মঙ্গলবার
০৯ জুন ২০২৬, ২৬ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
মঙ্গলবার, ০৯ জুন ২০২৬, ২৬ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩

রবীন্দ্রনাথের আত্মভাবনায় বৈশাখ

অরুন কুমার শীল
প্রকাশ : ১৯ এপ্রিল ২০২৬, ০৮:৫০ এএম
রবীন্দ্রনাথের আত্মভাবনায় বৈশাখ

যা কিছু পুরনো, সে সব বিদায় দিয়ে বৈশাখ সাড়ম্বরে বরণ করে নতুনকে। প্রচণ্ড ঝড় নিয়ে এসে বৈশাখ বিদায় নেয় ধ্বংসের সহযাত্রী হয়ে। বৈশাখ সবসময় সাহসী, ক্ষ্যাপা, বৈরী, অশান্ত, অসীম, নির্দয় কিন্তু তার সৃজনক্ষমতা শিল্পীর নিপুণ আল্পনাকেও হার মানিয়ে দেয়, তার নবায়নী ধারা প্রকৃতিকে ঋদ্ধ করে অপার ব্যঞ্জনায়। মানুষ তখন ভেবে পায় না তাদের মনে কেন এত নবআনন্দের জোয়ার, কেন এত নতুন লাগে নিজেকে! সাধারণ মানুষের প্রতিনিধি হয়ে বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরও আমাদের মাঝে এলেন এক বৈশাখে, প্রেম, প্রকৃতি আর মানুষের জয়গান সাথে করে, বাংলাকে পূর্ণতা দিতে। ‘বৈশাখে রবীন্দ্রনাথ’ প্রাসঙ্গিক, নাকি ‘রবীন্দ্রনাথের বৈশাখ’ নিয়ে আলোচনা করা প্রাসঙ্গিক তা একজন বাঙালির পক্ষে নির্ণয় করা কঠিন। তারপরও প্রথমে দেখা যাক ‘বৈশাখে রবীন্দ্রনাথ’-এর ভূমিকা নিয়ে। ঋতুবৈচিত্র্যের বাংলায় বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর সব মাসকেই উপস্থাপন করেছেন অনন্য বৈশিষ্ট্যে।

বাংলা সনের প্রথম মাস বৈশাখ সেই বৈচিত্র্যেরই একটা অংশ যা মানুষের মাঝে তিনি উপস্থাপন করেছেন বিশেষ দর্শন বা উদ্দেশ্য সামনে রেখে। বৈশাখ ও বাঙালি সংস্কৃতি অভিন্ন ক্যানভাসে চিত্রিত বাঙালির উৎসব। বাড়ির পাশের শিশির বিন্দু থেকে শুরু করে পৃথিবীর পথে পথে রবীন্দ্রনাথ যত অব্যক্ত ভাব অনুভব করেছেন, তিনি তা-ই নান্দনিক ভাষায় মানুষের সামনে তুলে ধরেছেন। কোনো কিছুই যেন তার দৃষ্টিকে অগ্রাহ্য করেনি।

বাঙালি ঐতিহ্যের প্রাচীনতম ধারাবাহিকতায় বাউল, জারি সারি, কীর্তন আবহমান কাল ধরে বাংলার হাটে-মাঠে-ঘাটে চলে এলেও বাংলা সাহিত্যে রবীন্দ্রনাথের আবির্ভাবের পর ঋতুবৈচিত্র্যের ধারাবাহিকতায় বয়ে আসা বৈশাখ উদযাপন অনেকটা বদলে গেছে। বলা যায়, রবীন্দ্রনাথ বৈশাখে জন্মেছিলেন বলেই হয়তো তার এই মাসটির প্রতি রয়েছে বিশেষ টান; অন্যদিকে ঋতুবৈচিত্র্যের এই বাংলায়, বাঙালির আবহমান কালের প্রথাগত সংস্কৃতি-পুরনোকে পেছনে ফেলে নতুনকে বরণ করার নতুনতর দাবি নিয়ে বৈশাখ আসে বলেই বাংলা সনের প্রথম মাসটি কবির এত প্রিয়। বৈশাখ পালনের বিভিন্ন রকম আনুষ্ঠানিকতা থাকলেও বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর নিজের মতো করে পালনের মাধ্যমে দিনটিকে আরো মহিমান্বিত করেছেন, যার ধারাবাহিকতা আমরা এখনো কণ্ঠ মিলিয়ে স্মরণ করি দৃঢ়তার সঙ্গে।

