
মাগুরার মহম্মদপুরের তপ্ত দুপুরে যখন সূর্য মাথার ওপর অগিদৃষ্টি দেয়, তখন তৃষ্ণার্থ মানুষের কানে বাঁশি নয়, এক চেনা ব্যক্তিকে দেখে স্বস্তি আসে। বাঁশের বাঁকের দুই প্রান্তে ঝোলানো মাটির হাড়ি আর সিলভারের পাত্রের মৃদু ঝনঝনানি জানান দেয়-আসছেন আব্দুস সালাম বিশ্বাস। ৭২ বছর বয়সী এই বৃদ্ধ কেবল ঘোল-মাঠা বিক্রি করেন না, বিক্রি করেন ৬০ বছরের এক মায়াবী ঐতিহ্য।
আব্দুস সালামের যাত্রা শুরু হয়েছিল সেই ১০-১২ বছর বয়সে। তখন বাবা জদন বিশ্বাসের সাথে ঘোল-মাঠা বিক্রি করতেন। একটা সময় বাবার হাত ধরেই তিনি শিখেছিলেন কীভাবে দুধের নিখুঁত মিশ্রণে ঘোল আর মাঠা তৈরি করতে হয়। আজ এক যুগ হলো বাবা গত হয়েছেন, কিন্তু সালাম বিশ্বাস বাপের সেই পেশাকে বুকে আগলে রেখেছেন। জীবনের দীর্ঘ ৬০টি বছর তিনি পার করেছেন দুধের শুভ্রতা আর টক-মিষ্টির রসায়নে।
আব্দুস সালাম জানান, ঘোল-মাঠা তৈরিতে দুধ, লবণ, চিনি, আয়রণমুক্ত টিউবওয়েলের পানি, দই (দধি) বীজ প্রয়োজন হয়। কারণ প্রতিদিনি সন্ধ্যায় দই পাততে হয়। পরদিন ভোরে সেই দই (দধি) দিয়েই তৈরি করতে হয় সুস্বাদু ঘোল-মাঠা।
প্রতিদিন পুর্ব আকাশে যখন সূর্যের লাল আভা ফোটে, সালাম বিশ্বাস তখন ব্যস্ত হয়ে পড়েন ঘোল-মাঠা তৈরিতে। ফজরের নামাজ শেষেই শুরু হয় কর্মযজ্ঞ। উপজেলার ধোয়াইল (পশ্চিমপাড়া) গ্রামের নিজ বাড়িতে ১০-১১ লিটার খাঁটি গরুর দুধ থেকে তৈরি হয় প্রায় ১৪-১৫ লিটার সুস্বাদু ঘোল-মাঠা। এই কাজে সারথী হয়ে তাকে সহযোগিতা করেন তার স্ত্রী জাহানারা বেগম। প্রথমে মাটির তৈরি একটি বড় পাত্রে (কোলায়) দই ঢেলে তার ভেতরে বাশের তৈরি ঘোলমণি (চরকা) ঘুরিয়ে ঘুটে বা ফেটে বের করেন খাটি মাখন। প্রতিদিনি ২০০ থেকে ২৫০ গ্রাম মাখন পান। মাখন বিক্রি করেন এক হাজার ৪০০ টাকা কেজি দরে।
সরেজমিনে গিয়ে দেখাগেছে, ঘোলমণি (চরকা) ঘোরাতে ঘোরাতে এই দম্পত্তি ঘেমে নেয়ে যান। কারণ দেড় থেকে দুই ঘণ্ঠা সময় ধরে চরকা ঘোরাতে হয়। এরপর স্বাদ মতো লবণ-চিনি মিশিয়ে তৈরি করেন ঘোল-মাঠা। এটি তৈরির পর প্রথমে তিনি নিজে খেয়ে দেখেন। এখানেই তার বড় মনুষ্যত্ত্ব প্রকাশ পায়। তার ভাষায় ‘যা খেতে আমার ভালো লাগবে, সেটাই অন্য মানুষদের খাওয়াবো।’
ঘোল-মাঠা তৈরি শেষে গোসল-খাওয়া সেরে সকাল ১০টার মধ্যে তিনি বেরিয়ে পড়েন। বাড়ি থেকে রাস্তায় বেরোতেই শুরু হয়ে যায় ঘোল-মাঠা বিক্রি। রাস্তায় বিক্রি করতে করতে তিন কিলোমিটার পথ হেঁটে মহম্মদপুর বাজারে পৌঁছান। তার মাটির কোলা আর সিলভারের পাত্রের ঘোল-মাঠা মহম্মদপুর বাজারেই শেষ হয়। শুধু মহম্মদপুর বাজারই নয়, প্রতি সোমবার বেথুলিয়া হাটের দিন তিনি সেখানে ঘোল-মাঠা বিক্রি করেন।
