
যশোরের কেশবপুর উপজেলার বায়সা-শ্রীরামপুর সড়ক দিয়ে হাঁটলে চোখে পড়ে সারি সারি তালগাছ। দিগন্তজোড়া সবুজ মাঠের মাঝখানে দাঁড়িয়ে থাকা এই তালগাছগুলো শুধু প্রকৃতির সৌন্দর্য বাড়ায় না, বহন করে এক মানুষের অদম্য সংগ্রামের গল্প—তিনি ৬৫ বছর বয়সী সাখাওয়াত হোসেন।
মাত্র ১২ বছর বয়সে দারিদ্র্যের তাড়নায় গাছে ওঠার পেশায় নামেন সাখাওয়াত। কোনো প্রশিক্ষক বা ওস্তাদ ছাড়াই নিজের অভিজ্ঞতা আর চেষ্টায় আয়ত্ত করেন তালগাছে ওঠার কৌশল। বছরের পর বছর চর্চায় হয়ে ওঠেন দক্ষ গাছি। এখনো বয়সের ভার উপেক্ষা করে প্রতিদিন নিয়ম করে ১২টি তালগাছে ওঠেন তিনি।
প্রতিদিন ভোর, দুপুর ও বিকেল—এই তিন সময়ে গাছে উঠে তিনি প্রায় ২৫ ভাড় তালের রস সংগ্রহ করেন। রসের স্বাদ ও মান অটুট রাখতে নিজস্ব কিছু কৌশলও ব্যবহার করেন। সাখাওয়াত বলেন, “ছোটবেলা থেকে নিজেই শিখেছি। এখন এই রসই আমাদের পরিবারের ভরসা।”
তার ৯ সদস্যের পরিবারের একমাত্র আয়ের উৎস এই তালের রস। গাছের নিচেই বসে তার ছেলে ফজর আলী ও নাতি ইসরাফিল প্রতিগ্লাস রস মাত্র ১০ টাকায় বিক্রি করেন। বিশুদ্ধ ও টাটকা রসের স্বাদ নিতে আশপাশের গ্রাম ছাড়াও দূর-দূরান্ত থেকে ক্রেতারা ভিড় জমান সড়কের ধারে।
গ্রামবাংলার ঐতিহ্যবাহী পেশাগুলো যেখানে দিন দিন হারিয়ে যাচ্ছে, সেখানে সাখাওয়াত হোসেন এখনও নিষ্ঠা আর ভালোবাসা দিয়ে ধরে রেখেছেন সেই ঐতিহ্য। স্থানীয়দের কাছে তিনি শুধু একজন গাছি নন, বরং সবার প্রিয় ‘সাখাওয়াত দাদু’।
উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা আব্দুল্লাহ আল মামুন বলেন, “সাখাওয়াতের মতো অভিজ্ঞ গাছিরা আমাদের লোকজ ঐতিহ্যকে বাঁচিয়ে রেখেছেন। ৫২ বছর ধরে তার এই নিষ্ঠা সত্যিই প্রশংসনীয়।”
তিনি আরও জানান, তালগাছ পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা, মাটির গুণাগুণ উন্নয়ন এবং বজ্রপাত প্রতিরোধে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। কেশবপুর অঞ্চলের মাটির গুণেই এখানকার তালের রস বিশেষভাবে সুস্বাদু ও পুষ্টিকর। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর নিয়মিত তালগাছ রোপণে কৃষকদের উৎসাহিত করছে বলেও জানান তিনি।
সাখাওয়াত হোসেনের জীবনের গল্প শুধু একজন শ্রমজীবী মানুষের সংগ্রাম নয়; এটি গ্রামীণ অর্থনীতি, ঐতিহ্য এবং প্রকৃতির সঙ্গে মানুষের গভীর সম্পর্কের এক অনন্য উদাহরণ। তালগাছের চূড়ায় উঠে প্রতিদিন যে রস তিনি সংগ্রহ করেন, তা যেন তার জীবনেরই প্রতিচ্ছবি—কষ্টে অর্জিত, তবুও মধুর ও জীবন্ত।
মন্তব্য করুন