রবীন্দ্রনাথের আত্মভাবনায় বৈশাখ

১৩৩৩ বঙ্গাব্দের ২০-এ ফাল্গুনে রচিত রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কালজয়ী ‘এসো হে বৈশাখ, এসো এসো...’ গানের মধ্য দিয়ে স্বাগত জানানো হয়েছিল বৈশাখকে। কাহারবা তালের এই গানটি রবীন্দ্রনাথের প্রকৃতিভাবনার নিপুণ এক নির্মাণ। গানটিতে সুর ও বাণীর অপূর্ব মেলবন্ধন থাকায় তা বাঙালিচিত্তকে একসুতোয় গেঁথে রেখেছে। রবীন্দ্রনাথের বৈশাখী গানের ‘মুছে যাক গ্লানি ঘুচে যাক জরা, অগ্নিস্নানে শুচি হোক ধরা’ চরণটি যেন সমস্ত বাঙালির প্রাণের কথা হয়ে ধরা দিয়েছে। কবি চেয়েছেন মৃত, পচা, জরা, ব্যাধি সবই বৈশাখী বাতাসে উড়িয়ে দিতে, চেয়েছেন অগ্নিস্নানে সবকিছু শুচিস্নিগ্ধ করতে। তিনি বৈশাখী ঝড়ের তাণ্ডবে সবকিছু ভাসিয়ে দিয়ে মেতে উঠতে চেয়েছেন নবসৃষ্টির আনন্দে। শুধু একটি গানেই নয়, তিনি ‘কল্পনা’ কাব্যের ‘বৈশাখ’ কবিতায় লিখেছেন, ‘হে ভৈরব, হে রুদ্র বৈশাখ/ ধুলায় ধূসর রুক্ষ উড্ডীন পিঙ্গল জটাজাল/ তপ্তঃক্লিষ্ট তপ্ত তনু, মুখে তুলি বিষান ভয়াল/ কারে দাও ডাক-/ হে ভৈরব হে রুদ্র বৈশাখ?’

এবার আসা যাক ‘রবীন্দ্রনাথের বৈশাখ’ প্রসঙ্গে। বলা হয়েছিল, বৈশাখ মাসে যেহেতু রবীন্দ্রনাথের জন্ম (২৫ বৈশাখ ১২৬৮), তাই কবির রয়েছে বৈশাখ মাসটির প্রতি একটু বিশেষ টান। ফলে তিনি অনেক কবিতা ও গানে বৈশাখ মাসকে তুলে ধরেছেন বিভিন্ন আঙ্গিকে। যদিও ১৯৩৬ সাল থেকে বৈশাখের প্রথম দিন থেকেই রবীন্দ্রনাথের জন্মদিন প্রবর্তিত হয়। ফলে বর্ষবরণ কিংবা জন্মদিনবরণ একটি ভিন্নরূপ লাভ করে। রবীন্দ্রনাথই যে শুধু রচনা করে গেছেন তা-ই নয়, রবীন্দ্রনাথকে নিয়েও যে কত গান-কবিতা-ভাষণ রচিত হয়েছে, তার ঠিক নেই। বিশিষ্ট রবীন্দ্র-বঙ্কিম গবেষক অধ্যাপক অমিত্রসূদন ভট্টাচার্য লিখেছিলেন, ‘বাঙালীর গর্বিত সংস্কৃতির ইতিহাসে বেঁচে আছে দু’তিনটি বাংলা তারিখ, ১লা বৈশাখ, ২৫শে বৈশাখ, ২২শে শ্রাবণ, ৭ই পৌষ (শান্তিনিকেতনের ঐতিহ্যপ্রাচীন পৌষমেলা)। এর মধ্যে তিনটিই রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর মহাপুরুষটিকে ঘিরে।’