বর্তমান দুর্মূল্যের বাজারেও সালাম বিশ্বাস তার লাভের অংকে লোভকে স্থান দেননি। প্রতিদিন ৬০ টাকা দরে ১০ থেকে ১১ লিটার দুধ কেনেন ৬০০ টাকা থেকে ৬৬০ টাকায়। এতে ১৪ থেকে ১৫ লিটার ঘোল-মাঠা তৈরি হয়। প্রতি গ্লাস ঘোল-মাঠা বিক্রি করেন ২০ থেকে ২৫ টাকা দরে। বিক্রি শেষে তার পকেটে লাভের টাকা জমা হয় ৪৫০ থেকে ৫০০ টাকা। এই সামান্য উপার্জনেই তিনি খুঁজে পান অসামান্য সুখ। অন্যের কাছে হাত পাতা নয়, বরং প্রচন্ড গরমে মানুষকে এক গ্লাস ঠান্ডা পানীয় খাইয়ে তৃপ্ত করাতেই তার আনন্দ। স্ত্রী জাহানারা বেগমকে নিয়ে সুখে-শান্তিতে আছেন তিনি। টুনা-টুনির ছোট্ট সংসারে নেই কোনো কলহ-কোলাহল। যেটুকু আছে তার সবটুকুই স্বস্তি, শান্তি আর আনন্দ।
ব্যক্তিগত জীবনে সালাম বিশ্বাস নিঃসস্তান। স্ত্রী জাহানারা বেগমকে নিয়েই তার টুনা-টুনির ছোট্ট সংসার। পৈত্রিক সূত্রে পাওয়া মাত্র তিন শতাংশ ভিটে ছাড়া আর কোনো জমিজমা নেই। নেই কোনো সন্তান, তাই নেই কোনো উত্তরাধিকারের মোহ। নিজের জমিটুকুও লিখে দিয়েছেন আতিয়ারের নামের এক ভাইকে। সেই ভাই-ই তার আপদ-বিপদের ছায়া। এমন সহজ-সরল, নির্লোভ ও নির্মোহ মানুষের কাছ থেকে আমাদের শিক্ষা নেয়া উচিৎ।
আব্দুস সালাম বিশ্বাস এবং তার স্ত্রী জাহানারা বেগম কোনো ধরনের সরকারি সহযোগিতা পান না বলে জানান। কারো নেই একটি বয়স্ক ভাতার কার্ডও। গ্রীস্মকালে ঘোল-মাঠা বিক্রি করে সংসার চালান। অন্য সময়ে মিষ্টি বানিয়ে গ্রামে গ্রামে বিক্রি করে রোজগার করেন।
বিজ্ঞান ও ভেষজ শাস্ত্র যা-ই বলুক না কেন, সালাম বিশ্বাসের অভিজ্ঞতায়-ঘোল মানেই শরীর ঠান্ডা রাখার মহৌষুধ। কোষ্ঠকাঠিন্য বা গরমে হাঁসফাঁস করা শরীরের জন্য এক গ্লাস ঠান্ডা ঘোল-মাঠা যে কতটা উপকারী, তা তিনি দীর্ঘ ৬০ বছর ধরে দেখে আসছেন। মাটির পাত্রে রাখা ঘোল যেন তৃষ্ণার্থ মানুষের কাছে এক আশীর্বাদ।
আব্দুস সালাম বিশ্বাস আধুনিক সমাজের জন্য এক উজ্জল দৃষ্টান্ত। তিনি প্রমাণ করেছেন, পেশা ছোট হতে পারে কিন্তু মানুষের আত্মমর্যাদা হতে পারে পাহাড়সম। তপ্ত রোদে ঘেমে নেয়ে একাকার হয়েও তার মুখে থাকে এক প্রশান্তির হাসি। তিনি বলেন, “যতদিন শরীরে কুলায়, ততদিন এই কাজ করেই খাবো। হালাল উপার্জনে, আল্লাহর রহমতে খুব ভালো আছি।”
প্রতিবেশি ইউসুফ সরদার বলেন, ‘আব্দুস সালাম বিশ্বাস অত্যন্ত সহজ, সরল, সৎ, ধার্মিক ও পরিশ্রমি মানুষ। এই বৃদ্ধ বয়সেও তিনি উপার্জন করে সংসা চালান।’
মন্তব্য করুন