মঙ্গলবার
০৯ জুন ২০২৬, ২৬ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
মঙ্গলবার, ০৯ জুন ২০২৬, ২৬ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩
প্রতিবন্ধীদের অধিকারবঞ্চনার গল্প-০২

কেতাবেই বন্দি আইন ও সুযোগ

স্বপ্না দেবনাথ
প্রকাশ : ০১ ডিসেম্বর ২০২৫, ১২:৩৪ এএম

২০১৩ সালের প্রতিবন্ধী ব্যক্তির অধিকার ও সুরক্ষা আইনে তাদের অধিকার কী তা সুস্পষ্ট করা হয়েছে । তবে এসবের কোনোটিই পুরোপুরি বাস্তবায়ন হচ্ছে না বলে অভিযোগ প্রতিবন্ধী এবং তাদের নিয়ে কাজকরা সংস্থাগুলোর। এ আইনটিতে প্রতিবন্ধীদের অধিকার, সুরক্ষা ও সব ধরনের সুবিধার বিষয়টি স্পষ্টভাবে উল্লেখ থাকলেও বাস্তবে তার প্রতিফলন নেই বললেই চলে। আলোর নিচেই অন্ধকার! প্রতিবন্ধীদের জন্য অন্যতম প্রধান একটি সরকারি প্রতিষ্ঠান প্রতিবন্ধী সেবা ও সাহায্যকেন্দ্র। এ প্রতিষ্ঠানটির প্রধান কাজ হলো প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের জন্য বিভিন্ন ধরনের সহায়তা ও সেবা প্রদান করা। যার মধ্যে রয়েছে চিকিৎসা, প্রশিক্ষণ, পুনর্বাসন এবং সামাজিক ক্ষমতায়ন। যে হেতু এ কেন্দ্রগুলো প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের জীবনযাত্রার মান উন্নয়ন, তাদের স্বাবলম্বী করা এবং সমাজে অন্তর্ভুক্তিমূলক অংশগ্রহণের সুযোগ তৈরি করতে কাজ করে প্রতিবন্ধী ব্যক্তি এবং তাদের পরিবারের সদস্যদের জন্য এ অফিস হতে হবে অনন্য। সর্বাগ্রে দরকার অবকাঠামোগত সহজ প্রবেশগম্যতা । কিন্তু যশোরের প্রতিবন্ধী সেবা ও সাহায্যকেন্দ্র প্রতিবন্ধী বান্ধব নয়! বহুতল এ ভবনে র‌্যাম্প, হুইলচেয়ার-বান্ধব প্রবেশপথ, ব্রেইল নির্দেশনা, বা নিরাপদ লিফট সুবিধার কোনোটিই নেই। দেশের সরকারি ও বেসরকারি সেবাপ্রাপ্তির ক্ষেত্রে প্রতিবন্ধীদের জন্য সমান অধিকার নিশ্চিত করার কথা বহুবার বিভিন্ন নীতি ও আইনে উল্লেখ থাকলেও বাস্তবচিত্র এখনো আশাব্যঞ্জক নয়। বিশেষ করে অবকাঠামোগত ব্যবস্থায় স্পষ্টভাবে দেখা যায় বড় ধরনের ঘাটতি। আর এ ঘাটতি রয়েছে যশোরেও। যশোর জেনারেল হাসপাতালের ভিতরে র‌্যাম্প প্রবেশপথ থাকলেও অন্তত স্বস্তিতে প্রবেশের জন্য নেই বহির্বিভাগের প্রতিবন্ধী বান্ধব কোনো ব্যবস্থা। একই অবস্থা জেলা প্রশাসকের কার্যালয়েও। এমনকি প্রতিবন্ধী ব্যক্তির অধিকার ও সুরক্ষা সংক্রান্ত জেলা কমিটিতে পদাধিকার বলে যুক্ত থাকা কোনো কর্মকর্তার কার্যালয়েও নেই এ ব্যবস্থা। যা প্রতিবন্ধীব্যক্তিদের দৈনন্দিন সেবা গ্রহণকে করছে কঠিন ও সীমিত। শুধুমাত্র অবকাঠামোগত সহজ প্রবেশগম্যতার অভাবে সরকারি অফিসে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র সংগ্রহ, ব্যাংকে লেনদেন, হাসপাতাল বা আদালতে যাওয়া এই মৌলিক সেবাগুলোও অনেক প্রতিবন্ধী মানুষের কাছে হয়ে ওঠে বড়ই কষ্টের। প্রতিনিয়ত সভা সেমিনার ও পরিকল্পনার টেবিলে প্রতিবন্ধী অধিকার বাস্তবায়নের কথা আলোচিত হলেও অন্তর্ভুক্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণের তাগিদ কোনো প্রতিষ্ঠানের মধ্যেই দেখা যায় না !

