
ষড়ঋতুর রূপসী বাংলাদেশ চিরকালই রঙ-রূপ ও বৈচিত্র্যের জন্য অনন্য। ঋতু পরিবর্তনের আবর্তে এদেশের প্রকৃতি একেক সময় একেক রূপে নিজেকে মেলে ধরে। আর এই চেনা প্রকৃতির এক চিরসবুজ, স্নিগ্ধ ও নস্টালজিক অনুষঙ্গের নাম ‘বকুল’। কবি-সাহিত্যিকদের কলমে, কিংবা বিরহী গানের সুরে বকুল বারবার ফিরে এসেছে তীব্র আকুলতা নিয়ে। ‘কার লাগিয়া গাথো রে সখি বকুল ফুলের মালা’ কিংবা মেঠো সুরের ‘বকুল ফুল, বকুল ফুল সোনা দিয়া হাত কেন বান্ধাইলি...’ যুগ যুগ ধরে বাঙালির হৃদয়ে দোলা দিয়ে আসছে এসব গান। বকুল কেবল একটি ফুল নয়, এটি যেন এক টুকরো খাঁটি বাঙালি আবেগ, যা মিশে আছে আমাদের যাপিত জীবন ও সংস্কৃতির সাথে।
এক সময় গ্রামীণ জনপদে কিংবা শহুরে সংস্কৃতির অলিতে-গলিতেও বকুল ফুলের মালার বেশ কদর ছিল। বকুল ফুলের মালা গেঁথে গ্রামীণ হাট-বাজারে কিংবা শহরের ব্যস্ত মোড়ে বিক্রির দৃশ্য চোখে পড়তো। তরুণীদের খোঁপায় কিংবা গলায় সেই মালার সুবাস ছড়াতো এক মায়াবী আবেশ। ছেলেরাও বেসলেট পরার মতো তরে হাতে জড়িয়ে রাখতো। কালের বিবর্তন, যান্ত্রিকতার আস্রাসন আর কংক্রিটের আধুনিকতায় সেই দৃশ্য আজ প্রায় বিলুপ্ত। ফলে নতুন প্রজন্মের কাছে এই ফুল ও এর সঙ্গে জড়িয়ে থাকা আবেগও ধীরে ধীরে অপরিচিত হয়ে উঠছে।
প্রকৃতির নিয়ম মেনে আজও দুপুর গড়িয়ে বিকেল হলেই বকুল গাছে কুঁড়ি মেলতে শুরু করে। সারারাত ধরে সেই কুড়ি প্রস্ফুটিত হয় অর্থাৎ ফুল ফোটে। আর ভোরের আলো ফুটতেই টুপটাপ ঝরে পড়তে থাকে বকুল ফুলঅ ভোরের স্নিগ্ধ বাতাসে বকুলতলার সেই মোহনীয় মিষ্টি ঘ্রাণ ছড়িয়ে যায় দূর-দূরান্তে। অতীতে গ্রামীণ জীবনে ভোরবেলা দলবেঁধে বকুলতলায় ফুল কুড়ানোর এক উৎসবমুখর প্রতিযোগিতা চলতো। পাড়ার দূরন্ত শিশুরা ঘুম থেকে উঠেই আঁচল বা ঘটি-বাটি নিয়ে ছুটতো বকুলতলার পানে। কে কার আগে কত ফুল কুড়াতে পারে, তা নিয়ে চলতো মধুর লড়াই। অথচ আজকের মুঠোফোন আর যান্ত্রিক শৈশবের ভিড়ে সেই অনাবিল আনন্দের দৃশ্য যেন মহাকালের গর্ভে হারিয়ে যেতে বসেছে।
তবে আধুনিকতার এই করাল গ্রাসেও গ্রামীণ জনপদে কোথাও কোথাও এখননো বেঁচে আছে সেই চিরায়ত-শাশ্বত বাংলার রূপ। শুক্রবার (২২ মে) ভোরে মাগুরার মহম্মদপুর উপজেলার ধোয়াইল গ্রামে দেখা মেলে তেমনই এক নস্টালজিক ও চোখ জুড়ানো দৃশ্যের। ওই গ্রামের মো. ইউসুফ আলী সরদারের দুই মেয়ে, নয় বছরের ফারহানা রাফসা এবং পাঁচ বছরের ফারজানা রাইসা এই যান্ত্রিক যুগেও প্রকৃতির সাথে গড়ে তুলেছে এক নিবিড় মিতালী।
