
গ্রীষ্মকাল এলেই বাজার ভরে ওঠে রসালো ও সুগন্ধি আমে। বাংলাদেশের প্রায় সব বয়সীর কাছেই আম একটি প্রিয় ফল। কিন্তু এই জনপ্রিয় ফল নিয়েই একটি সাধারণ প্রশ্ন ঘুরে বেড়ায়—আম খেলে কি ওজন বেড়ে যায়?
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই প্রশ্নের উত্তর সরাসরি ‘হ্যাঁ’ বা ‘না’ নয়। বরং আম খাওয়ার পরিমাণ, সময় এবং খাওয়ার ধরনই নির্ধারণ করে এটি শরীরের ওজনের ওপর কী প্রভাব ফেলবে। সঠিকভাবে খেলে আম বরং স্বাস্থ্যকর ডায়েটের অংশ হয়ে ওজন নিয়ন্ত্রণেও সাহায্য করতে পারে।
পুষ্টিগুণের দিক থেকে আম অত্যন্ত সমৃদ্ধ একটি ফল। এতে রয়েছে ভিটামিন এ, ভিটামিন সি, আঁশ, পটাশিয়াম, ম্যাগনেশিয়াম, অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট ও প্রাকৃতিক শর্করা। খোসা ও আঁটি ছাড়া ১০০ গ্রাম আমে প্রায় ৬৫ থেকে ৭০ ক্যালরি থাকে, যা তুলনামূলকভাবে কম।
অন্যদিকে একই পরিমাণ সেদ্ধ ভাতে ক্যালরি থাকে প্রায় ১২৫ এবং কার্বোহাইড্রেটও অনেক বেশি। অর্থাৎ শুধু ক্যালরি নয়, পুষ্টির দিক থেকেও আম অনেক ক্ষেত্রে ভাত বা প্রসেসড স্ন্যাক্সের চেয়ে ভালো বিকল্প হতে পারে। তবে সমস্যা তৈরি হয় তখনই, যখন আমরা আমকে ভুলভাবে খাবারের সঙ্গে মিশিয়ে খাই।
আম খেয়ে ওজন বাড়ার প্রধান কারণ হলো খাওয়ার ভুল অভ্যাস। আমাদের অনেকেরই অভ্যাস হলো ভাত বা রুটির পর ডেজার্ট হিসেবে আম খাওয়া, কিংবা দুধ, মুড়ি বা অন্যান্য স্ন্যাক্সের সঙ্গে আম খাওয়া। এই অভ্যাসে একসঙ্গে একাধিক কার্বোহাইড্রেট শরীরে প্রবেশ করে, ফলে ক্যালরি অনেক বেড়ে যায়। বিশেষ করে রাতে খাবারের পর আম খেলে সমস্যা আরও বাড়ে, কারণ তখন শরীরের শারীরিক কার্যকলাপ কম থাকে এবং ক্যালরি বার্ন হওয়ার সুযোগ থাকে না। ফলে অতিরিক্ত শক্তি শরীরে চর্বি হিসেবে জমা হতে শুরু করে, যা ধীরে ধীরে ওজন বৃদ্ধির কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
বিশেষজ্ঞদের মতে, আম খাওয়ার সঠিক উপায় জানা থাকলে এটি ওজন নিয়ন্ত্রণের ডায়েটেও জায়গা পেতে পারে। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, সকালের নাশতা বা দুপুরের খাবারের বিকল্প হিসেবে পরিমাণমতো আম খাওয়া যেতে পারে। এক বেলায় প্রায় ৩০০ থেকে ৩৫০ গ্রাম আম, অর্থাৎ দুই থেকে তিনটি মাঝারি আকারের আম খাওয়া যেতে পারে, তবে সেক্ষেত্রে অন্য কোনো কার্বোহাইড্রেট খাবার গ্রহণ করা উচিত নয়। আমকে আলাদা খাবার হিসেবে খাওয়া সবচেয়ে ভালো, যাতে এটি ভাত বা রুটির মতো অন্য শর্করাসমৃদ্ধ খাবারের সঙ্গে মিশে অতিরিক্ত ক্যালরি তৈরি না করে।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো সময়। বিকেলের আগেই আম খাওয়া শেষ করা ভালো, কারণ দিনের বেলায় শরীর তুলনামূলক বেশি সক্রিয় থাকে এবং ক্যালরি খরচ হওয়ার সুযোগ থাকে। সন্ধ্যার পর বা রাতে আম খাওয়া এড়িয়ে চলা উচিত। এছাড়া আমের জুস না খেয়ে আস্ত ফল চিবিয়ে খাওয়া বেশি উপকারী, কারণ এতে আঁশ পাওয়া যায় এবং হজম প্রক্রিয়া ধীরগতিতে হয়, যা দীর্ঘ সময় পেট ভরা রাখতে সাহায্য করে। খাওয়ার পর হালকা হাঁটাহাঁটি বা শারীরিক নড়াচড়া করলে অতিরিক্ত ক্যালরি ব্যবহারে সহায়তা হয়।
অনেকে আবার মনে করেন খালি পেটে আম খেলে গ্যাস্ট্রিক হতে পারে। তবে আম টকজাতীয় ফল নয় এবং এতে প্রাকৃতিক শর্করা ও আঁশ থাকে, তাই পরিমিত পরিমাণে খেলে সাধারণত গ্যাস্ট্রিকের ঝুঁকি থাকে না। বরং এটি হজমে সহায়তা করে এবং শরীরে প্রাকৃতিক শক্তি যোগায়।
সব মিলিয়ে বলা যায়, আম কোনোভাবেই ওজন বাড়ানোর প্রধান কারণ নয়। বরং এটি একটি পুষ্টিকর ও স্বাস্থ্যকর ফল। ওজন নিয়ন্ত্রণে রাখতে হলে মূল বিষয় হলো— কখন খাচ্ছেন, কতটা খাচ্ছেন এবং কীভাবে খাচ্ছেন। সঠিক নিয়ম মেনে আম খেলে এই গ্রীষ্মকালীন প্রিয় ফলটি স্বাস্থ্য ও স্বাদের দারুণ সমন্বয় হয়ে উঠতে পারে।
মন্তব্য করুন