
আইসল্যান্ডের উত্তর উপকূল থেকে প্রায় ৪০ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত ছোট্ট ও বিচ্ছিন্ন দ্বীপ গ্রিমসে যেন এক ভিন্ন জগত। মাত্র সাড়ে ছয় বর্গকিলোমিটার আয়তনের এই দ্বীপটি মেরুবৃত্তের ওপর অবস্থিত এবং ইউরোপের অন্যতম প্রত্যন্ত ও নির্জন বসবাসযোগ্য অঞ্চল হিসেবে পরিচিত।
গ্রিমসের প্রকৃত শাসক যেন মানুষ নয়, বরং পাখিরা। প্রায় ২০ জন মানুষের বসবাস থাকলেও এখানে বাস করে প্রায় ১০ লাখ পাখি। দ্বীপটি বিভিন্ন প্রজাতির পাখির জন্য বিখ্যাত, যা এটিকে প্রকৃতি ও বন্যপ্রাণী প্রেমীদের জন্য স্বর্গে পরিণত করেছে।
বিশেষ করে বসন্ত ও গ্রীষ্মে এখানে দেখা মেলে আটলান্টিক পাফিন (পাফিন পাখি)-র ঝাঁক। এছাড়াও আর্কটিক টার্ন, রেজরবিল, কমন মুর এবং কালো-পাওয়ালা কিটিওয়াকের মতো পাখিরও দেখা মেলে।
প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে ভরপুর এই দ্বীপের খাড়া পাহাড়, নীরবতা এবং পাখির কলরব পর্যটকদের বারবার টেনে আনে। যারা পাখি দেখতে বা ফটোগ্রাফি করতে ভালোবাসেন, তাদের জন্য গ্রিমসে একটি অন্যতম আকর্ষণীয় গন্তব্য।
দ্বীপটির একমাত্র গ্রাম স্যান্ডভিক, যা ইউরোপের অন্যতম প্রত্যন্ত গ্রাম হিসেবে পরিচিত। এখানেই পর্যটকদের থাকার প্রধান ব্যবস্থা রয়েছে।
দ্বীপটির অবস্থান আইসল্যান্ডের মূল ভূখণ্ড থেকে বেশ দূরে হওয়ায় এখানে যাতায়াতে ভীষণ কষ্টসাধ্য। একসময় গ্রিমসে পৌঁছনো ছিল দুঃসাধ্য কাজ। ১৯৩১ সাল পর্যন্ত একটি ছোট নৌকা সেখানে বছরে মাত্র দু’বার চিঠি সরবরাহ করত। ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম বিবিসি এমনটাই জানিয়েছে। তবে বর্তমানে সেই কষ্ট কিছুটা কমেছে। দ্বীপটিতে নির্মিত হয়েছে বিমানবন্দর। পর্যটকরা আকুরেরি থেকে মাত্র ২০ মিনিটের বিমানযাত্রায় বা ডালভিক থেকে তিন ঘণ্টার লঞ্চ বা জাহা়জে করে এই দ্বীপে পৌঁছাতে পারেন।
আইসল্যান্ডের রাজধানী রিখিয়াভিক ছেড়ে স্থায়ীভাবে গ্রিমসে চলে আসেন ওই ২০ জন। তাদেরই একজন হলেন হাল্লা ইঙ্গলফসডত্তির। তিনি স্থানীয় ট্যুর গাইড। দ্বীপের প্রেমের পড়েই তিনি সারাজীবনের জন্য এখানে থেকে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। তার কথায় প্রকৃতি এখানে নির্মম হলেও প্রতিটি ঋতুই স্বতন্ত্র বৈচিত্র্য বহন করে। গ্রিমসে একটি মাত্র গ্রাম, নাম স্যান্ডভিক। একে ইউরোপের সবচেয়ে প্রত্যন্ত গ্রাম হিসেবে ধরা হয়। এখানে বেড়াতে আসা পর্যটকদের কাছে এটিই একমাত্র আশ্রয়স্থল।
বিচ্ছিন্ন হওয়ার কারণে এই দ্বীপটিতে বিদ্যুৎ সংযোগ নেই। একটিই ডিজেল চালিত জেনারেটর, যা দিয়ে কোনোরকমে বিদ্যুতের চাহিদা মেটে। সংকট মোকাবেলায় স্থানীয়রা জরুরি পরিষেবায় প্রশিক্ষিত। কারণ দুযোর্গে মূল ভূখণ্ড থেকে সাহায্য না আসা পর্যন্ত টিকে থাকাই বড় চ্যালেঞ্জ। উপকূলের রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্বও থাকে স্থানীয় বাসিন্দাদের হাতেই। এই দ্বিপে নেই কোনও হাসপাতাল, ডাক্তার, পুলিশ স্টেশন। প্রতি তিন সপ্তাহ পরপর একজন চিকিৎসক দ্বীপে এসে সবার স্বাস্থ্য পরীক্ষা করে যান।
গ্রিমসেতে একটি ক্যাফে, লাইব্রেরি, সুইমিং পুল ও গির্জা রয়েছে। স্থানীয় স্কুলটি কমিউনিটি সেন্টার হিসেবে ব্যবহার করা হয়ে থাকে। স্থানীয়দের জিনিসপত্রের চাহিদা মেটানোর জন্য রয়েছে একটি মাত্র মুদি দোকান। সেটিও দিনে মাত্র এক ঘণ্টা খোলা থাকে।
মন্তব্য করুন