
ইটের উপর ইট সাজিয়ে দালান গড়া এবং ইন্টেরিয়রের নিপুণ কাজের মাধ্যমে ঘরের শোভা বাড়ানো তার পেশা। কিন্তু দিনের শুরুটা হয় কাঁটা আর রঙের এক বিচিত্র জগতের সেবা-পরিচর্যায়। যেখানে মরুভূমির রুক্ষতা ও স্নিগ্ধ ফুল মিলেমিশে একাকার। মাগুরার মহম্মদপুর উপজেলার রায়পুর গ্রামের এক শান্ত নিভৃতে এমনই এক ‘গ্রিন ভিউ’ বা ‘নন্দন কানন’ (বাগান) গড়ে তুলেছেন প্রকৌশলী খুরশিদ আলম সোহাগ। পেশায় তিনি দালানকোঠার নকশা কিংবা অবকাঠামো নির্মাণ অথবা ইন্টেরিয়রের কারুকার্যের মাধ্যমে ঘরের শোভাবর্ধণের কাজে ব্যস্ত থাকলেও, তার মনের বিশাল অংশ জুড়ে বাস করে ক্যাকটাস আর অ্যাডেনিয়াম।
২০০৮ সাল। তখন থেকেই এই কণ্টকাকীর্ণ অথচ নয়নাভিরাম উদ্ভিদের প্রতি টান অনুভব করেন খুরশিদ আলম সোহাগ। সেই থেকে শুরু। এরপর গত প্রায় দেড় যুগ ধরে একটু একটু করে, তিল তিল করে গড়ে তুলেছেন স্বপ্নের এই ‘গ্রিন শেড’। বর্তমানে তার বাড়ির আঙিনায় তাঁকালে চোখ জুড়িয়ে যায়। সারি সারি দেশি-বিদেশি ক্যাকটাস এবং থরে থরে সাজানো নজরকাড়া সব অ্যাডেনিয়াম প্লান্ট। এই দীর্ঘ পথযাত্রায় তিনি ঢাকা, গাজীপুর, গোপালগঞ্জ থেকে শুরু করে দিনাজপুর, কুষ্টিয়া, যশোর ও মাগুরার বিভিন্ন প্রান্ত চষে বেড়িয়েছেন বিরল প্রজাতির চারা ও বীজ সংগ্রহের নেশায়। দেড় যুগের প্রচেষ্টা, পরিশ্রম ও সাধনা পূর্ণতা পেয়েছে। তার শেডে বর্তমানে ক্যাকটাস এবং অ্যাডেনিয়াম মিলে ছয় থেকে সাড়ে ছয় হাজার চারার বিশাল সংগ্রহে সমৃদ্ধ।
খুরশিদের বাগানে প্রবেশ করলে দেখা মিলবে মরুভূমির সেই চিরচেনা রূপের আধুনিক সংস্করণ। তার সংগ্রহে থাকা ক্যাকটাসগুলোর মধ্যে রয়েছে-লেমন ক্যাকটাস, ফিসহুক, ফেইরি ক্যাসেল এবং বানি-১ থেকে ৫ পর্যন্ত বিভিন্ন ভ্যারাইটি। এছাড়াও রয়েছে দৃষ্টিনন্দন ভেরিগেটেড জিম্মো এবং অদ্ভুত গড়নের ‘এয়ার প্লান্ট’। প্রতিটি গাছই যেন একেকটি শিল্পকর্ম। কোনোটি জ্যামিতিক নকশায় গড়ে ওঠা স্থাপত্যের মতো, কোনোটি আবার নরম রোঁয়া দিয়ে ঘেরা। শৌখিন মানুষের কাছে এই ক্যাকটাসগুলো এখন গৃহশোভা বর্ধনের প্রথম পছন্দ।