১৩১৭সালে বোলপুরে বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রদের সংবর্ধনায় কবি প্রথম নিজের জন্মদিনের কথা উল্লেখ করে ভাষণ দিয়েছিলেন। ভাষণে তিনি বলেছিলেন, জন্মদিন সম্বন্ধে এখনো তাঁর কোন গভীর অনুভূতি নেই। "কতো পঁচিশে বৈশাখ চলে গিয়েছে,তারা অন্য তারিখের চেয়ে কিছুমাত্র বড়ো করে আমার কাছে প্রকাশ করেনি।" ৫০তম জন্মদিবসে কবি নিজেকে আলোক প্রভায় প্রকাশ করেছিলেন। তিনি বলেছিলেন, "আজ আমার জন্মদিনে তোমরা যে উৎসব পালন করতো তার মধ্যে যদি সেই কথাটি থাকে, তোমরা যদি আমাকে আপন করে পেয়ে থাকো আজ প্রভাতে সেই পাওয়ার কথা আনন্দকেই যদি তোমাদের প্রকাশ করবার ইচ্ছে হয়ে থাকে তাহলেই এই উৎসব সার্থক। আমার এই পঞ্চাশ বৎসর বয়সেও আমাকে তোমরা নতুন ভাবে পেয়েছ। আমার সঙ্গে তোমাদের সম্বন্ধের মধ্যে জরাজীর্ণতার লেশমাত্র লবণ নেই। তাই আজ সকালে তোমাদের আনন্দ উৎসবের মাঝখানে বসে এই নবজন্মের নবীনতা অনর্থের বাইরে উপলব্ধি করছি।"

কবির ৫৯তম জন্মজয়ন্তী পালন করা হয় শান্তিনিকেতনের আশ্রমে। পঁচিশে বৈশাখের আগের দিন অর্থাৎ ২৪শে বৈশাখ তিনি রচনা করেছিলেন, 'আমার জীর্ণ পাতা যাবার বেলায়।' ১৩২৮সালের পঁচিশে বৈশাখে কবি ছিলেন জেনেভায়। সেখানে বাংলার শ্যামল প্রকৃতি ও মাটির আকর্ষণে কবি ব্যাকুল হয়েছিলেন। তিনিএণ্ড্রন্নজকে লিখেছিলেন, "আজিকার দিন যথার্থভাবে আমার জন্য নহে। যাহারা আমাকে ভালবাসে তাদেরই জন্য আনন্দের দিন। তোমাদের কাছ হইতে দূরে আজিকার এই দিন আমার কাছে পুসত্মিকার তারিখ মাত্র। আজ একটু নিরালা থাকিতে ইচ্ছা করিতেছি কিন্ত তাহা হইবার নাই।"এ দিন জার্মান জাতির পক্ষ থেকে কবিকে সংবর্ধনা জানানো হয়।"কবির জন্যটমাসম্যান, অরকন, কাউন্ট কেইসার লিগ প্রমুখকে নিয়ে গঠিত হয় সংবর্ধনা কমিটি। কবিকে উপহার দেয়া হয় জার্মান ভাষার সর্বশ্রেষ্ঠ গ্রন্থসমূহ। ১৩২১ সনে কবির ৬২তম জন্মজয়ন্তী পালন করা হয় শান্তি নিকেতনে। কবি তখন শান্তিনিকেতনের ছায়ায়গ্রীষ্মের দিনগুলোর সঙ্গে গল্পমগ্ন ছিলেন। এই জন্মদিনে কবি উপহার দিয়েছিলেন, 'পঁচিশে বৈশাখ' কবিতা; 'রাত্রি হল ভোর, আজি মোর জন্মের স্মরণ পূর্ণবানী,/ প্রভাতের রৌদ্রে-লেখা লিপিখানি/ হাতে করে আমি, দ্বারে আসি দিল ডাক পঁচিশে বৈশাখ।"

১৩২৩ সনে কবির ৬৪তম জন্মোৎসবে কবি ছিলেন চীনে। সাথে ছিলেন নন্দলাল বসু, এলমাস্ট, ক্ষিতিমোহন সেনপ্রমুখ। অনেকদিন পর কবি চীনের সেই পঁচিশে বৈশাখের স্মরণে লিখেছিলেন, ‘একদা গিয়েছি চীন দেশে--যেখানে বন্ধু পাই সেখানে নবজন্ম ঘটে’। ১৩৩২ এর ২৫শে বৈশাখে বিপুল উদ্দীপনায় কবির ৬৫তম জন্মোৎসব পালন করা হল শান্তিনিকেতনে। এতোদিন যে জন্মদিন শুধু ঘরের মানুষের কাছে ছিল, এবার তা বিশ্বসভার বিষয় হয়ে দাঁড়ায়।

