
দেশে জ্বালানি তেলের কোনো ঘাটতি নেই, সংকট কেটে গেছে উল্লেখ করে জ্বালানি ও খনিজসম্পদ মন্ত্রণালয়ের পক্ষে দফায় দফায় বলা হলেও কার্যত দেশের বাজারে জ্বালানি তেলের সংকট এখনও কাটেনি। স্বাধীনতা ও জাতীয় দিবস উপলক্ষে ছুটির দিনেও ফিলিং স্টেশনগুলোতে সরবরাহ ঘাটতি দেখা গেছে স্পষ্টভাবে। এরপরও গত কয়েকদিন এবং গতকাল ভয়াবহ সংকট চোখে পড়েছে।
২৮ মার্চ যশোরাঞ্চলের পাম্পগুলোতে যানবাহনের মালিক ও চালককে ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়ে থাকতে হয়েছে। গতকালও এ অঞ্চলের অনেকগুলো পাম্পে তেল বিক্রি বন্ধ রাখা হয়েছে। তবে গ্রামাঞ্চলে অবৈধভাবে বিভিন্ন দোকানে ৩শ' টাকা লিটার তেল বিক্রি হতে দেখা গেছে। গতকাল দিনভর অধিকাংশ পাম্প থেকে মেলেনি কাঙ্খিত পরিমাণে জ্বালানি তেল। তেল নেই, এমন সাইনবোর্ড ঝুলানো ছিল কয়েকটি পাম্পে। ফলে যশোরের বাহন সংশ্লিষ্ট মানুষ ও বাইকারদের হন্যে হয়ে জ্বালানি সংগ্রহ করতে এক পাম্প থেকে অন্য পাম্পে ছুটতে দেখা গেছে। বিপাকে পড়ছেন ব্যক্তিগত গাড়ি চালক ও মোটরসাইকেল চালকরাও। যদিও জ্বালানি ও খনিজসম্পদ মন্ত্রণালয় ও যশোর জেলা জ্বালানি তেল পরিবেশক সমিতির দাবি, তেল সংকট নেই। এখন মজুদ করার প্রস্তুতি চলছে। মধ্যপ্রাচ্যে সংকটে দেশে তেল সরবরাহে যে ছন্দপতন ঘটেছে তা উত্তরণের পথে।
২৮ মার্চ রোববার সকাল থেকে শহরের বিভিন্ন পেট্রোল পাম্পে গেলে দেখা গেছে অকটেন নেই, পেট্রোল নেই। তবে ডিজেল আছে। এমনকি চলমান পেক্ষাপটে নির্ধারিত পরিমাণ মেলেনি গতকালও। এ নিয়ে ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছেন বাস মালিক সমিতির নেতৃবৃন্দ। সাধারণ চালকদের অনেকে উৎকণ্ঠা প্রকাশ করেছেন কাঙ্খিত তেল না পেয়ে। যশোরাঞ্চলের বিভিন্ন রুটে যানবাহন চলাচল ব্যাহত হচ্ছে বিগত তিন সপ্তাহ জুড়ে। যশোরের পাম্প কর্তৃপক্ষের দাবি, তারা খুলনার ডিপোতে চাহিদা দিয়েও নির্ধারিত তেল পাচ্ছেন না। বিগত সময়ের চেয়ে অর্ধেকেরও কম সরবরাহ করা হচ্ছে। যে কারণে পাম্পে তেল নেই বলে সাইনবোর্ড ঝুলিয়ে দিতে হচ্ছে।
গতকাল যশোর শহর ও শহরতলীর যে পাম্পগুলোতে তেল সরবরাহ করা হয়েছে সেখানে ব্যক্তিগত গাড়ির দীর্ঘ সারি দেখা গেছে। কোথাও কোথাও এই লাইন সড়কের মূল অংশ পর্যন্ত বিস্তৃত হয়ে যানজটও সৃষ্টি করেছে। চালকদের অনেককে রাস্তার মধ্যেই দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে দেখা গেছে। আগের কয়েক দিনের