
ক্যান্সার নিয়ে মানুষের ভীতি বরাবরই বেশি। তবে সব ক্যান্সার যে ভয়াবহ পরিণতির দিকে নিয়ে যায়, বিষয়টি তেমন নয়। থাইরয়েড ক্যান্সার তার একটি বড় উদাহরণ। গলার নিচে অবস্থিত ছোট একটি গ্রন্থিতে হওয়া এই ক্যান্সার বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই ধীরে বাড়ে এবং সময়মতো চিকিৎসা নিলে প্রায় সম্পূর্ণ নিরাময়যোগ্য।
থাইরয়েড হলো গলার নিচের অংশে থাকা প্রজাপতি-আকৃতির একটি গ্রন্থি, যা শরীরের শক্তি ব্যবহার, তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ, হৃৎস্পন্দন ও রক্তচাপ স্বাভাবিক রাখতে হরমোন তৈরি করে। এই গ্রন্থির কোষে জেনেটিক পরিবর্তন বা মিউটেশনের ফলে থাইরয়েড ক্যান্সারের সৃষ্টি হয়।
যুক্তরাষ্ট্রে প্রতিবছর প্রায় ৪৪ হাজার মানুষ থাইরয়েড ক্যান্সারে আক্রান্ত হলেও আশার কথা হলো এই ক্যান্সার থেকে নিরাময়ের হার অনেক বেশি। বাংলাদেশে নির্দিষ্ট পরিসংখ্যান না থাকলেও চিকিৎসকরা বলছেন, নারীদের মধ্যে থাইরয়েড ক্যান্সারের হার ধীরে ধীরে বাড়ছে।
থাইরয়েড ক্যান্সারের বিভিন্ন ধরন রয়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি দেখা যায় প্যাপিলারি থাইরয়েড ক্যান্সার, যা ধীরে বাড়ে এবং চিকিৎসায় খুব ভালো সাড়া দেয়। ফলিকুলার থাইরয়েড ক্যান্সার তুলনামূলক কম হলেও এটি হাড় বা ফুসফুসে ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি রাখে। অনকোসাইটিক ও মেডুলারি থাইরয়েড ক্যান্সার অপেক্ষাকৃত বিরল, তবে চিকিৎসা জটিল হতে পারে।
সবচেয়ে মারাত্মক হলো অ্যানাপ্লাস্টিক থাইরয়েড ক্যান্সার, যা খুব দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে এবং জীবনঝুঁকিও বেশি।
থাইরয়েড ক্যান্সারের সবচেয়ে সাধারণ লক্ষণ হলো গলায় ব্যথাহীন একটি গিঁট। অনেক সময় এই গিঁটকে সাধারণ সমস্যা ভেবে উপেক্ষা করা হয়। এ ছাড়া গলায় ফোলা, কণ্ঠস্বর ভেঙে যাওয়া, গিলতে বা শ্বাস নিতে কষ্ট হওয়ার মতো উপসর্গও দেখা দিতে পারে। তবে মনে রাখা জরুরি, গলার সব গিঁটই ক্যান্সার নয়।
গবেষণা অনুযায়ী, প্রতি দশটি থাইরয়েড নডিউলের মধ্যে মাত্র একটি ক্যান্সার হয়ে থাকে।
এই ক্যান্সারের পেছনে বেশ কিছু ঝুঁকিপূর্ণ কারণ কাজ করে। নারীরা পুরুষের তুলনায় প্রায় তিন গুণ বেশি আক্রান্ত হন। পারিবারিক ইতিহাস, শৈশবে মাথা ও গলায় রেডিয়েশন থেরাপি, আয়োডিনের ঘাটতি, স্থূলতা এবং অতিরিক্ত বিকিরণের সংস্পর্শ থাইরয়েড ক্যান্সারের ঝুঁকি বাড়াতে পারে।
বর্তমানে বাংলাদেশে বিশ্বমানের চিকিৎসা সুবিধা পাওয়া যাচ্ছে। রাজধানীর এভারকেয়ার হসপিটাল ঢাকা–তে থাইরয়েড ক্যান্সারের আধুনিক ডায়াগনস্টিক সুবিধা, অভিজ্ঞ এন্ডোক্রাইনোলজিস্ট, সার্জন ও ক্যান্সার বিশেষজ্ঞদের সমন্বিত চিকিৎসা ব্যবস্থা রয়েছে। এখানে আন্তর্জাতিক মানের অস্ত্রোপচার ও ফলো-আপ কেয়ার নিশ্চিত করা হয়, যা রোগীদের দ্রুত সুস্থতায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।
পরিসংখ্যান অনুযায়ী, থাইরয়েড ক্যান্সারের পাঁচ বছরের বেঁচে থাকার হার ৯৮ শতাংশের বেশি। অর্থাৎ সময়মতো চিকিৎসা নিলে এই ক্যান্সার প্রায় সম্পূর্ণ নিরাময়যোগ্য। থাইরয়েড ক্যান্সার মানেই আতঙ্ক নয়। এটি এমন একটি ক্যান্সার, যা আধুনিক চিকিৎসা ও সচেতনতার মাধ্যমে সফলভাবে নিয়ন্ত্রণ করা যায়। সময়মতো রোগ শনাক্ত ও সঠিক চিকিৎসাই পারে একটি সুস্থ জীবনের নিশ্চয়তা দিতে।
লেখক :
ডা. বিশ্বজিৎ ভট্টাচার্য সিনিয়র কনসালট্যান্ট, ক্লিনিক্যাল ও রেডিয়েশন অনকোলজি কো-অর্ডিনেটর–রেডিয়েশন অনকোলজি এভারকেয়ার হসপিটাল, ঢাকা।
মন্তব্য করুন