভয়াবহ সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। ফার্স নিউজ এজেন্সির তথ্য অনুযায়ী, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সঙ্গে সংঘাতে সেখানে ৩ জন নিহত এবং ১৭ জন গুরুতর আহত হন।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিও ফুটেজে দেখা যায়, বিক্ষোভকারীরা শহরের রাস্তায় আগুন জ্বালিয়ে ‘নির্লজ্জ! নির্লজ্জ!’ স্লোগান দিচ্ছেন। একই সঙ্গে মুহুর্মুহু গুলির শব্দে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হয়ে ওঠে।
তেহরান থেকে প্রায় ৪৭০ কিলোমিটার দক্ষিণে অবস্থিত চাহারমহল ও বখতিয়ারি প্রদেশের লোরদেগান শহরে আরও ২ জন বিক্ষোভকারী নিহত হয়েছেন। ক্ষুব্ধ জনতা গভর্নরের কার্যালয়, মসজিদ ও ব্যাংকসহ বিভিন্ন সরকারি ভবনে ইট-পাটকেল নিক্ষেপ করলে পুলিশ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে টিয়ার গ্যাস ও শক্তি প্রয়োগ করে।
এদিকে, নিরাপত্তা বাহিনীর পক্ষেও প্রাণহানির ঘটনা ঘটেছে। ইরানের রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনের বরাতে জানা যায়, পশ্চিমাঞ্চলীয় কুহদাশত শহরে সংঘর্ষ চলাকালে বাসিজ বাহিনীর ২১ বছর বয়সী এক সদস্য নিহত হন।
লরেস্তান প্রদেশের ডেপুটি গভর্নর সাঈদ পুরালি জানান, জনশৃঙ্খলা রক্ষার দায়িত্ব পালনকালে দাঙ্গাকারীদের হামলায় ওই বাসিজ সদস্য প্রাণ হারান। উল্লেখ্য, বাসিজ বাহিনী ইরানের প্রভাবশালী ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনী (আইআরজিসি)–এর সহযোগী একটি আধাসামরিক সংগঠন।
এই সহিংসতা এমন এক সময়ে ঘটছে, যখন ইরানের অর্থনীতি ৪০ শতাংশের বেশি মূল্যস্ফীতির চাপে বিপর্যস্ত। পাশাপাশি গত বছরের মাঝামাঝি সময়ে ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের বিমান হামলায় দেশটির সামরিক ও পারমাণবিক অবকাঠামো মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
বিশ্লেষকদের মতে, ২০২২ সালে মাহসা আমিনীর মৃত্যুকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা আন্দোলনের পর এটিই ইরানে সবচেয়ে বড় ও তীব্র গণবিক্ষোভ।
আল জাজিরার তেহরান প্রতিনিধি তৌহিদ আসাদি জানান, পরিস্থিতি সামাল দিতে সরকার এবার তুলনামূলক সতর্ক কৌশল নিচ্ছে এবং জনগণের অর্থনৈতিক কষ্ট লাঘবের আশ্বাস দিচ্ছে।
প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান বিক্ষোভকারীদের দাবিকে ‘যৌক্তিক’ আখ্যা দিয়ে বলেন, সাধারণ মানুষের জীবিকার সংকট সমাধান ব্যর্থ হলে শাসকগোষ্ঠীর পরিণতি হবে ভয়াবহ।
তবে এর মধ্যেই তাসনিম নিউজ এজেন্সি জানিয়েছে, বিক্ষোভ উসকে দেওয়ার অভিযোগে ৭ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তাদের বিরুদ্ধে বিদেশি শক্তির মদতপুষ্ট হওয়ার অভিযোগও আনা হয়েছে।
সূত্র: আল জাজিরা
মন্তব্য করুন