
সকাল গড়াতেই উঠানে মেলে দেওয়া হয় কাঁচা বাঁশ। ধারালো দা দিয়ে চেঁছে চেঁছে সরু ফালি বানানো, রোদে শুকানো, তারপর নিপুণ হাতে বুনন এভাবেই তৈরি হয় চালুনি, ডালি, কুলা। একসময় এসব ছাড়া গ্রামবাংলার সংসার কল্পনাই করা যেত না। কিন্তু এখন সেই উঠানেই যেন নেমে এসেছে নিস্তব্ধতা।
নীলফামারী সদর উপজেলার টুপামারী ইউনিয়নের রামগঞ্জ গ্রামের সহদেব রায় প্রায় ২৫ বছর ধরে বাঁশের কাজ করছেন। বাবা-দাদার পেশা ধরে রাখাই যেন তার কাছে দায়বদ্ধতা। উঠানে বসে চালুনি বানাতে বানাতে তিনি থেমে বলেন, আগে হাটে নিলেই বিক্রি হইত। এখন দোকানে দোকানে প্লাস্টিক। আমরা বসে থাকি, মাল পড়ে থাকে। বিক্রি হয় না, যদিও হয় খুবই কম।
কথার ফাঁকে হাত থামে না তার। কিন্তু চোখেমুখে হতাশার ছাপ স্পষ্ট। একসময় যে পেশায় সংসার ভালোই চলত, এখন সেই পেশাই টিকিয়ে রাখাই দায়।
গ্রামের হাটে এখন সারি সারি প্লাস্টিকের ডালা, ঝুড়ি, চালুনি। দাম কম, রঙবেরেঙর এসব পণ্যের প্রতি ক্রেতার পছন্দ বেশি। ফলে বাঁশের তৈরি পণ্যের চাহিদা কমে গেছে।
ডোমার উপজেলার বড়রাউতা গ্রামের দেবীরডাঙ্গা এলাকায় এখনো কয়েকটি পরিবার আঁকড়ে ধরে আছে এই ঐতিহ্য। বাড়ির উঠানে বসে পুরুষেরা বাঁশ চাঁছেন, নারীরা তৈরি করেন বিভিন্ন ধরনের পণ্য। স্কুল থেকে ফিরে শিশুরাও কখনো কখনো সাহায্য করে এ কাজে।
কারিগর হরিদাশ দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলেন, এই কামই হামার পরিচয়। কিন্তু লাভ নাই, একটা বাঁশ থেইকা ১০-১২টা ডালি হয়, কিন্তু সব খরচ বাদ দিলে প্রতি ডালি থেকে হাতে থাকে ১০-২০ টাকা। এই দিয়া কি সংসার চলে?
কারিগরদের বড় দুঃখ তাদের ব্যবহারের সব ধরনের কাঁচামালের দাম নিয়ে। আগে যে বাঁশ ৫০-৭০ টাকায় মিলত, এখন কিনতে হয় ২০০-২৫০ টাকায়। কিন্তু বাজারে পণ্যের দাম তেমন বাড়েনি। ফলে লাভের অঙ্ক ক্রমেই কমে যাচ্ছে।
অনেকেরই চাষের জমি নেই। বসতভিটাই শেষ সম্বল। দিনভর পরিশ্রম করেও আয় অনিশ্চিত। তাই নতুন প্রজন্ম এই পেশায় আগ্রহ হারাচ্ছে। কেউ শহরে দিনমজুর, কেউ অন্য কাজে ঝুঁকছে।
বাঁশ শিল্পকে টিকিয়ে রাখতে কাজ করছে বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প করপোরেশন (বিসিক) তাদের পক্ষ থেকেও ক্ষুদ্রঋণ সুবিধা দেওয়া হচ্ছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা। তাবে কারিগরদের দাবি ঋণ দিলে ঋণ শোধ করতে হয়। আগে বাজার চাই, দাম চাই।
বাঁশ কুটিরশিল্প কেবল আয়ের উৎস নয় এটি গ্রামবাংলার সংস্কৃতি, পরিবেশবান্ধব জীবনযাপন আর প্রজন্মের স্মৃতির অংশ। প্লাস্টিকের সহজলভ্যতায় হয়ত সুবিধা আছে, কিন্তু তার আড়ালে হারিয়ে যাচ্ছে শতবর্ষের দক্ষতা ও ঐতিহ্য।
কারিগর সহদেব রায়ের কথায় যেন সব কারিগরের মনের কথায় ফুটে উঠেছে, আমরা চাই, এই কামটা বাঁচুক। ছাওয়াগুলা যেন লজ্জা না পায় কইতে আমার বাপ বাঁশের কারিগর।
সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা, কাঁচামালের দাম নিয়ন্ত্রণ, আধুনিক ডিজাইন প্রশিক্ষণ ও বাজার সম্প্রসারণ ছাড়া এই শিল্প টিকিয়ে রাখা কঠিন এমনটাই মনে করেন সংশ্লিষ্টরা।
মন্তব্য করুন