সরেজমিনে দেখা যায়, ভোরের নরম আলো ফুটতেই দুই বোন পরম মায়ায় তাদের বাড়ির পাশেই রাস্তার ধারে বকুলতলা থেকে ঝরে পড়া ফুলগুলো পরম যতনে কুড়িয়ে তুলছে। লাল রঙের একটি বাটিতে ফুল জমিয়ে, পরম আয়েশে আম গাছের তলায় গোল বেদীতে বসে বড় বোন রাফসা সুঁই-সুতো দিয়ে মালা গাঁথছে তার ছোট বোন রাইসার জন্য। ছোট বোন রাইসাও মুগ্ধ হয়ে অপলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে দেখছে বোনের মালা গাঁথার সেই অপরূপ কারুকাজ। তাদের পরনে ছিল সাদা ডট প্রিন্টের গোলাপি রঙের ফ্রক এবং বড় বোনের মাথায় গোঁজা সাদা ও লাল ফুলের স্তবক। এই দৃশ্যটি কেবল দুই বোনের খেলার ছলে ফুল কুড়ানো আর মালা গাঁথা নয়, এটি যেন হারিয়ে যাওয়া বাঙালি সংস্কৃতির জীবন্ত এক কোলাজ, যা বুক চিরে মনে করিয়ে দেয় আমাদের শেকড়ের কথা। চারপাশের সবুজ প্রকৃতি, ঝরে পড়া বকুল ফুল আর দুই শিশুর নির্মল হাসি মিলিয়ে পুরো পরিবেশ যেন হয়ে উঠেছিল এক জীবন্ত লোকচিত্র।
বাংলার সংস্কৃতি ও আবেগের সঙ্গে বকুলের সম্পর্ক বহু পুরোনো। কবিতা, গান ও লোকজ ঐতিহে-বকুল ফুল বার বার ফিরে এসেছে ভালোবাসা, স্মৃতি ও মায়ার প্রতীক হয়ে। এক সময় ভোরবেলা বকুল ফুল কুড়ানো ছিল গ্রামীণ শিশুদের নিত্যদিনের আনন্দ। কেউ আঁচলে, কেউ ছোট বাটিতে ফুল জমিয়ে মালা গাঁথতো। সেই মালা শোভা পেত খোঁপায়, হাতে কিংবা গলায়।
বকুল শুধু সুবাসিত ফুলই নয়, এর রয়েছে ওষুধি গুণও। বকুল গাছের ছাল, পাতা ও ফল প্রাচীনকাল থেকেই বিভিন্ন ভেষজ চিকিৎসায় ব্যবহৃত হয়ে আসছে। তবে নগরায়নের ফলে আজ নতুন করে বকুল গাছ রোপণের হার যেমন কমছে, তেমনি পুরনো গাছগুলোও হারিয়ে যাচ্ছে।
ধোয়াইল গ্রামের এই দুই শিশুর বকুল কুড়ানো ও মালা গাঁথার দৃশ্য বর্তমান বাস্তবতায় সত্যিই এক অনন্য ও বিরল দৃষ্টান্ত। যান্ত্রিক শৈশবকে পেছনে ফেলে প্রকৃতির এই স্নিগ্ধ সান্নিধ্য আমাদের মনে আশা জাগায়; হয়তো এভাবেই নতুন প্রজন্মের হাত ধরে বেঁচে থাকবে আমাদের আবহমান বাংলার রূপ, রস, গন্ধ আর বকুলতলার সেই মিষ্টি সুবাস।
মন্তব্য করুন