
ইন্দোনেশিয়ায় বিরল ঘূর্ণিঝড়ে সৃষ্ট ভয়াবহ বন্যায় মৃতের সংখ্যা ৫০০ ছাড়িয়েছে। মঙ্গলবার (২ ডিসেম্বর) বিবিসি জানিয়েছে, দেশটির উদ্ধারকর্মীরা এখনও ক্ষতিগ্রস্ত এলাকায় পৌঁছাতে লড়াই করছেন।
মালাক্কা প্রণালীতে গত সপ্তাহে তৈরি হওয়া এই ঘূর্ণিঝড় তিনটি প্রদেশ—আচেহ, উত্তর সুমাত্রা ও পশ্চিম সুমাত্রা—তে আঘাত হানেছে। সরকারের দুর্যোগ বিষয়ক সংস্থা জানিয়েছে, প্রায় ১৪ লাখ মানুষ সরাসরি প্রভাবিত হয়েছেন এবং আরও অন্তত ৫০০ মানুষ নিখোঁজ আছে। এছাড়া কয়েক হাজার মানুষ আহত হয়েছে।
উত্তর-পূর্ব মৌসুমি বায়ু ও ঘূর্ণিঝড়ের বিরল প্রভাবে প্রচুর বৃষ্টি হয়েছে। দেশটির রাস্তাঘাট কাঁদা ও ধ্বংসাবশেষে বন্ধ থাকায় ত্রাণকর্মীরা মোটরসাইকেল ও পায়ে হেঁটে মানুষের কাছে পৌঁছানোর চেষ্টা করছেন। মধ্য আচেহ ও মধ্য তাপানুলি প্রদেশে খাদ্য ও পানি সংকট তীব্র। অনেক মানুষ দু-তিন দিন ধরে খাবার পাননি।
আচেহ প্রদেশের একজন অধিবাসী বর্ণনা দিয়েছেন, বন্যার পানি সুনামির মতো মনে হয়েছে। এটি আমার জীবনের সবচেয়ে ভয়াবহ অভিজ্ঞতা। পশ্চিম সুমাত্রার ব্রিজ এলাকায় মানুষ এখনো নিখোঁজ পরিবার খুঁজছেন।
দেশটির প্রেসিডেন্ট ক্ষতিগ্রস্ত এলাকায় পরিদর্শন করেছেন এবং জানিয়েছেন, “আমরা দৃঢ়তা ও সংহতি নিয়ে দুর্যোগ মোকাবেলা করছি। সংকট কাটাতে সবকিছু করা হচ্ছে।” তবে সমালোচকরা জানিয়েছেন, বন্যা মোকাবিলায় প্রস্তুতি কম ছিল এবং খাদ্য সাহায্য বিতরণে আমলাতান্ত্রিক জটিলতা দেখা দিয়েছে।
বহু মানুষ এখনো খাদ্য সহায়তার জন্য অপেক্ষা করছে। অনেকেই বলেছেন তারা দু তিনদিন ধরে কিছু খাননি। উত্তর সুমাত্রার সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত এলাকাগুলোর একটি হলো মধ্য তাপানুলি। সেখানকার অধিবাসী মায়াসানতি বিবিসিকে বলেছেন যে তার এলাকায় ত্রাণকর্মীদের পৌঁছাতে বেগ পেতে হচ্ছে।
"সবকিছু শেষ। খাবার শেষ হওয়ার পথে," বলছিলেন তিনি। "এমনকি ইনস্ট্যান্ট নুডুলস নিয়ে মারামারি হচ্ছে। আমাদের খাদ্য ও চাল দরকার। আমাদের দিকে আসার পথ পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন"।
তিনি বলেন ইন্টারনেট ও বিশুদ্ধ পানির মতো প্রয়োজনীয় জিনিস পেতে তাকে কয়েক কিলোমিটার হেঁটে যেতে হয়েছে।
মধ্য আচেহ এলাকায় কর্তৃপক্ষ স্টারলিংক ডিভাইস দিয়েছে। সেখানে মানুষের লম্বা সাড়ি দেখা গেছে। তারা তাদের প্রিয়জনদের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করছিলেন বা মোবাইল ফোনে চার্জ দিচ্ছিলেন।
