সোমবার
২০ জুলাই ২০২৬, ৫ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সোমবার, ২০ জুলাই ২০২৬, ৫ শ্রাবণ ১৪৩৩

বারোবাজারের প্রাচীন নগরী ও প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শনের অজানা কাহিনি

জাহাঙ্গীর হোসেন, ভ্রাম্যমান প্রতিনিধি
প্রকাশ : ০৮ মে ২০২৬, ০৮:৩৫ এএম
বারোবাজারের প্রাচীন নগরী ও প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন

ঝিনাইদহ জেলার কালীগঞ্জ উপজেলার প্রাচীন কীর্তি ও প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন সমৃদ্ধ স্থান বারোবাজার। কালীগঞ্জ উপজেলা শহর থেকে ১১ কিলোমিটার দক্ষিণে বারোবাজার অবস্থিত। এর উপর দিয়ে চলে গেছে উত্তর-দক্ষিণে ঢাকা-খুলনা মহাসড়ক। জেলা শহর ঝিনাইদহের দূরত্ব ও অবস্থান বারোবাজার থেকে ২৬ কিলোমিটার উত্তরে। এর ১৭ কিলোমিটার দক্ষিণে বাংলাদেশের প্রাচীন জেলা শহর যশোর। যশোর থেকে ঝিনাইদহ পর্যন্ত যে ছোট রেললাইন (জে জে আর) ছিল তার একটা প্রধান রেল স্টেশন ছিল বারোবাজার। বর্তমানে বারোবাজারে রেল স্টেশন আছে।

বারোবাজার এককালের সমৃদ্ধ প্রাচীন নগরী। ভৈরব নদের উত্তরপাড়ে বারোবাজার অবস্থিত। গৌড়, পাটলীপুত্র থেকে পূর্বাঞ্চলে আসতে হলে প্রথম নদীবন্দর বারোবাজার। এককালে ভৈরব নদ দিয়ে সওদাগরেরা আনতো দেশবিদেশ থেকে পণ্যসম্ভার। বারোবজারে সম্প্রতি আবিষ্কৃত মসজিদ থেকে যে সমস্ত কালো পাথরের স্তম্ভ পাওয়া গেছে, সে পাথরের ব্যবহার আমরা বাগেরহাটের খানজাহান আলীর মসজিদে দেখি। সম্ভবত এই পাথর ভৈরব নদ বয়ে নিয়ে আসা। এর সত্যতা মেলে বারোবাজারের দক্ষিণে হাসিলবাগ জাহাজঘাটা প্রত্যক্ষ করলে।

বারোবাজারের প্রাচীন নগরী ও প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন

গৌরবের বারোবাজার কারা প্রতিষ্ঠা করেছিল তা সঠিকভাবে জানা যায় না। এর নামকরণ নিয়েও আছে মতভেদ। এক দলের মতে, সিলেট অঞ্চল থেকে ১২ জন আওলিয়া হযরত বড়খান গাজীর সাথে এসে এখানে আস্তানা গাড়েন। তাদের স্মৃতিতে বারোবাজার নামের উৎপত্তি। অনেকের মতে, খানজাহান আলী (র.)-র সাথে ১১ জন দরবেশ বাগেরহাট পৌঁছানোর আগে সুন্দরবন অঞ্চল ও আশেপাশে ইসলাম প্রচার করেন। তাঁরা এখানে অবস্থান করেন। এঁদের নামানুসারে 'বারোবাজার' নামকরণ করা হয়। কারো মতে ১২টি বাজার দিয়ে প্রসিদ্ধ এ এলাকার নাম বারোবাজার।

