মঙ্গলবার
৩০ জুন ২০২৬, ১৬ আষাঢ় ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
মঙ্গলবার, ৩০ জুন ২০২৬, ১৬ আষাঢ় ১৪৩৩
যশোর জেনারেল হাসপাতাল কেন্দ্রিক প্রতারক সিন্ডিকেট

জীবন নিয়ে ভয়ঙ্কর খেলা!

দেওয়ান মোর্শেদ আলম ও আশিকুর রহমান শিমুল
প্রকাশ : ০৮ এপ্রিল ২০২৬, ১২:৫০ এএম
আপডেট : ০৮ এপ্রিল ২০২৬, ০১:১১ এএম
ছবি-গ্রামের কাগজ

রীতিমত মানুষের জীবন নিয়ে খেলা করছে যশোর জেনারেল হাসপাতাল কেন্দ্রিক গড়ে ওঠা সংঘবদ্ধ একটি প্রতরক চক্র। পরীক্ষা-নিরীক্ষা ছাড়াই রোগীদের হাতে ভুয়া রিপোর্ট ধরিয়ে দিয়ে ভয়ংকর সব প্রতারণায় লিপ্ত হয়েছে। অনেকটা হাসপাতালের নিয়মিত স্টাফের মতই কথিত সেচ্ছাসেবক ও চিহ্নিত দালালেরা দিনের পর দিন এই অপকর্ম করে চলেছে যশোরে জেলার সর্ববৃহৎ এই সরকারি হাসপাতালে।

  • পরীক্ষা-নিরীক্ষা ছাড়াই দিচ্ছে ভুয়া রিপোর্ট
  • কতিপয় সেচ্ছাসেবক ও দালালেরা জড়িত
  • কুইন্স হসপিটালের প্যাড ও লোগো ব্যবহার
  • দ্রুত তদন্ত কমিটি গঠন করবে কর্তৃপক্ষ

ভুয়া রিপোর্টের কারণে প্রতিনিয়ত প্রতারিত হচ্ছেন মানুষ। আবার মৃত্যুর মুখেও পতিত হচ্ছেন রোগী। সম্প্রতি প্রতারক চক্রে মনগড়া ভুয়া মেডিকেল রিপোর্টের কারণে এক রোগীর মৃত্যুও ঘটেছে। অবস্থা এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে, শহরের বেসরকারি কুইন্স হাসপাতালের নাম ব্যবহার করেও জাল রিপোর্ট তৈরি করা হচ্ছে। শুধু নামই নয়, ওই হাসপাতালের প্যাড, লোগো, এমনকি চিকিৎসকদের স্বাক্ষরও অত্যন্ত নিখুঁতভাবে নকল করা হচ্ছে, যা দেখে সাধারণ মানুষের পক্ষে আসল-নকল পার্থক্য বোঝা অসম্ভব।

৬ এপ্রিল বিকেলে যশোর জেনারেল হাসপাতালের পুরুষ মেডিসিন ওয়ার্ডে ভর্তি হন এক রোগী। চিকিৎসক বিভিন্ন পরীক্ষা-নিরীক্ষা দিতে বললে, ওয়ার্ডে থাকা সেচ্ছাসেবকরা বাইরের দালালদের ডেকে এনে রোগীর নমুনা সংগ্রহ করেন। কিন্তু কোনো ল্যাবে পরীক্ষা না করেই রোগীর কাছ থেকে টাকা নিয়ে রাতে একটি রিপোর্ট ধরিয়ে দেয়া হয়। সেদিন রাতেই রোগীর মৃত্যু হলে সন্দেহ তৈরি হয় স্বজনদের মধ্যে। পরবর্তীতে রোগীর স্বজনরা কুইন্স হাসপাতালে গেলে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ জানান, রিপোর্টটি সম্পূর্ণ ভুয়া। তাদের প্যাড, এমনকি চিকিৎসকের স্বাক্ষরও জাল করা হয়েছে।