তুলনায় গতকাল লাইনের দৈর্ঘ্য বেশি ছিল। চালকদের অভিযোগ, দীর্ঘক্ষণ লাইনে দাঁড়িয়ে থেকেও প্রয়োজনমতো জ্বালানি পাওয়া যাচ্ছে না। এতে কর্মঘণ্টা নষ্ট হচ্ছে। ১ লিটার করে তেল দেয়া হছে। যশোর মাগুরা সড়কের মনোহরপুরের সিদ্দিক ফিলিং স্টেশনে গিয়ে এর সত্যতা মেলে। দেখা যায় লম্বা লাইন। আর মোটরসাইকেল প্রতি দেয়া হচ্ছে মাত্র ১শ' টাকার করে তেল। তাও আবার সকাল ৯ টায় বিক্রি শেষ। ব্যবস্থাপক কামরুজ্জামান জানিয়েছেন, সরবরাহ খুবই কম। ভোর থেকে সকাল ৯টা পর্যন্ত দেয়া হয়েছে। অকটেন প্রেট্রোল। তবে এখন চাইলে ডিজেল দেয়া যাবে।
এছাড়া সকাল সাড়ে ৮ টার দিকে যশোর-মাগুরা সড়কের হাশিমপুরের আকবর ফিলিং স্টেশনে গেলে দেখ যায় মোটরসাইকেল চালকদের দীর্ঘ লাইন। তেলের জন্য যেনো হা হুতাশ। এদিকে পাম্প কর্তৃপক্ষ বলছেন, তেল আছে কিন্তু মেশিন নষ্ট। তেল পরিমাপ মেশিনের কভার খুলে যন্ত্রপাতি বের করে রেখেছেন কর্তৃপক্ষ। এ ঘটনায় কেউ বলছিলেন, এটা নাটক সাজানো হয়েছে চালকদের ফিরিয়ে দেয়ার জন্য। এরপর ঘন্টা খানেক অপেক্ষা করে করে অনেকে ফিরে যান। যদিও দুপরের দিকে তেল সরবরাহ করতে দেখা গেছে ওই আকবর পাম্প থেকে।
বিকেলে যশোর শহরের গাড়িখানার তোফাজ্জেল পাম্পে দেখা যায় এযাবৎকালের দীর্ঘ লাইন। পুলিশ প্লাজা মার্কেটের সামনে থেকে শুরু করে পাম্প পর্যন্ত কয়েক সারির লাইন। এ যেনো তেল নেয়ার যুদ্ধ। মোটর সাইকেল চালক নিউ মার্কেটের বি ব্লকের আবিদুর রহমান জানিয়েছেন, তাকে দুশো টাকার তেল দেয়া হয়েছে। টাকা হাতে নিয়ে ঘন্টা খানেক লম্বা লাইনে দাঁড়িয়ে তেল পাওয়া গেছে।
শহরের আরএন রোডের যাত্রিক পেট্রোলিয়াম সার্ভিস স্টেশন, চয়নিকা পেট্রোল পাম্পের একই অবস্থা বলে জানিয়েছেন তেল গ্রহিতারা। চালকদের দাবি, যশোরাঞ্চলের পাম্পগুলোতে রেশনিং পদ্ধতি তুলে নেয়ার কোনো প্রভাব পড়েনি। বিগত কয়েকদিনের মতই চলছে সরবরাহ। সব ধরনের যানবাহনের জন্য তেল কেনায় আর কোনো নির্দিষ্ট সীমা বা বাধ্যবাধকতা থাকবে না বলে জ্বালানি ও খনিজসম্পদ মন্ত্রণালয় থেকে ঘোষণা দেয়া হলেও এর একটুও ইতিবাচক প্রভাব পড়েনি গতকাল যশোরের পাম্পগুলোতে।