বাগানের মূল আকর্ষণ হলো অ্যাডেনিয়াম বা ‘মরুর গোলাপ’। ক্যাকটাসের কাঁটার ভিড়ে যখন রঙিন ডাবল পেটাল কিংবা সিঙ্গেল পেটাল অ্যাডেনিয়ামগুলো ফুটে ওঠে, তখন পুরো এলাকায় যেন উৎসবের আমেজ ছড়িয়ে পড়ে। খুরশিদের বাগানে জিজি প্লান্টসহ অসংখ্য মিক্সড ভ্যারাইটির চারা রয়েছে। বিশেষ করে বড় বড় কডেক্স বা কান্ডওয়ালা অ্যাডেনিয়ামগুলো দেখতে অনেকটা বনসাইয়ের মতো, যা দেখতে ও সংগ্রহের জন্য দূর-দূরান্ত থেকে মানুষ আসেন। কোনো কোনো গাছে যখন রঙিন ফুল ফোটে, তখন রায়পুর গ্রামের এই বাড়ির আঙিনাটি কোনো বিদেশি নার্সারির চেয়ে কম মনে হয় না।
৩২ বছর বয়সী এই প্রকৌশলী প্রতিদিনের কর্মব্যস্ততায় ডুবে যাওয়ার আগে ভোরের আলো ফোটার সাথেই হাজির হন তার শখের আঙিনায়। প্রকৌশলী খুরশিদ আলম সোহাগের কাছে এই চারাগুলো কেবল উদ্ভিদ নয়, বরং পরিবারের সদস্যের মতো। তিনি বলেন, “আমি প্রতিটি গাছকে চিনে রাখি। কোনটার পানি প্রয়োজন, কোনটার ওষুধ দরকার, কার মাটি-বালি মিশ্রিত ধানের চিটা পরিবর্তন করতে হবে-সবই আমার নখদর্পণে। কাজের চাপে অনেক সময় ক্লান্ত লাগে, কিন্তু ভোরে যখন বাগানে আসি এবং ক্যাকটাসের রঙিন ফুল দেখি, তখন সব ক্লান্তি নিমেষেই দূর হয়ে যায়।”
শুরুটা নিছক মনের খোরাক জোগাতে হলেও এখন তা বাণিজ্যিক রূপ নিতে শুরু করেছে। খুরশিদের এই বিরল সংগ্রহের কথা এখন অনেক এলাকায় ছড়িয়ে পড়েছে। প্রতিদিন তার এই শেড দেখতে লোকজন আসেন। অনেকে বাড়ির ডাইনিং রুম বা বারান্দা সাজানোর জন্য তার কাছ থেকে চারা কিনে নিয়ে যাচ্ছেন। তিনি বলেন, “আমি এখন এর বংশ বিস্তারের মাধ্যমে পরিধি বাড়িয়েছি। বর্তমানে আমার কাছে ছয় থেকে সাড়ে ছয় হাজার চারা আছে। এখন আমি এটি বাণিজ্যিকভাবে বড় করার পরিকল্পনা করছি। শখ যদি কর্মসংস্থান ও আয়ের পথ তৈরি করে, তবে তার চেয়ে আনন্দ আর কিছু নেই।”
প্রকৌশলী খুরশিদ আলম সোহাগের এই উদ্যোগ মহম্মদপুরের তরুণদের জন্য এক নতুন অনুপ্রেরণা হতে পারে। বাড়ির পরিত্যক্ত আঙিনায় যে এত চমৎকার এবং লাভজনক একটি বাগান গড়ে তোলা সম্ভব, তা তিনি প্রমাণ করে দিয়েছেন। তার এই ক্যাকটাস ও অ্যাডেনিয়ামের রাজ্য কেবল শখের বাগিচা নয়, বরং ধৈর্য আর অধ্যবসায়ের এক জীবন্ত দলিল।
প্রকৌশলীর মেধা আর প্রকৃতির এই অপূর্ব মিতালী যেন রায়পুরের মাটিতে নতুন এক শিল্পের জন্ম দিয়েছে। যেখানে কাঁটাও মানুষকে মুগ্ধ করে, আর মরুভূমির ফুল বাংলার স্নিগ্ধতা বয়ে আনে। আধুনিক মানুষের অন্দরসজ্জায় ক্যাকটাস ও অ্যাডেনিয়ামের চাহিদা দিন দিন বাড়ছে। খুরশিদের মতো উদ্যোক্তারা যদি বাণিজ্যিকভাবে সফল হন, তবে এটি দেশের কৃষি অর্থনীতিতে এক নতুন মাত্রা যোগ করবে।
মন্তব্য করুন