তথ্য অনুসন্ধান করে জানা যায়, প্রাচীনকালে এ জনপদের পরিধি ছিল ১০ বর্গমাইল। এ ১০ বর্গমাইল এলাকার মধ্যে গড়ে উঠেছিল খোশালপুর, পিরোজপুর, বাদুরগাছা, সাদেকপুর, এনায়েতপুর, মুরাদগড়, রহমতপুর, মোল্লাডাঙ্গা, বাদোডিহি, দৌলতপুর, সাতগাছি ও বেলাট নামে ১২টি বাজার। এ কারণেই জনপদটির নামকরণ হয় বারোবাজার। কথিতযে বার জন পির আওলিয়ার নামে বাজারগুলোর নামকরণ হয় তারা হযরত বড়খান গাজীর সঙ্গী ছিলেন।

উল্লেখ্য, গ্রামগুলির পরিচিতি ঘটে এ ভাবেই- এনায়েত খাঁ-এর নামে এনায়েতপুর, আবদাল খাঁ-এর নামে আবদালপুর, দৌলত খাঁ-এর নামে দৌলতপুর, শমসের খাঁ-এর নামে শমসেরপুর, মুরাদ খাঁ-এর নামে মুরাদগড়, হৈবত খাঁ-র নামে হৈবতপুর, নিয়াজ মন্দ খাঁ-র নামে নিশ্চিন্তপুর, সৈয়দ খাঁ-র নামে সৈদয়পুর, গনিমত খাঁ-র নামে-গরিনাথপুর, বিলায়েত খাঁ-র নামে বেলাট (বেলাট নগর), শাহবাজ খাঁ-র নামে-শাহবাজপুর ও রহমত খাঁ-র নামে-রহমাতপুর। ইতিহাসের সাক্ষ্য-গ্রামগুলো এখনো বারোবাজার ও পার্শ্ববর্তী যশোর এলাকায় বিদ্যমান। বারোবাজার প্রাচীন হিন্দু ও বৌদ্ধ রাজাদের রাজধানী ছিল।

গ্রীক ইতিহাস প্রথম শতকে যে গঙ্গারিডি বা গাঙ্গেয় রাজ্যের উল্লেখ পাওয়া যায়, তা এ নদীবিধৌত এলাকা। এখানে গঙ্গারিডি নামে এক শক্তিশালী জাতি বাস করতো। এদের রাজধানী ছিল বারোবাজার। বারোবাজারের প্রাচীন নাম গঙ্গারিজিয়া বা গঙ্গারোজিয়া। বারোবাজার একদা সমতট রাজ্যের রাজধানী ছিল। সপ্তম শতকে এখানে বৌদ্ধশাসন প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। উল্লেখ্য যে, বৌদ্ধ ও হিন্দুশাসন আমলেই এ এলাকার বিশেষ উন্নতি হয়েছিল। খানজাহান আলীর আগমনের পূর্বেই গঙ্গারিজিয়া রাজ্যের অস্তিত্ব বিলীন হয়ে গিয়েছিল এবং তিনি যখন বারোবাজার অবস্থান করেন তখন এটা ছিল নামকরা বন্দর।

বারোবাজারের প্রাচীন নগরী ও প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন

খানজাহান আলীর যে সব শিষ্য তার সঙ্গে সে সময়ে ইসলাম প্রচারে অগ্রবর্তী ছিলেন তারা হচ্ছেন গরীব শাহ্, খালাস খাঁ, বাহরাম খাঁ, বোরহান বা বুড়ো খাঁ, পির মেহের খাঁ, পির সুজন শাহ্, চাঁদ খাঁ, বক্তার খাঁ, আলম খাঁ প্রভৃতি। সুলতানী আমলেও বারোবাজার সমৃদ্ধি অর্জন করে। নিঃসন্দেহে বারোবাজারের বিভিন্ন স্থানে একসময় অগণিত জলাশয় ছিল, তাতে ছিল বাঁধানো ঘাট। পালবংশ, সেনবংশ, মোগল, পাঠান, ইংরেজ বহু জাতি বারোবাজারের বুকে এসেছে। কেন ও কীভাবে সে সমৃদ্ধিশালী সৌন্দর্যময় গঙ্গারিজিয়া, বৈরাট নগর বা বারোবাজার আজ স্তূপে পরিণত, সত্যিই ভাবনা জাগায়।

