
প্রথম দেখায় গাছটিকে মনে হতে পারে ছোটখাটো কোনো বুনো কলাগাছ। কিন্তু একটু ভালো করে তাকালেই চোখ থমকে যাবে বিস্ময়ে। পাতার সবুজ অরণ্য ভেদ করে নীচের দিকে আলতো করে ঝুলে আছে এক অদ্ভুত সুন্দর ফুল। মনে হবে, যেন রক্ত-মাংসের একঝাঁক রঙিন পাখি মুখ ধরাধরি করে, ডানা গুটিয়ে সারিবদ্ধভাবে বসে আছে। পাখির রঙিন পালকের মতো এর মায়াবী রং, আর রাজকীয় তার শারীরিক গড়ন। মুগ্ধতায় ভরা এই ফুলকে বলা হয় ‘স্বর্গের পাখি’। আর এই রূপের কারণেই বিশ্বজুড়ে এর পরিচিতি ‘বার্ডস অব প্যারাডাইস’ নামে। রঙ, রূপ আর জ্যামিতিক বৈচিত্র্যের এক অনিন্দ্যসুন্দর কোলাজ এই ফুল।
পৃথিবীর বুকে যত দুর্লভ ও চোখ জুড়ানো ফুল রয়েছে, তার মধ্যে শীর্ষ সারির একটি এই ‘বার্ডস অব প্যারাডাইস’। এর আদি নিবাস সুদূর দক্ষিণ আফ্রিকার উত্তাল কেপ প্রদেশে হলেও, সময়ের বিবর্তনে এর রূপের জাদু ছড়িয়ে পড়েছে বিশ্বময়। জলবায়ুর সীমানা পেরিয়ে এই রাজকীয় ফুল এখন বাংলাদেশের মাটিতেও ছড়াচ্ছে তার সৌরভহীন রূপের আভা।
সম্প্রতি মাগুরার মহম্মদপুর উপজেলা সদরে অবস্থিত কাজী সালিমা হক মহিলা ডিগ্রি কলেজের ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ ও ধোয়াইল গ্রামের বাসিন্দা এস এম ইউনুস আলীর বাড়ির আঙিনায় ডানা মেলেছে এই দুর্লভ ফুল। বাংলাদেশে এখনো এই ফুল বিরল। নিজের আঙিনায় এমন স্বর্গের সৌন্দর্য দেখে অভিভূত এস এম ইউনুস আলী জানান, “বছর তিনেক আগে আমার ভাগ্নে মো. শহিদুর রহমান একটি চারা এনে দিয়েছিল। শখ করে বাড়ির আঙিনায় রোপণ করেছিলাম। এবার গাছটিতে অনেক বেশি ফুল ফুটেছে। ফুল যে এতটা দৃষ্টিনন্দন আর জাদুকরী হতে পারে, এটি না দেখলে তা বিশ্বাস করা কঠিন।”
জানাযায়, মে থেকে সেপ্টেম্বর মাস পর্যন্ত এটির ফুল ফোটার মোক্ষম সময়। রোদ-ছায়া দুই পরিবেশেই গাছটি মানিয়ে নিতে পারলেও ঝলমলে রোদে এর প্রস্ফুটন ঘটে সবচেয়ে সুন্দরভাবে। ফুল ফোটার পর প্রায় এক সপ্তাহ ধরে তার সতেজ সৌন্দর্য ধরে রাখে। হলুদ, সোনালী কমলা, গাঢ় নীল, লাল ও শুভ্র সাদার এক অপূর্ব মিশ্রণ দেখা যায় এর পাপড়িতে। শুধু সৌন্দর্যের প্রতীকই নয়, বিশ্বজুড়ে ‘বার্ডস অব প্যারাডাইস’ আভিজাত্য, রাজকীয়তা, স্বাধীনতা, নেতৃত্ব এবং পরম বিশ্বাসের প্রতীক হিসেবে বিবেচিত। এমনকি দক্ষিণ আফ্রিকাসহ বহু সংস্কৃতিতে দম্পতিদের নবম বিবাহবার্ষিকীতে উপহার হিসেবে এই ফুল দেয়ার এক চমৎকার ঐতিহ্য প্রচলিত রয়েছে। এর বর্ণিল ও ত্রিমাত্রিক গঠনের কারণে যুগে যুগে চিত্রশিল্পীদের ক্যানভাসেও এটি অন্যতম অনুপ্রেরণা হয়ে উঠেছে।
শুধু ফুলই নয়, চিরসবুজ এই গোটা গাছটিই যেন এক জীবন্ত ভাস্কর্য। এই গাছ সাধারণত ছয় থেকে ১০ ফুট উচ্চতার একটি হালকা ঝোপালো আকৃতি নেয়। লম্বা ডাঁটার ওপর নীলচে-সবুজ রঙের পাতাগুলো দেখতে হুবহু কলাপাতার মতো। কোনো কোনো জাতের পাতার ঠিক মাঝখান দিয়ে চলে গেছে চমৎকার লালচে রেখা। ল্যান্ডস্কেপিং বা গৃহসজ্জার উপাদান হিসেবে বিশ্বজুড়ে এর কদর আকাশচুম্বী। আমেরিকা ও আফ্রিকার দেশগুলোতে বাড়ির আঙিনা, আলিশান পার্ক, হাইওয়ের আইল্যান্ড কিংবা বহুজাতিক অফিসের লবিতে এই গাছ আভিজাত্যের স্মারক হিসেবে শোভা পায়। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের লস অ্যাঞ্জেলেস শহরের ‘অফিসিয়াল ফুল’ হিসেবেও স্বীকৃতি পেয়েছে এই ‘বার্ডস অব প্যারাডাইস’।
মাগুরার মহম্মদপুরের ধোয়াইল গ্রামের অধিবাসী ভারপ্রাপ্ত এস এম ইউনুস আলীর বাড়ির আঙিনায় ফোটা ফুলটি প্রমাণ করে, যত্ন পেলে বাংলার উর্বর মাটিও ধারণ করতে পারে বিশ্বসেরা অনন্য সব প্রাকৃতিক সৌন্দর্য। মফস্বলের এই সবুজ কোণে ‘বার্ডস অব প্যারাডাইস’-এর প্রস্ফুটন কেবল একটি পরিবারের জন্যই নয়, বরং এলাকার প্রকৃতি প্রেমীদের জন্যও এক পরম পাওয়া।
মন্তব্য করুন