
ঈদুল ফিতরের আনন্দ আর ২৬ মার্চ মহান স্বাধীনতা দিবসের টানা ছুটি মিলিয়ে আবারও প্রাণ ফিরে পাচ্ছে বিশ্বের বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ বন সুন্দরবন। প্রায় ১০ দিনের ছুটিকে কেন্দ্র করে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে পর্যটকদের আগমনে মুখর হয়ে উঠছে এই প্রাকৃতিক ঐতিহ্য।
বন বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, ঈদের পরদিন থেকেই ভ্রমণপিপাসুরা দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের এই অনন্য বনভূমির সৌন্দর্য উপভোগে ছুটে আসছেন। ফলে পর্যটন সংশ্লিষ্টদের মধ্যেও শুরু হয়েছে ব্যাপক প্রস্তুতি।
খুলনা, বাগেরহাট ও সাতক্ষীরাভিত্তিক ট্যুর অপারেটরদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ইতোমধ্যে ঈদের ছুটিকে ঘিরে অনেক পর্যটকবাহী জাহাজ আগাম বুকিং হয়ে গেছে। পরিবার, বন্ধু-বান্ধব ও করপোরেট গ্রুপ—সব মিলিয়ে ব্যাপক আগ্রহ দেখা যাচ্ছে।
বিশেষ করে ২৬ মার্চ থেকে পরবর্তী তিন দিনের ছুটিতে ভ্রমণের চাপ বেশি বলে জানিয়েছেন ব্যবসায়ীরা। অনেকেই আগে থেকেই বুকিং দিয়ে রাখছেন, যাতে নির্ধারিত সময়ে ভ্রমণে কোনো সমস্যা না হয়।
পর্যটন সংশ্লিষ্টরা জানান, ঈদের আগে থেকেই তাদের প্রস্তুতি শুরু হয়। পর্যটকদের ভ্রমণ ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে জাহাজগুলো নতুনভাবে রং করা, কেবিন সংস্কার, খাবারের মানোন্নয়ন এবং নিরাপত্তা সরঞ্জাম হালনাগাদ করা হয়েছে। অনেক জাহাজে বিনোদনের ব্যবস্থাও বাড়ানো হয়েছে, যাতে ভ্রমণ আরো আনন্দদায়ক হয়।
ট্যুর অপারেটরদের ভাষ্য, ঈদের পর সাধারণত সুন্দরবন ভ্রমণের একটি মৌসুম তৈরি হয়। এবার ২৬ মার্চের ছুটি যুক্ত হওয়ায় সেই আগ্রহ কয়েকগুণ বেড়েছে। অনেকে আগেভাগেই বুকিং দিয়ে রেখেছে, যাতে নির্দিষ্ট তারিখে ভ্রমণে কোনো সমস্যা না হয়।
অন্যদিকে বন বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, পর্যটকদের নিরাপত্তা ও বনজসম্পদ রক্ষায় প্রয়োজনীয় সব ধরনের প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে। নির্ধারিত স্পটগুলোতে পর্যটকদের চলাচল নিয়ন্ত্রণ, গাইড বাধ্যতামূলক করা এবং বন্যপ্রাণী সংরক্ষণে সচেতনতামূলক নির্দেশনা জোরদার করা হয়েছে।
প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে ভরপুর সুন্দরবনের করমজল, হারবারিয়া, কটকা, কচিখালী, হিরণ পয়েন্টসহ বিভিন্ন পর্যটন কেন্দ্রগুলো ইতোমধ্যে পর্যটকদের পদচারণায় সরগরম হয়ে উঠেছে। নদীর বুক চিরে জাহাজের যাত্রা, ম্যানগ্রোভের সবুজ ছায়া, হরিণের দল আর পাখির কোলাহল- সব মিলিয়ে পর্যটকদের জন্য অন্যরকম অভিজ্ঞতা তৈরি করছে।
বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা ও পরিবেশবান্ধব পর্যটন নিশ্চিত করা গেলে এই মৌসুম দেশের পর্যটন খাতে ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে। একই সঙ্গে স্থানীয় অর্থনীতিও চাঙ্গা হবে।
ট্যুর অপারেটর ও দি বেঙ্গল অ্যাডভেঞ্চার নামের লঞ্চের পরিচালক সোহাগ মিনা বলেন, ‘ঈদ পরবর্তী সুন্দরবন যাত্রা স্বাচ্ছন্দে করতে তাদের লঞ্চ নতুন করে সজ্জিত করা হয়েছে। খাবার তালিকায় যুক্ত করা হয়েছে নতুন নতুন পদ। ২৬ থেকে ২৮ মার্চ ভ্রমণের জন্য কয়েকটি গ্রুপ তাদের সঙ্গে কথা বলেছে। এমনিভাবে অন্য ট্যুর অপারেটররাও ঈদ পরবর্তী ভ্রমণের জন্য নিচ্ছেন নানা প্রস্তুতি।’
ট্যুর অপারেটর অব সুন্দরবন (টোয়াস)-এর সাধারণ সম্পাদক এম নাজমুল আযম ডেভিড বলেন, সুন্দরবনের তিন দিনের ভ্রমণের জন্য খুলনায় মোট ৬৩টি নিবন্ধিত জাহাজ রয়েছে, যার ধারণ ক্ষমতা দুই হাজার ৭৫৪ জন। এছাড়া দিনে দিনে ভ্রমণের জন্য খুলনার দাকোপ, কয়রা; বাগেরহাটের মোংলা ও সাতক্ষীরার শ্যামনগরের মুন্সিগঞ্জে রয়েছে অন্তত ৪০০টি ইঞ্জিনচালিত নৌকা বা ট্রলার। ওইসব নৌকা বা ট্রলারও নতুন করে প্রস্তুত করা হয়েছে ঈদের ছুটিকে সামনে রেখে।
একদিন বা তিন দিনের ট্যুরের পাশাপাশি সুন্দরবনসংলগ্ন এলাকায় গড়ে ওঠা ইকোট্যুরিজম স্পট তথা নানা নামের রিসোর্টগুলোতেও রয়েছে ভ্রমণপিপাসুদের জন্য অপরূপ সৌন্দর্য উপভোগ করার সুযোগ। এজন্য ওইসব রিসোর্টও সেজেছে নানা সাজে।
সুন্দরবন রিসোর্ট ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক ও জংগলবাড়ি ম্যানগ্রোভ রিসোর্ট-এর ব্যবস্থাপনা পরিচালক জাকারিয়া হোসাইন শাওন বলেন, ঈদ সামনে রেখে আমরা রিসোর্ট মালিকরা পর্যটকদের সর্বোচ্চ সেবা দিতে কাজ করছি। ইতোমধ্যে অধিকাংশ রিসোর্টের বুকিং সম্পন্ন হয়েছে। আমরা নিরাপত্তা, সেবার মান এবং পরিবেশ সংরক্ষণ- এই তিন বিষয়কে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে পর্যটকদের জন্য একটি সুন্দর ও নিরাপদ ভ্রমণ অভিজ্ঞতা দেওয়ার চেষ্টা করছি।
মন্তব্য করুন