কবি এ-সময় ইন্দিরা দেবীকে একটি চিঠিতে লিখেছিলেন, “এমন একদিন ছিল যখন আমার জন্মদিনের স্বার্থকতা তোদের কাছে ছাড়া আর কোথাও ছিল না। ক্রমে এখন এক সময়ে আমার জীবনের ক্ষেত্র বহু বিস্তীর্ণ হয়ে পড়ল, সেটা যেন আমার জন্মান্তরের মতো। সেই আমার নবজন্মের জন্মদিন এতোদিন চলে এসেছে। যেটাকে আমার জন্মান্তর বললুম, তাকে আমার পরলোকও বলা চলে। অর্থাৎ, যারা পর ছিল তাদের মধ্যেই একদিন আমার অভ্যর্থনা শুরু হয়েছিলো। তোদের লোক থেকে লোকান্তরগতকে তোরা হয়তো সুষ্ঠু করে দেখতে পাসনি। যে ঘাট থেকে জীবনযাত্রা প্রথম শুরু করেছিলাম আমার কাছে মাঝে মাঝে তা ঝাপসা হয়ে আসছিল। কিন্তু এটা হলো মধ্যাহ্ন কালের কথা। এখন অপরাহ্নের মুলতানি সুর হাওয়ায় বেজে উঠেছে”।

কবির ৬৬তম জন্মদিবসও পালন করা হয় শান্তিনিকেতনে। এই জন্মদিনটি দেশি-বিদেশিদের মিলনমেলায় পরিণত হয়। জন্মদিনে কবি উপহার দিলেন, ‘নটীর পূজা’ ও ‘পরিশেষ’ কাব্যের ‘দিনাবসান’ কবিতা – “বাঁশি যখন থামবে ঘরে, নিভবে দীপের শিখা। / এই জন্মের লীলার পরে পড়বে যবনীকা। / সেদিন যেন কবির তরে, ভিড় না জমে সবার ঘরে। / হয়না যেন উচ্চস্বরে শোকের সমারোহ”। এই অনুষ্ঠানে কবি ভাষণ দিয়েছিলেন, ‘জন্মদিন’ নাম দিয়ে তা ‘প্রবাসী’তে জৈষ্ঠ্য-১৩৩৩ সংখ্যা প্রকাশিত হয়। “এই শ্যামল ধরণী, প্রান্তর, অরণ্যের মধ্যে আমার বিধাতা আমাকে অন্তরঙ্গতার অধিকার দিয়েছেন, এর মধ্যে নগ্ন শিশু হয়ে এসেছিলুম।

আজও দৈববীণা অনাহূত সুরে আকাশে বাজে তখন সেদিনকার সেই শিশু জেগে ওঠে, বলতে চায় কিছু, সব কথা বলে উঠতে পারে না। আজ আমার জন্মদিন, সেই কবির জন্মদিন, প্রবীণের না”। ১৩৩৬ সালে জাপানের পথেই হয় কবির জন্মোৎসব। জাহাজের কাপ্তান ও যাত্রীরা কবিকে সংবর্ধনা জানান। ১৩৩৭ সালে কবির ৬৯তম জন্মজয়ন্তী বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এই জন্মদিনে তিনি আত্মপ্রকাশ করেন চিত্রশিল্পী রূপে। প্যারিসের দুই মহিলার উদ্যোগে তাঁর ছবির প্রদর্শনীও হয়। ফ্রান্স থেকেই কবি ইন্দিরা দেবীকে লেখেন, “ধরাতলে যে রবিঠাকুর বিগত শতাব্দীর ২৫শে বৈশাখে অবতীর্ণ হয়েছেন তাঁর কবিত্ব সম্প্রতি আচ্ছন্ন, তিনি এখন চিত্রকর রূপে প্রকাশমান। ... এইবার আমার চৈতালী বর্ষ শেষের ফসল সমুদ্রপারের ঘাটে সংগ্রহ হল”।