তবে পাম্প-সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, ডিপো থেকে যে পরিমাণ জ্বালানি সরবরাহ করা হচ্ছে, তা চাহিদার তুলনায় কয়েক গুন কম। পাশাপাশি সম্ভাব্য মূল্যবৃদ্ধি কিংবা ভবিষ্যতে আরও সংকটের আশঙ্কায় অনেক চালক প্রয়োজনের অতিরিক্ত জ্বালানি সংগ্রহের চেষ্টা করছেন। যা সংকটকে আরও তিব্র করে তুলছে। এ অবস্থায় দ্রুত সরবরাহ স্বাভাবিক না হলে জনভোগান্তি আরও বাড়বে বলে আশঙ্কা করছেন তারা। বাস মালিক বাবু হালদার ক্ষোভ প্রকাশ করে জানান, চাহিদামত বা ট্রাকের ডিজেল সরবরাহ করতে পারছে না পাম্পগুলো। তেল নেই সাইবোর্ড ঝুলিয়ে দায় সারা হচ্ছে। এদিকে অনেক গাড়ি ট্রিপ খাটতে পারছে না। অনেক চালক বসে আছেন। বিভিন্ন রুটে যানবাহন চলাচল ব্যহত হচ্ছে। কোনো কোনো পাম্প থেকে ৫ থেকে ১০ লিটার তেল দেয়া হচ্ছে। দ্রুত পরিস্থিতি উত্তরণ দাবি করেছেন তিনি।
গ্রামাঞ্চলে বিভিন্ন বাজারের দোকানে গোপনে বেশি দামে পাওয়া যাচ্ছে অকটেন পেট্রোল। এ প্রতিবেদক নিজে যশোরের বাঘারপাড়ার পল্লীর চতুরবাড়িয়া বাজারের টাওয়ারের পাশের এক চা দোকানীকে ৩শ' টাকা লিটার তেলের দাম চাইতে শুনেছেন এবং তিনি নিজেও কিনতে চাইলে তার কাছে ৩শ' টাকা লিটার চাওয়া হয়েছে।
বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের (বিপিসি) পক্ষে জানানো হয়েছে, ১০ হাজার টন ডিজেল ও ২০ হাজার টন জেট ফুয়েল নিয়ে দেশে পৌঁছেছে একটি জাহাজ। চীনের একটি প্রতিষ্ঠান ইউনিপেক চুক্তি অনুযায়ী এমটি গ্রান কুস্থ নামের জাহাজে এই জ্বালানি নিয়ে এসেছে। সাম্প্রতিক উত্তপ্তকর বিশ্বপরিস্থিতির কারণে জ্বালানির সরবরাহ সূচিতে নানা অনিশ্চয়তা দেখা দিলেও নতুন এ চালান আসায় খানিকটা স্বস্তি আসবে।
এদিকে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত সারাদেশে জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধি নিয়ে চলমান উদ্বেগে বিষয়ে জানিয়েছেন, বিশ্ববাজারের অস্থিরতা সত্ত্বেও বাংলাদেশে এই মুহূর্তে জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানোর কোনো পরিকল্পনা সরকারের নেই। বর্তমানে দেশে তেলের চাহিদা বাড়লেও সরকার আগামি এপ্রিল পর্যন্ত সরবরাহ নিশ্চিত করেছে। এমনকি আপৎকালীন সময়ের জন্য ৯০ দিনের জ্বালানি মজুদ রাখা হচ্ছে।
তিনি আরও বলেন, জনগণের দুর্ভোগ কমাতে সরকার প্রতিদিন জ্বালানি তেলে ১৬৭কোটি টাকা ভর্তুকি দিচ্ছে। অথচ বিশ্বের অন্তত ৮০টি দেশ জ্বালানি তেলের মূল্য বৃদ্ধি করেছে। তেলের দাম বাড়লে খাবার, বিদ্যুৎ ও নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসের দাম বাড়বে। এতে সাধারণ মানুষের জন্য কষ্টকর হবে। তাই চারদিক থেকে চাপ থাকলেও জনগণের স্বার্থে সরকার প্রতিদিনই ভর্তুকি দিচ্ছে।
মন্তব্য করুন