
অগ্রহায়ণের কুয়াশাচ্ছন্ন সকাল আর শেষ বিকেলে থেকেই হিমেল হাওয়ার পরশ। দিনের বেলায় খানিকটা উষ্ণতা দেখা দিলেও পুরোপুরি শীত জেঁকে বসতে এখনো কিছুদিন বাকি। চলছে নবান্ন। গ্রামীণ জনপদের ঘরে ঘরে নতুন ধান। তা থেকে চলছে চালের গুড়া সংগ্রহ ও পিঠাপুলি তৈরির আয়োজন। পিঠা তৈরির কর্মযজ্ঞে পিছিয়ে নেই শহরও, তবে ব্যস্ত নগরীতে সে চিত্রটি ভিন্ন। পিঠা তৈরির ফুরসত না পেলেও নগরবাসী পিঠার স্বাদ নিতে ভোলেন না। যশোর শহরের ব্যস্ত সড়ক ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের পাশে, অফিস আদালত, পাড়া মহল্লাসহ বিভিন্ন প্রান্তে পিঠার দোকানগুলোতে ব্যস্ত সময় পার করছেন কারিগরররা। ইট, কাঠ, কংক্রিটের ব্যস্ত এ নগরীতেও চলছে পিঠা খাওয়ার ধুম।
গোটা যশোর শহর ও শহরতলীর ব্যস্ত সড়কের পাশে, পাড়া মহল্লা, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, কিংবা অফিস আদালতের পাশে, বিভিন্ন স্থানের পিঠার দোকানে কারিগররা ব্যস্ত সময় পার করছেন। সারা বছর দেশী-বিদেশী খাবারের হোটেল রেস্টুরেন্টে ঢু মারলেও শীতের মৌসুমে নগরবাসী পিঠার কথা ভোলেন না। বিভিন্ন পিঠার দোকানে তৈরি হচ্ছে ভাপা, চিতই, পাটিসাপটা, কুলি, পাকান, ছিটে রুটি আর তার সাথে হাঁস, মুরগি, কবুতর, কোয়েল পাখির মতো নানান পদের মাংস। চিতই পিঠা ও ছিটা রুটির সাথে আরও দেয়া হচ্ছে ধনিয়া পাতা, শুটকি, মরিচ, রসুন, পেঁয়াজ ও সরিষার তেলের সমন্বয়ে নানান ধরনের চাটনি। বিভিন্ন ধরনের পিঠার দাম শুরু হয়েছে সর্বনিম্ন ৫টাকা থেকে সর্বোচ্চ ১৬০টাকা মধ্য।
দুপুর থেকেই শুরু হচ্ছে পিঠা তৈরির আয়োজন। চালের গুড়া, গুড়, নারকেলসহ প্রয়োজনীয় অনুষঙ্গ নিয়ে পিঠার কারিগররা ব্যস্ত সময় পার করছেন পিঠা বানাতে। ক্রেতারা দোকানে বসে কেউ কেউ পিঠার স্বাদ নিচ্ছেন তো আবার কেউবা পার্সেল নিচ্ছেন পরিবার ও প্রিয়জনদের জন্য। শহরের দড়াটানা, রেল রোড, প্যারিস রোড, টাউন হল, বড় বাজার, চিত্রার মোড়, লালদীঘিসহ বিভিন্ন স্থান ও পাড়া-মহল্লার দোকানে দুপুরের পর থেকেই পিঠা বানানোর কাজ শুরু হয়ে চলছে রাত ১০টা বা ১১টা পর্যন্ত।
পিঠা তৈরির এ আয়োজন দেখা যাচ্ছে শহরের বিভিন্ন সুপারশপেও। এসকল সুপারশপের প্রবেশ পথের পাশে বসে পিঠা বানাচ্ছেন কারিগররা। সেখানেও দেখা যাচ্ছে ভোজন রসিকদের ভীড়। এছাড়াও আজকাল পিঠার বেচাকেনা চলছে অনলাইনেও। নাগরিক জীবনে পিঠা বানানোর ফুরসত না পেলেও শহরবাসী পিঠা খাওয়ার নানান মাধ্যম ঠিকই খুঁজে নিচ্ছেন। পিছিয়ে নেই পিঠা বানানো ও খাওয়া। অনেক পিঠার দোকানে আবার বিয়ে, জন্মদিনসহ বিভিন্ন সামাজিক অনুষ্ঠানের জন্য পিঠার অর্ডারও নেয়া হচ্ছে। বিক্রিও ভালো বলে জানিয়েছেন শহরের বিভিন্ন প্রান্তের পিঠা বিক্রেতারা।
একুশ বছর ধরে যশোর শহরের কদমতলা এলাকায় পিঠা’র ব্যবসা করছেন বৃদ্ধা জহুরুন নেছা। তিনি বলেন, বয়স হয়েছে তাই এখন আমি ছাড়াও ছেলে ও চার কর্মচারী মিলে দোকান সামলাই। ঘরে বসে থাকতে ভালোলাগে না, তাই মানুষকে পিঠা বানিয়ে খাওয়াই। জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত পিঠা বানাতে চাই। স্বামীর মৃত্যুর পরে সংসারের হাল ধরেছেন গৃহিনী থেকে পিঠার কারিগর হওয়া ফাতেমা বেগম। দড়াটানার এ পিঠার দোকানী বলেন, দুপুর আড়াইটার মধ্য এখানে চলে আসি, রাত ১১টা পর্যন্ত দোকান খোলা রাখতে হয়। প্রতিদিন শত শত মানুষ আসেন। আল্লাহর অশেষ রহমতে সংসার এখন ভালো চলে। প্যারিস রোডের পিঠা বিক্রেতা সালমা খাতুন বলেন, বিকেল চারটায় আসি, রাত দশটা পর্যন্ত থাকি। এখানে (প্যারিস রোড) দেশি বিদেশী অনেক ধরনের খাবারের দোকান থাকলেও আমার দোকানে প্রচুর ভীড় হয়। এক মুহূর্তও বসে থাকার উপায় নেই। মোল্লাপাড়া’র পিঠা ঘর শোরুমের বিক্রেতা সালমা খাতুন বলেন, মূল ধারার পিঠা ছাড়াও আমার কাছে ছিটা রুটি, মাংস ও নানান ধরনের চাটনি পাওয়া যায়। মানুষ যতই আধুনিক হোক বা যতই ব্যস্ততা থাকুক, পিঠার স্বাদ নিতে কিন্তু ভোলেন না।
শিক্ষার্থী আঁখি খাতুন বলেন, দেশি বিদেশী যে খাবারই খাই না কেন, পিঠার সাথে কোন কিছুর তুলনা চলে না। গৃহিনী হাজেরা বেগম বলেন, পিঠা বানানোর অবসর না পেলেও পিঠার স্বাদ ও এর সাথে ছেলে মেয়েদের পরিচিত করার জন্য মাঝে মধ্য শহরের বিভিন্ন প্রান্তে বের হই। চাকুরিজীবী সাইফুল ইসলাম বলেন, বাইরে থাকলে প্রায়ই পিঠা খাই আবার পরিবারের জন্যও নিয়ে যাই। পরিবারের সবাই পিঠা খুব পছন্দ করে।
মন্তব্য করুন