১৩৩৮ সনে কবির ৭০ তম জন্মজয়ন্তীতে সমগ্র জাতির পক্ষ থেকে কলকাতায় তাঁকে সংবর্ধনা দেওয়া হয়। সভাপতির ভাষণে শরৎচন্দ্র কবিকে মানবাত্মার কবি হিসেবে অভিহিত করেন। জন্মদিনের ভাষণে কবি বলেন – “একটিমাত্র পরিচয় আমার আছে, যে আর কিছুই নয়, আমি কবিমাত্র। আমার চিত্ত নানা কর্মের উপলক্ষে ক্ষণে ক্ষণে নানা জনের গোচর হয়েছে। তাতে আমার পরিচয়ের সমগ্রতা নেই। আমি তত্ত্বজ্ঞানী, শাস্ত্রজ্ঞানী, গুরু বা নেতা নই – ক’দিন আমি বলেছিলাম, আমি চাইনে হতে নববঙ্গের নবযুগের চালক – সে কথা সত্য বলেছিলাম। ... এই ধুলোমাটি ঘাসের মধ্যে আমি হৃদয় ঢেলে দিয়ে গেলাম বনস্পতি ঔষধির মধ্যে।

যারা মাটির কোলের কাছে আছে, যারা মাটিতে মাটির হাতে মানুষ, যারা মাটিতেই হাঁটিতে আরম্ভ করে, শেষকালে মাটিতেই বিশ্রাম করে, আমি তাদের সকলের বন্ধু, - আমি কবি”। কবি ৭১ তম জন্মদিনে ছিলেন ইরানে। সেখানে তিনি রচনা করেছিলেন, ‘ইরান, তোমার সম্মান মালে / নবগৌরব বহি নিজ ভালে / সার্থক হলো কবির জন্মদিন।‘ ১৩৪২ সালে কবির ৭৪ তম জন্মদিবস পালিত হয়। এ দিবসে পাওয়া যায় তাঁর নতুন উপলব্ধির জীবন ও জগত এবং মানুষ ও বিশ্বপ্রকৃতি। কবি রচনা করলেন ‘২৫শে বৈশাখ চলেছে’। কবিতাটি উতসর্গ করেন কবি অমিয়চন্দ্র চক্রবর্তীকে – “পঁচিশে বৈশাখ চলেছে / জন্মদিনের ধারাকে বহন করে / মৃত্যুদিনের দিকে / সেই চলতি আসনের উপর বসে / কোন কারিগর গাঁথছে মালা / ছোটো ছোটো জন্মমৃত্যুর সীমানায় / নানা রবীন্দ্রনাথের একখানা মালা”।

১৩৪৪ সালে কবির ৭৬ তম জন্মদিবস পালিত হয় আলমোড়ায়। জন্মদিনের তিন দিন আগেই কবি ‘জন্মদিন’ নামে কবিতা রচনা করেছিলেন। ১৩৪৫ সালে কবির ৭৮ তম জন্মজয়ন্তীতে তাঁর কবিতা যুদ্ধবিরোধী চেতনায় মুখরিত হয়েছিল। একদিকে কি অমানুষিক স্পর্ধা, আরেকদিকে কি অমানুষিক কাপুরুষতা! তিনি কালিম্পং থেকে বেতারে পড়ে শোনান সেজুতির ‘জন্মদিন’ কবিতাটি – ‘আজ মম জন্মদিন / জন্মদিন মৃত্যুদিন একাসনে দোহে বসে আছে / দুই আলো মুখোমুখি মিলিছে জীবনপ্রান্তে মম, / ... হে মানুষ, হে ধরণী, / তোমার আশ্রয় ছেড়ে যাবে যবে নিও তুমি গনি’।

কবির ৭৯ তম জন্মোৎসব পালিত হয় পুরীতে। সেখানে সরকারিভাবে তাঁকে সংবর্ধনা দেওয়া হয়। অনুষ্ঠানে কবি ভাষণ দেন, কবিতা পাঠ করেন। তিনি রচনা করেন, ‘নবজাতকের জন্মদিন’ কবিতা – ‘তোমরা যাকে রবীন্দ্রনাথ বলে জানো, সে আমি নই’। ১৩৪৭ সালের ২৫ শে বৈশাখে কবি মংপুতে ছিলেন মৈত্রীদেবীর অতিথি হিসেবে। কবির ৮০ তম জন্মজয়ন্তীতে তিনি লেখেন ‘জন্মদিনে’ কবিতাটি। ‘সেদিন আমার জন্মদিন ... উদয় দিগন্তপানে মেলিলাম আঁখি’।

