
শরৎ, হেমন্ত, শীত, বসন্ত; কোনো ঋতুর পরিবর্তনই এদের জীবনে রং ছড়ায় না। মহম্মদপুর-মাগুরা সড়কের ধোয়াইল এলাকায় তাঁকালে চোখে পড়ে সারিবদ্ধ ১২টি টোংঘর। বাঁশ, প্লাস্টিক আর পলিথিনের ছাউনি দিয়ে বানানো এই অস্থায়ী ঝুপড়ি ঘরগুলোই ৫৩ জন সদস্যের কাছে আস্ত এক পৃথিবী। তারা যাযাবর, তারা বেদে। মুন্সীগঞ্জের লৌহজং উপজেলার হলদিয়া ইউনিয়নের গোয়ালিমান্ডা গ্রাম থেকে আসা এই মানুষগুলোর ঠিকানা এখন রাস্তার ধারের ধুলোবালি।
এক সময় গ্রাম-বাংলার জনপদে ‘সাপুড়ে’ বা ‘বেদে’দের কদর ছিল আকাশচুম্বী। ঝুলি বা ঝাপি থেকে সাপ বের করা, শিঙা লাগানো কিংবা দাঁতের পোকা ফেলার জাদুকরী বিদ্যায় মুগ্ধ হতো সাধারণ মানুষ। কিন্তু আজ সময় বদলেছে। বিজ্ঞান আর আধুনিক শিক্ষার প্রসারে এখন আর কেউ ‘দাঁতের পোকা’র গল্প বিশ্বাস করেন না। ফলে বংশানুক্রমিক এই পেশা এখন বিলুপ্তির পথে।
বহরের সরদার ৪০ বছর বয়সী রমজান মন্ডল মৃদু হেসে বলেন, “বাপ-দাদার পেশা আঁকড়ে ধরে আছি ঠিকই, কিন্তু পেট তো মানে না। আগে গ্রামে গেলে মানুষ সমাদর করত, এখন অনেকে দূর দূর করে তাড়িয়ে দেয়। অভাব এখন আমাদের নিত্যসঙ্গী।” তার কথার প্রতিধ্বনি পাওয়া গেল কামালের কণ্ঠেও। ৫৫ বছর বয়সী কামাল সাপুড়িয়া এখনো সাপের ঝাঁপি বয়ে বেড়ান এক গ্রাম থেকে অন্য গ্রামে। যা আয় হয়, তাতে কোনোদিন উনুন জ্বলে, কোনোদিন জোটে শুধু পানি আর দীর্ঘশ্বাস।
এই বহরে আটজন শিশু রয়েছে, যাদের বয়স ছয় থেকে ১০ বছরের মধ্যে। তাদের চোখে রঙিন হওয়ার স্বপ্ন থাকলেও নেই কোনো রঙিন পাঠ্যবই। তারা স্কুলে যায় না, কারণ তাদের জীবনটা চাকা লাগানো গাড়ির মতো-আজ এখানে তো কাল অন্য জেলায়। তবে শিক্ষার অভাব মেটাতে এই যাযাবর দলেই কাজ করেন সবুজ নামের এক যুবক। মাসে সাত-আট হাজার টাকার বিনিময়ে তিনি এই শিশুদের বর্ণমালার সাথে পরিচয় করিয়ে দেওয়ার আপ্রাণ চেষ্টা করেন। কিন্তু নড়বড়ে তাঁবুর নিচে কি আর টেকসই ভবিষ্যৎ গড়া যায়? এখানকার শিশুদের কাছে বিকেলের খেলার চেয়েও বড় হয়ে দাঁড়ায় দুবেলা খাবারের নিশ্চয়তা।
এই সম্প্রদায়ের নারীদের পরিশ্রম পুরুষদের চেয়ে কোনো অংশে কম নয়। নাজমা বেগম (৪০) দীর্ঘ ২৫ বছর ধরে মানুষের শরীরে শিঙা টেনে আসছেন। তিনি আক্ষেপ করে বলেন, “শিঙা টানতে টানতে অকালে নিজের সব দাঁতগুলো হারিয়েছি, এখন চিবিয়ে খাওয়ার সামর্থটুকুও নেই।” সরদার রমজান মন্ডলের স্ত্রী রাশিদা বেগমও প্রতিদিন মাইলের পর মাইল পায়ে হেঁটে গ্রামে গ্রামে সাহায্যের জন্য ঘোরেন। মানুষের দয়া আর যৎসামান্য সাহায্যেই চলে তাদের সংসার।
যাযাবর হলেও তাদের নিজস্ব সমাজ ব্যবস্থা অত্যন্ত সুশৃঙ্খল। বিয়ের ক্ষেত্রে তারা নিজেদের বহরের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকেন। এখনও কনেকে ৫০ থেকে ৬০ হাজার টাকা দিয়ে বিয়ে করার রেওয়াজ টিকে আছে এই সম্প্রদায়ের মধ্যে। সৌর প্যানেলের মৃদু আলোয় রাতের আঁধার তাড়ানোর চেষ্টা করেন তারা। ঝড় এলে যখন পলিথিনের ছাউনি উড়ে যায়, তখন আকাশের নিচেই জড়োসড়ো হয়ে থাকেন তারা।
এক মাস এখানে থাকার পর তারা পাড়ি জমাবেন ফরিদপুর জেলায়। নড়াইল, যশোর, কুষ্টিয়া, চুয়াডাঙ্গা, রাজবাড়ী ও মাগুরা জেলা ঘুরে বছর শেষে কোরবানির ঈদের সময় তারা ক্ষণিকের জন্য ফেরেন মুন্সীগঞ্জের লৌহজং উপজেলার হলদিয়া ইউনিয়নের গোয়ালিমান্ডা গ্রামের নাড়িপোতা ভিটেয়। সেখানে এক মাস কাটিয়ে আবারো শুরু হয় অজানার উদ্দেশ্যে যাত্রা।
বাংলার লোকজ ঐতিহ্যের অংশ হয়ে থাকা এই মানুষগুলো আজ প্রান্তিকতার শেষ সীমানায়। আধুনিক নাগরিক সুবিধার কোনো ছোঁয়া নেই তাদের জীবনে। সমাজ ও রাষ্ট্রের মূলধারার সাথে তাদের সম্পৃক্ত করার উদ্যোগ না নিলে হয়তো অচিরেই হারিয়ে যাবে এই বর্ণিল যাযাবর সংস্কৃৃতি, আর অন্ধকারের অতলে তলিয়ে যাবে পৈত্রিক ঐহিত্য।
অবহেলিত এই জনগোষ্ঠী কি পাবে কোনোদিন একটু সুস্থ ও উন্নত জীবনের স্বাদ? নাকি এভাবেই পথে পথেই ফুরিয়ে যাবে তাদের যাযাবর জীবনের দিনলিপি? উত্তরটা সময়ের কাছেই তোলা রইল।
মন্তব্য করুন