
দক্ষিণ আমেরিকার দেশ ভেনেজুয়েলার ওপর রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক চাপ বহুগুণ বাড়াতে দেশটির তেল রপ্তানির ওপর কঠোর ‘কোয়ারেন্টিন’ বা কার্যত অবরোধ আরোপের নির্দেশ দিয়েছে হোয়াইট হাউস। এই সিদ্ধান্ত আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নতুন করে উত্তেজনা সৃষ্টি করেছে।
বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে বুধবার (২৪ ডিসেম্বর) একজন উচ্চপদস্থ মার্কিন কর্মকর্তা জানান, প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসন অন্তত আগামী দুই মাস ভেনেজুয়েলার তেল রপ্তানি পুরোপুরি বন্ধ করতে সামরিক বাহিনীকে সর্বোচ্চ শক্তি ব্যবহারের নির্দেশ দিয়েছে।
এই পরিকল্পনার অংশ হিসেবে পেন্টাগন ইতোমধ্যে ক্যারিবীয় অঞ্চলে ব্যাপক সামরিক সমাবেশ ঘটিয়েছে। সেখানে একটি বিমানবাহী রণতরী, ১১টি যুদ্ধজাহাজ, এক ডজনের বেশি এফ-৩৫ যুদ্ধবিমান এবং ১৫ হাজারেরও বেশি মার্কিন সেনা মোতায়েন করা হয়েছে।
যদিও সামরিক হস্তক্ষেপের পথ পুরোপুরি বন্ধ করা হয়নি, তবে আপাতত অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা ও জ্বালানি অবরোধের মাধ্যমেই নিকোলাস মাদুরো সরকারকে চাপে রাখার কৌশল নিয়েছে ওয়াশিংটন।
বিশ্লেষকরা এই পরিস্থিতিকে ১৯৬২ সালের কিউবান মিসাইল সংকটের সঙ্গে তুলনা করছেন। সে সময় তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট জন এফ কেনেডি ‘অবরোধ’ শব্দটি এড়িয়ে ‘কোয়ারেন্টিন’ শব্দটি ব্যবহার করেছিলেন। বর্তমান প্রশাসনের লক্ষ্য হলো জানুয়ারির শেষ নাগাদ ভেনেজুয়েলাকে চরম অর্থনৈতিক বিপর্যয়ের মুখে ঠেলে দেওয়া, যাতে তারা যুক্তরাষ্ট্রের শর্তে রাজনৈতিক সমঝোতায় বাধ্য হয়।
রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রকাশ্যে কিছুটা অস্পষ্টতা বজায় রাখলেও গোপনে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প নিকোলাস মাদুরোকে ক্ষমতা ছেড়ে দেশত্যাগে বাধ্য করতে চাপ দিচ্ছেন। এরই মধ্যে মার্কিন কোস্টগার্ড ক্যারিবীয় সাগরে ভেনেজুয়েলার অপরিশোধিত তেলবাহী দুটি বিশাল ট্যাংকার জব্দ করেছে। এছাড়া ‘বেলা-১’ নামের আরও একটি নিষেধাজ্ঞাপ্রাপ্ত জাহাজ আটকের প্রস্তুতি চলছে।
মার্কিন প্রশাসন ভেনেজুয়েলার বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রে মাদক পাচারের গুরুতর অভিযোগ এনেছে। এই অভিযোগের প্রেক্ষিতে গত কয়েক মাস ধরে দক্ষিণ আমেরিকা থেকে আসা সন্দেহভাজন নৌযানের ওপর সরাসরি সামরিক হামলা চালানো হচ্ছে, যা বহু দেশ বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড হিসেবে নিন্দা জানিয়েছে।
এ ছাড়াও প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প প্রায়ই ভেনেজুয়েলার মাদক অবকাঠামোতে সরাসরি হামলার হুমকি দিচ্ছেন এবং কারাকাসকেন্দ্রিক সিআইএ-র গোপন তৎপরতার অনুমোদন দিয়েছেন বলে জানা গেছে।
মঙ্গলবার জাতিসংঘে ভেনেজুয়েলার রাষ্ট্রদূত স্যামুয়েল মনকাডা এই পরিস্থিতির তীব্র প্রতিবাদ জানিয়ে বলেন, ভেনেজুয়েলা বিশ্বের জন্য কোনো হুমকি নয়; বরং বর্তমানে বৈশ্বিক নিরাপত্তার জন্য প্রকৃত হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে মার্কিন সরকার।
এদিকে জাতিসংঘের বিশেষজ্ঞরা বুধবার এক বিবৃতিতে এই সম্ভাব্য অবরোধের নিন্দা জানিয়ে বলেন, আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী এ ধরনের শক্তি প্রয়োগ ‘অবৈধ সশস্ত্র আগ্রাসন’ হিসেবে বিবেচিত। বিশেষ করে এফ-৩৫ যুদ্ধবিমানের মতো আধুনিক অস্ত্র মোতায়েন কেবল নিষেধাজ্ঞা বাস্তবায়নের চেয়ে বড় ধরনের সামরিক সংঘাতের ইঙ্গিত দিচ্ছে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করা হয়েছে।
পেন্টাগন অবশ্য দাবি করেছে, এই পদক্ষেপের মূল উদ্দেশ্য হলো মাদুরো সরকারকে আর্থিকভাবে সম্পদহীন করা এবং তাদের আয়ের প্রধান উৎস তেল রপ্তানি পুরোপুরি বন্ধ করে দেওয়া।
এই ক্রমবর্ধমান আন্তর্জাতিক উত্তেজনার প্রভাবে বিশ্ববাজারে তেলের দাম ও দক্ষিণ আমেরিকার ভূ-রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা এখন বড় ধরনের ঝুঁকির মুখে পড়েছে।
সূত্র: রয়টার্স
মন্তব্য করুন