তিন-চতুর্থাংশ প্রতিবন্ধী শিশুর শিক্ষার পথ রুদ্ধ যশোরের বাঘারপাড়া উপজেলার রায়পুর ইউনিয়নের বাসিন্দা অভিজিৎ নাথ। বয়স যখন সাত তখন থেকেই তার চোখের আলো ক্ষীণ। বড় হওয়ার সাথে সাথে হারিয়েছেন দৃষ্টি শক্তি। অভিজিৎ জানান, তার পড়ালেখা শেখার আগ্রহ ছিল। তৃতীয় শ্রেণি পর্যন্ত পড়েছেন। কিন্তু চোখে দেখতে না পারায় আর এগোয়নি লেখাপড়া। কারণ তার জন্য উপযুক্ত ব্যবস্থা ছিলনা বিদ্যালয়ে। অভিজিৎয়ের মতো অসংখ্য শিশু যারা দৃষ্টি প্রতিবন্ধী তারা বঞ্চিত হচ্ছেন শিক্ষা গ্রহণের সুযোগ থেকে। প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোতে প্রতিবন্ধী বান্ধব সমন্বিত শিক্ষা কার্যক্রমের ব্যবস্থা চলমান, সংশ্লিষ্টরা এমন তথ্য দিলেও তা কতটা বাস্তবসম্মত এ নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যায়। শারীরিক প্রতিবন্ধী শিশুরা সমন্বিত এ ব্যবস্থায় টিকতে পারলেও অন্য প্রতিবন্ধিতার শিকার শিশুরা থেকে যাচ্ছে বাইরে। প্রতিবন্ধিতার ধরন অনুযায়ী অটিজম ও বুদ্ধিবৃত্তিক, শ্রবণ-দৃষ্টি, সেরিব্রাল পালসি ও বাকপ্রতিবন্ধীদের জন্য যে শিক্ষা ব্যবস্থা দরকার তা প্রায় নেই বললেই চলে। শহরে এ প্রতিবন্ধীদের জন্য বিশেষায়িত কিছু প্রতিষ্ঠান থাকলেও গ্রামীণ পর্যায়ে একেবারে শূন্য। কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের অবকাঠামো অনুপযোগী পূজা সাহা শারীরিক প্রতিবন্ধী। যশোর সিটি কলেজের এই শিক্ষার্থী এইচএসসি পাশ করতে পরলেও উচ্চ শিক্ষা শেষ করতে পারেননি। পূজা মনে করেন দেশের শিক্ষা ব্যবস্থা প্রতিবন্ধীদের জন্য উপযোগী নয়। বিশেষ করে উচ্চশিক্ষা অর্জনের ক্ষেত্রে প্রতিবন্ধকতা সবচেয়ে বেশি। কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের অবকাঠামো তাদের জন্য উপযোগী নয় উল্লেখ করে পূজা জানান, ক্লাস করতে বহুতল ভবনে উঠতে হয়েছে তার মায়ের কোলে চড়ে। শ্রেণিকক্ষে তার জন্য উপযোগী বেঞ্চও ছিল না। পূজার মতো প্রতিবন্ধকতাকে জয় করে এইচএসসির গণ্ডি পার করা আরও দুই শিক্ষার্থী মিনা খাতুন ও তহমিনা। যশোর মুক্তিযোদ্ধা কলেজের সাবেক এই শিক্ষার্থীদের অভিজ্ঞতাও পূজার মতোই। আকাশছোয়ার স্বপ্ন থাকলেও অনুপযোগী অবকাঠামোসহ মানসম্মত ব্যবস্থার অভাবের মতো বাধার পাহাড় ডিঙ্গিয়ে তারা সাফল্যের শিখরে পৌঁছাতে পারেনি। এটা আরও বেশি স্পষ্ট বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর জাতীয় প্রতিবন্ধী জরিপ ২০২১ এর তথ্যে। জরিপের তথ্য অনুসারে নানা প্রতিকূল পরিবেশের মধ্যে থেকে উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করা প্রতিবন্ধীদের হার ১০ শতাংশের কম। বাকি ৯০ শতাংশ উচ্চশিক্ষা গ্রহণের সুযোগ পাচ্ছে না। প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীদের জন্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর অবকাঠামোসহ ব্যবস্থাপনার অভাবই এর পিছনে কাজ করছে। দেশের ৫ থেকে ২৪ বছর বয়সী প্রতিবন্ধীদের মধ্যে মাত্র ৯ দশমিক ৫১ শতাংশ উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করতে পারছে বলে বিবিএসের জরিপে উঠে এসেছে। যদিও জরিপে উঠে এসেছে মাধ্যমিক পর্যায়ে শিক্ষা গ্রহণ করতে পারছে ৩৭ দশমিক ৪৭ শতাংশ প্রতিবন্ধী। আর প্রাথমিক শিক্ষার সুবিধা পাচ্ছে ৫৩ শতাংশ।