পাঁচদিন ধরে সিগন্যাল নেই। নেটওয়ার্কের জন্য গতকাল থেকে অপেক্ষা করছি। আমার মাকে ফোন দিতে চেয়েছিলাম। কিন্তু এখনো পারিনি, বলছিলেন আরেকজন অধিবাসী মার।
উদ্ধার তৎপরতা বাড়ছে কিন্তু একই সঙ্গে সরকারের দুর্যোগ মোকাবিলা নিয়ে অসন্তোষও বাড়ছে।
সমালোচকরা বলছেন, বন্যা মোকাবিলায় প্রস্তুতিকে দুর্বল ছিল। খাদ্য সাহায্য বিতরণে আমলাতান্ত্রিক দীর্ঘসূত্রিতার বিষয়টিও সামনে আসছে।
সোমবার দেশটির প্রেসিডেন্ট ক্ষতিগ্রস্ত উত্তর সুমাত্রা পরিদর্শন করেছেন। তিনি স্বীকার করেছেন যে কিছু সড়ক এখনো বিচ্ছিন্ন অবস্থায় আছে। তবে সংকট কাটিয়ে উঠতে সবকিছু করা হচ্ছে বলে জানান তিনি।
আমরা দৃঢ়তা ও সংহতি নিয়ে দুর্যোগ মোকাবেলা করছি। এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে জাতি হিসেবে আমরা এখন শক্তিশালী, বলেছেন তিনি।
পুরো দক্ষিণ ও দক্ষিণ পূর্ব এশিয়াজুড়ে গত সপ্তাহের বন্যা ও ভূমিধ্বসে ১১০০ মানুষের মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে শ্রীলঙ্কায় মারা গেছে ৩৫৫ জন। অন্যদিকে থাইল্যান্ডে মৃতের সংখ্যা ১৭৬ ছাড়িয়েছে।
তবে এই বন্যার জন্য আবহাওয়ার একক কোনো বিষয় দায়ী নয়। বরং বলা হচ্ছে, আবহাওয়াজনিত বিভিন্ন কারণ এই বন্যার জন্য দায়ী।
বিবিসি ওয়েদার বলছে, একটি কারণ হলো উত্তর-পূর্ব মৌসুমি বায়ু। এটি সাধারণত নভেম্বর থেকে মার্চ পর্যন্ত পূর্ব ও দক্ষিণ এশিয়ায় প্রভাব ফেলে। এর জের ধরে উত্তর পূর্ব দিকে বাতাস বয়ে আসে যা সমুদ্র থেকে আর্দ্রতা শুষে নেয় এবং বৃষ্টিপাত ঘটায়। এই মৌসুমি বায়ুর প্রভাবে প্রচুর বৃষ্টি হয়।
শ্রীলঙ্কায় ঘূর্ণিঝড় ডিটওয়ার কারণে প্রচুর বৃষ্টি হয়েছে। তবে ঝড়টি দুর্বল হয়ে গেছে। ফলে ভারতের দক্ষিণ পূর্ব এলাকায় বৃষ্টি হচ্ছে।
মালয় উপত্যকায় সুমাত্রা ও থাইল্যান্ডের দক্ষিণাঞ্চলে ঘূর্ণিঝড় সেনিয়ার একই ধরনের প্রভাব ফেলেছে। প্রচুর বৃষ্টি হয়েছে। এটি একটি বিরল ধরনের ঝড়। ওই এলাকায় এভাবে সাধারণত ঘূর্ণিঝড় তৈরি হয় না।
ভিয়েতনামেও গত কয়েক সপ্তাহে অনেক বৃষ্টি হয়েছে। টাইফুন কোটোর শেষাংশ ভিয়েতনাম উপকূলের দিকে আসতে থাকা আর বর্ষণ ও অতিরিক্ত বন্যার আশঙ্কা করা হচ্ছে।
সম্ভবত জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব এসব ক্ষেত্রে ভূমিকা রেখেছে। যদিও বৈশ্বিক উষ্ণায়ন থেকে আরও ঝড় বা ঘূর্ণিঝড়ের আশংকা করা হচ্ছে না। তারপরেও বন্যা পরিস্থিতি তৈরি করতে পারে এমন ভারী বৃষ্টিপাতের আশঙ্কা করা হচ্ছে।
মন্তব্য করুন