এই জন্মোৎসব যেমন কবির জীবদ্দশায় সর্বশেষ জন্মোৎসব, তেমনি সভ্যতার সংকটও কবির শেষ অভিভাষণ। পয়লা বৈশাখ শান্তিনিকেতনে জন্মদিনের উৎসবে লেখা। ভাষণের শেষ দিকে কবি বলেছিলেন, “আজ আশা করে আছি পরিত্রাণকর্তার জন্মদিন আসছে আমাদের এই দারিদ্র্যলাঞ্ছিত কুটিরের মধ্যে। ... আশা করবো, মহাপ্রলয়ের পরে বৈরাগ্যের মেঘমুক্ত আকাশে ইতিহাসের একটি নির্মল আত্মপ্রকাশ হয়তো আরম্ভ হবে এই পূর্বাচলের সূর্যোদয়ের দিগন্ত থেকে। আরো একদিন অপরাজিত মানুষ নিজের জয়যাত্রার অভিযানে সকল বাধা অতিক্রম করে অগ্রসর হবে তার মহৎ মর্যাদা ফিরে পাওয়ার পথে। মনুষ্যত্বের অন্তহীন প্রতিকারহীন পরাভবকে চরম বলে বিশ্বাস করাকে আমি অপরাধ মনে করি”।

লেখক: রবীন্দ্র গবেষনায় কর্মরত ও দৈনিক গ্রামের কাগজের সাংবাদিক।

তথ্যসূত্র: বিভিন্ন গবেষণা মূলক পত্রিকা ও আনন্দবাজার পত্রিকার আর্কাইভ। লেখক তুষার প্রসূন, বাংলাদেশ, ডঃ সুবীর মণ্ডল, লোকগবেষক, প্রাবন্ধিক, রম্যরচনা, ফিচার, গল্প ও ছোটগল্প এবং ভ্রমণকাহিনী লেখক পশ্চিম বঙ্গ, ভারত।

আমাদের ইউটিউব চ্যানেল সাবস্ক্রাইব করুন

মন্তব্য করুন

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

উত্তাল বঙ্গোপসাগর, চার সমুদ্রবন্দরে ৩ নম্বর সতর্ক সংকেত

ঘুসের টাকা গুনে নেওয়ার ভিডিও ভাইরাল, বাগমারা থানার পুলিশ পরিদর্শক প্রত্যাহার

মহম্মদপুরে মেয়াদোত্তীর্ণ কীটনাশকে নতুন সিল

রামিসা হত্যা: সোহেল ও স্বপ্না ‘কনডেম সেলে’

কেশবপুরে শরীকানা পুকুরের মাছ লুটের অভিযোগ

রাজশাহীতে বিভাগীয় পর্যায়ে জাতীয় প্রাথমিক শিক্ষা পদক প্রতিযোগিতার উদ্বোধন

পাবনায় হত্যা মামলার আসামিদের বাড়িতে অগ্নিসংযোগ, নিহত ৩

রাজশাহীতে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের বিক্ষোভ মিছিল

বিশ্ববাজারে আবারও বাড়লো স্বর্ণের দাম

ফের বাড়ল তেলের দাম

বিশ্বকাপ ইতিহাসে পেনাল্টি গোলের রেকর্ডে লিওনেল মেসি

দেশে ফিরলেন ৪৫১৫৮ হাজি, মৃত্যু ৪৯

নওগাঁয় শিক্ষার্থীদের সঙ্গে পুলিশ সুপারের সচেতনতামূলক মতবিনিময় সভা

যশোরে স্ত্রী হত্যায় স্বামীর বিরুদ্ধে মামলা, চাকু উদ্ধার

কালীগঞ্জে সর্বত্র মাদকের রমরমা ব্যবসা / হুমকির মুখে যুবসমাজ, আতঙ্কে অভিভাবকরা

২০২৬-২৭ বাজেট: যেসব পণ্যের দাম কমতে পারে

দেশের ১৪ জেলায় ঝড়-বৃষ্টির পূর্বাভাস

নড়াইলে ইয়াবাসহ যুবক গ্রেফতার, ২ মাসের কারাদণ্ড

স্ত্রীকে তালাক দিয়ে শাশুড়িকে বিয়ে!

আদিতমারীতে তুচ্ছ বিরোধের জেরে সংঘর্ষ, কিশোর নিহত

X