কর্মসংস্থানে তেমন সুযোগ মেলে না যশোর নওয়াপাড়া ইউনিয়নের ৪নং ওয়ার্ডের মারজিয়া এবং পৌরসভার পূর্ব বারান্দী পাড়ার বাসিন্দা স্মৃতি খাতুন। দুজনই সাধ্যমতো আত্মকর্মসংস্থানের চেষ্টা করে বর্তমানে মোটামুটি স্বাবলম্বী। ডাউন সিনড্রোমে আক্রান্ত মারজিয়াকে দেখে কথাই বলতে চাননা অনেকে, সেখানে তার জন্য কেউ কাজ দেবে এটা তার পরিবার ভাবতেও পারেনা। বর্তমানে ছাগল পালন করে অর্থের সংস্থান হচ্ছে তার। অন্যদিকে শারীরিক প্রতিবন্ধী স্মৃতি মায়ের সাথে করছেন জ্বালানী কাঠের ব্যবসা। এই মানুষগুলো সমাজে নিজেদের প্রচেষ্টায় কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করতে পারলেও এমন উদাহরণ খুবই কম। ভিক্ষাবৃত্তি ছাড়া তাদের উপায় থাকেনা বলে জানিয়েছেন শহরের একাধিক প্রতিবন্ধী ভিক্ষুক। শারীরিক প্রতিবন্ধী মাসুদ সর্দার জানিয়েছেন, তিনি অনিচ্ছা সত্ত্বেও শহরে ভিক্ষা করেন। কারণ লেখাপড়া জানলেও তাকে কেউ কাজ দেয় না। আর যে কাজ পাওয়া যায় তার পারিশ্রমিক দিয়ে দিনের খরচ মেটানো কষ্টকর। প্রতিবন্ধীদের কর্মসংস্থানের জন্য সরকারের আইন, নীতি ও কর্মসূচি রয়েছে। তবে এসব বাস্তবায়নে সরকারি সংস্থাগুলোর উদাসীনতা ও অবহেলার কারণে তাদের জন্য কর্মসংস্থান নিশ্চিত করা কঠিন হয়ে পড়ছে বলে দাবি উচ্চমাধ্যমিকের গন্ডি পেরোনো প্রতিবন্ধীদের। তারা জানান, দেশে কর্মসংস্থানের অভাব সবার জন্যেই প্রকট। তবে প্রতিবন্ধীদের জন্য তা আরও বেশি ভয়াবহ। বিবিএসের প্রতিবন্ধীদের নিয়ে সর্বশেষ জরিপের তথ্য অনুযায়ী, দেশে প্রতিবন্ধীদের ৬৬ শতাংশ কোনো কাজে যুক্ত হতে পারেনি। যারা কাজ পেয়েছে তাদের মধ্যে আবার শতকরা হিসেবে সরকারি বা স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানে কাজ করছে খুবই কম। মাত্র ২ দশমিক ৫০ শতাংশ প্রতিবন্ধী সরকারি কর্মক্ষেত্রে কাজ করছে। নিজেদের গৃহস্থালি বা পারিবারিক ব্যবসায় যুক্ত রয়েছে ১৮ দশমিক ১৪ শতাংশ প্রতিবন্ধী। বেসরকারি সংস্থায় কাজ করছে ১৬ দশমিক ৩৭ শতাংশ, বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থায় (এনজিও) কাজ করছে শূন্য দশমিক ৬৮, স্থানীয় সরকার অথবা সরকারের প্রকল্পে কাজ করছে শূন্য দশমিক ৬৩।