বহু বছর লোকচক্ষুর অন্তরালে বিরাট মাটির ঢিবির নিচে অসংখ্য মসজিদ চাপা পড়েছিল। এর ১০/১২ মাইল এলাকা নিয়ে ইটের ছড়াছড়ি এলাকার অনেকেই এই ইট সংগ্রহ করে নিজেদের ঘরবাড়ি করেছে। বহু পুকুর, দিঘি সম্বন্ধে প্রবাদ, জনশ্রুতি র সৃষ্টি হয়েছে। এলাকায় মাটি খুঁড়তে গিয়ে বা চাষাবাদের সময় বেরিয়ে এসেছে কোন মসজিদের, বা পুকুরের বাঁধানো ঘাটের অংশ।

সর্বপ্রথম প্রত্নতত্ত্ব বিভাগ ১৯৬১ খ্রিষ্টাব্দে একটা জরিপ করে জানায় বহু কীর্তির ধ্বংসাবশেষের অস্তিত্ব এখানে বিদ্যমান। সরকারের প্রত্নতাত্ত্বিক বিভাগ কর্তৃক খননকৃত ও সংস্কারকৃত মসজিদগুলো মানুষের কাছে এখন বিশেষ দর্শনীয় স্থান।

আমাদের ইউটিউব চ্যানেল সাবস্ক্রাইব করুন

মন্তব্য করুন

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

বিশ্ববাজারে তেলের দাম বেড়েছে, ব্যারেলপ্রতি ছাড়াল ৯০ ডলার

গোল্ডেন গ্লাভসের সঙ্গে উনাই সিমনের নতুন ইতিহাস

এমবাপ্পের যে রেকর্ড ভাঙলেন ইয়ামাল

বিশ্ববাজারে ফের কমল স্বর্ণের দাম

খুলনায় বিদ্যালয় ভবন ধসে পাঠদানে অনিশ্চয়তা

স্পেনের কাছে হেরে অশ্রুসিক্ত মেসি কী বললেন

কফি বিক্রি করে পড়াশোনা ও সংসার চালাচ্ছে ফাহিম

কোরআনের আলোকে বিপর্যয়ের কারণ ও শিক্ষা

সতর্ক থাকুন কুম্ভ, স্থির থাকুন কন্যা

মার্কিন সরকারি ডিভাইসে আবারও টিকটক ব্যবহারের অনুমতি

২০ জুলাই: ইতিহাসে এই দিনে কী ঘটেছিল?

উত্তর-পূর্বাঞ্চলে বন্যার আশঙ্কা, বাড়ছে নদীর পানি

আর্জেন্টিনাকে কাঁদিয়ে অতিরিক্ত সময়ের গোলে দ্বিতীয়বার বিশ্বচ্যাম্পিয়ন স্পেন

ইরানে বড় হামলা চালাতে ইসরায়েলে রিফুয়েলিং বিমান পাঠাচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র

নুসরাত ফারিয়ার নতুন ওয়েব ফিল্ম ‘লাপাত্তা’

তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ প্রথমার্ধ! গোলশূন্য বিরতিতে আর্জেন্টিনা ও স্পেন

ইসরায়েলি সংসদে বিক্ষোভের মুখে কক্ষ ছাড়লেন নেতানিয়াহু

মাঝমাঠের তীব্র লড়াইয়ে ম্যাচ এখনো গোলশূন্য

বিশ্বজয়ের চূড়ান্ত লড়াই, স্পেনের আক্রমণের সামনে দেয়াল তুলছে আর্জেন্টিনা

কলা ছাড়াও পটাসিয়াম সমৃদ্ধ যেসব ফল ও সবজি খাবেন

X