আর এই কাজটি যশোর জেনারেল হাসপাতালের ভয়ঙ্কর একটি প্রতারক সিন্ডিকেটের। যারা পরীক্ষা-নিরীক্ষা ছাড়াই রোগীদের হাতে ধরিয়ে দিচ্ছে ভুয়া রিপোর্ট! আর এই চক্রের সাথে সরাসরি জড়িত হাসপাতালের ওয়ার্ডে দায়িত্বরত কিছু সেচ্ছাসেবক। এরপর ৭ এপ্রিল কুইন্স হাসপাতালের একটি প্রতিনিধি দল যশোর জেনারেল হাসপাপাতালের ওয়ার্ডে গিয়ে আরও বেশ কয়েকজন রোগীর কাছ থেকে একই ধরনের জাল রিপোর্ট উদ্ধার করেন।

তথ্য মিলেছে, রোগী ও অভিভাবকদের প্রতারণার জালে ফাঁসাতেই ওই চক্রের সদস্যরা নিয়মিতভাবে হাসপাতালের ওয়ার্ডে অবস্থান করে। সেচ্ছাসেবকের পরিচয়ে তারা রোগী ও স্বজনদের সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপন করে এবং বিভিন্ন পরীক্ষার কথা বলে বাইরে থেকে নমুনা সংগ্রহের প্রস্তাব দেয়। পরে কোনো পরীক্ষা ছাড়াই অতি গোপনে আশেপাশের কোনো কম্পিউটার দোকান ও অখ্যাত গোপন ল্যাব থেকে জাল রিপোর্ট প্রিন্ট করে তা রোগীদের হাতে তুলে দেয়। এ ঘটনায় হাসপাতালের কথিত সেচ্ছাসেবক লিটন দাস, নাজমুল ইসলাম এবং দালাল রোহানের নাম উঠে এসেছে জোরেসোরে। নেপথ্যে রয়েছে আরো কয়েকজন। যদিও অভিযুক্ত ওই চক্রটির প্রত্যেকেই অভিযোগ অস্বীকার করেছেন এবং নিজেদের নির্দোষ দাবি করেছেন।

তবে ভুক্তভোগীদের মধ্যে বাঘারপাড়া উপজেলার চাড়াভিটা গ্রামের ইব্রাহীম জানিছেন, তিনি শ্বাসকষ্ট নিয়ে ৫ এপ্রিল পুরুষ মেডিসিন ওয়ার্ডে ভর্তি হন। চিকিৎসক তাকে বেশ কিছু পরীক্ষা-নিরীক্ষা দিতে বললে দায়িত্বরত সেচ্ছাসেবকরা এক দালালের মাধ্যমে তার কাছ থেকে ১ হাজার ৬শ’ টাকা নিয়ে বিভিন্ন পরীক্ষার রিপোর্ট দেন। কিন্তু পরে তিনি জানতে পারেন, তিনি প্রতারণার শিকার হয়েছেন। ভূয়া রিপোর্ট প্রদান করে চক্রটি। ধরা পড়ার পর দালাল চক্রের সদস্যরা তার ফোন রিসিভ করছেন না। আর সেচ্ছাসেবকরা বিষয়টি অস্বীকার করছেন।

সদর উপজেলার চুড়ামনকাটি ইউনিয়নের বাগডাঙ্গা গ্রামের সাইফুল ইসলাম জানিয়েছেন, তিনি দুই দিন আগে হাসপাতালে ভর্তি হন। রোহান নামে এক দালাল কুইন্স হাসপাতালের কথা বলে তার কাছ থেকে ১ হাজার ২শ’ টাকা নিয়ে পরীক্ষা করান। পরে তিনি জানতে পারেন রিপোর্টটি একবারেই ভুয়া। কুইন্স হাসপাতালে ওরা যায়ইনি। নিজেরাই মনগড়া রিপোর্ট প্রিন্ট দিয়ে দিয়েছে।