আমাদের ইউটিউব চ্যানেল সাবস্ক্রাইব করুন

মন্তব্য করুন

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

গেমসের ট্রায়াল দিতে ঢাকায় জিনাত

ঝিনাইদহে ছাত্রলীগের ২৪ জনের নামে মামলা, আটক ৩

নড়াইলে প্রভাব খাটিয়ে সরকারি গাছ কর্তনের অভিযোগ

বাংলাদেশকে ৫০ বিলিয়ন ইয়েন ঋণ দেবে জাপান

জাইমা রহমানকে নিয়ে আপত্তিকর পোস্ট, যুবক কারাগারে

হাম উপসর্গে আরও ৩ শিশুর মৃত্যু, আক্রান্ত হাজারের বেশি

ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণ ও তারুণ্য ধরে রাখবে কাঁকরোল

মণিরামপুরে ইমামুল হত্যাকাণ্ডে আটক হুসাইনের স্বীকারোক্তি

ঋণের প্রলোভনে টাকা আত্মসাত, মাহমুদাসহ তিনজনের বিরুদ্ধে মামলা

পাওনা টাকা চাওয়ায় ভাতিজার মারধরে বৃদ্ধ নিহত

সেবা নিতে এসে ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা সাধারণ মানুষের

মণিরামপুর পৌরসভার উন্মুক্ত বাজেট ঘোষণা

এস আলমের প্রভাবমুক্ত ইসলামী ব্যাংকের দাবিতে রাজশাহীতে মানববন্ধন

কেশবপুরে ভূমি সহকারীর বাড়িতে অজ্ঞান পার্টির হানা

একনেক সভায় ১০ উন্নয়ন প্রকল্পের অনুমোদন

জামায়াতের ৮.৩৯ লাখ কোটি টাকার ছায়া বাজেট প্রস্তাব

পুরুষ বন্ধুদের কাছ থেকে উপহার পেতে আনুশকার অস্বস্তি!

মণিরামপুরে নাতনীকে উত্যক্তের প্রতিবাদ করায় নানাকে কুপিয়ে হত্যা, আটক-১

তথ্য উপদেষ্টা / স্থানীয় সরকার নির্বাচন হবে নির্দলীয়, থাকবে না দলীয় প্রতীক

যশোরসহ ২০ অঞ্চলে ঝড়ের সম্ভাবনা

X