তিনি বলেন, তারা সাধারণ মানুষ কিভাবে বুঝবেন, কোনটা আসল আর কোনটা ভুয়া? হাসপাতালে দালালরা কিভাবে ঢোকে, যদি ভেতরের কারও সহযোগিতা না থাকে? এখন আবার নতুন করে পরীক্ষা করাতে হবে। সেই টাকা কে দেবে? এসব নানা প্রশ্ন তোলেন সাইফুলসহ আরো অনেকে। এদিকে, হাসপাতালের অপর একটি সূত্র জানিয়েছে, সংঘবদ্ধ ওই চক্রটি দীর্ঘদিন এভাবে প্রতারণা চালিয়ে আসছে। সেচ্ছাসেবকরা দালাল ডেকে এনে নমুনা সংগ্রহ করে এবং পরে কোনো পরীক্ষা ছাড়াই ভুয়া রিপোর্ট প্রিন্ট করে রোগীদের দেয়। আর মধ্যসত্বভোগী হয়ে যায় এক শ্রেণির কর্মচারী। অনেকেই ওই টাকার ভাগ পায় বলেই চক্রটি হাসপাতালে ঢুকে এ ধরণের লোমহর্ষক প্রতারণাগুলো করে যাচ্ছে।

কুইন্স হাসপাতালের আইটি ম্যানেজার হাসান ইমাম শিমুল জানান, বিষয়টি জানার পরই তারা হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ও সিভিল সার্জনের কাছে অভিযোগ করেছেন। একই সাথে থানায় একটি লিখিত অভিযোগ করা হয়েছে।

এদিকে ভয়ানক এসব ঘটনার ব্যাপারে হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ডাক্তার হুসাইন সাফায়েতের সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি জানিয়েছেন, বিষয়টি খুবই নিন্দিনীয়। জড়িতদের ব্যাপারে ব্যবস্থা নিতে বিষয়টি জেলা মাসিক আইনশৃংখলা কমিটির সভায় তোলা হবে। একইসাথে প্রাথমিকভাবে খোঁজখবর নিতে আরএমওকে দায়িত্ব দেয়া হয়েছে। অন্যায় করলে কাউকে ছাড় দেয়া হবে না।

তিনি বলেন, এ বিষয়ে তদন্ত কমিটি গঠন করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়া হবে।

আমাদের ইউটিউব চ্যানেল সাবস্ক্রাইব করুন

মন্তব্য করুন

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

১১ মিনিটের রুদ্ধশ্বাস নাটক, জাপানকে হারিয়ে শেষ ষোলোয় ব্রাজিল

কাসেমিরোর গোলে স্বস্তি, জাপানের বিপক্ষে সমতায় ফিরল ব্রাজিল

সেলেসাওদের স্তব্ধ করে জাপানের গোল, শুরুতেই পিছিয়ে পড়ল ব্রাজিল

যশোরে জাতীয় পার্টির নবগঠিত কমিটির পরিচিতি সভা অনুষ্ঠিত 

শার্শার বসতপুরে অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে তৈরি হচ্ছে বেকারি খাদ্য

ইনুর মামলার রায় কাল, সরাসরি দেখবে দেশবাসী

ডুমুরিয়ায় বিদ্যুৎস্পৃষ্টে যুবকের মৃত্যু

নেইমারকে ছাড়াই জাপানের বিপক্ষে নামছে ব্রাজিল

মুস্তাফা মনোয়ারের মৃত্যুতে জামায়াত আমিরের শোক

অর্থ বিল পাস, যেসব পরিবর্তন এলো 

এনবিআরের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান হলেন আহসান হাবিব

যশোরে মহাকবি মাইকেল মধুসূদন দত্তের মৃত্যুবার্ষিকী পালিত

যশোরে পাট পণ্যের ব্যবহার বৃদ্ধি বিষয়ক মতবিনিময় সভা

যশোরে আদ-দ্বীন হাসপাতালের প্রয়োজনীয়তা শীর্ষক সেমিনার  

যশোরে বিশ্ব শিশুশ্রম প্রতিরোধ দিবস পালিত

মহেশপুরে গাজীরননেছা বালিকা বিদ্যালয়ে বৃক্ষরোপণ কর্মসূচি উপলক্ষে র‌্যালি ও আলোচনা সভা

মোরেলগঞ্জে ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক কৃষকদের মাঝে নারিকেল চারা ও কৃষি প্রণোদনা বিতরণ

শৈলকুপায় পাঁচ দিনের ব্যবধানে দুই কিশোরের মৃত্যু

সুনামগঞ্জ পৌরসভায় ৫৪ কোটি ১৫ লাখ টাকার বাজেট ঘোষণা

মণিরামপুরে সেতুর কাজ থমকে, দুর্ভোগে ২০ গ্রাম

X