
প্রতিবন্ধী ব্যক্তিরা আমাদের সমাজের অংশ। শারীরিক, বুদ্ধিভিত্তিক বা অন্যান্য ভিন্নধর্মী সীমাবদ্ধতার কারণে তারা এখনো সমাজের মূলস্রোতধারার বাইরে। তাদের ‘স্বাভাবিক জীবনযাপন নিশ্চিতে’ সরকারসহ সংশ্লিষ্ট নানা সংগঠন ও প্রতিষ্ঠান কাজ করছে। প্রতিবন্ধী ব্যক্তির অধিকার ও সুরক্ষা আইন প্রণীত হয়েছে একযুগেরও বেশি সময় আগে। কিন্তু এ আইন বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে এখনও রয়েছে শূন্যতা। কাগজে-কলমে সমানঅধিকার, সামাজিক অন্তর্ভুক্তি ও রাষ্ট্রীয় সুরক্ষার কথা বলা হলেও বাস্তব জীবনচিত্র ভিন্ন। সমাজে, এমনকি পরিবারেও অবহেলা, অনাদর, উপেক্ষা ও সুযোগের অভাবে সংগ্রাম করতে হয় প্রতিবন্ধী নাগরিকদের। শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা, কর্মসংস্থান, ভাতা, চলাচলের সুবিধা সব ক্ষেত্রেই রয়েছে বাধা ও বঞ্চনার দীর্ঘ তালিকা। গ্রামের কাগজ প্রচেষ্টা চালিয়েছে প্রতিবন্ধীদের অধিকার বাস্তবায়নের বর্তমান চিত্র অনুসন্ধানের পাশাপাশি তারা কী পাচ্ছেন, কী পাচ্ছেন না। পরিবার, সমাজ, স্কুল-কলেজ, কর্মক্ষেত্রে তাদের অবস্থান। নীতিনির্ধারক, সেবাসংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান ও মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তাদের ভাবনা এবং উন্নয়নের পথে তাদের চাওয়া-পাওয়ার বাস্তব অভিজ্ঞতা জানার। ধারাবাহিক প্রতিবেদনে উন্নয়নের অন্তরালে থেকে যাওয়া এ মানুষের কথা তুলে ধরা হবে। প্রতিবন্ধীর সংজ্ঞা বাংলাদেশ প্রতিবন্ধী কল্যাণ আইন ২০০১ অনুযায়ী জন্মগতভাবে, রোগাক্রান্ত হয়ে, দুর্ঘটনায় আহত হয়ে, অপচিকিৎসা বা অন্য কোনো কারণে দৈহিকভাবে বিকলাঙ্গ কিংবা মানসিকভাবে ভারসাম্যহীন ব্যক্তিকে প্রতিবন্ধী বলা হয়েছে। অর্থাৎ স্থায়ীভাবে আংশিক বা সম্পূর্ণ কর্মক্ষমতাহীন এবং স্বাভাবিক জীবনযাপনে অক্ষম ব্যক্তিরাই প্রতিবন্ধী। এছাড়া ২০১৩ সালের প্রতিবন্ধী ব্যক্তির অধিকার ও সুরক্ষা আইনে মোট ১২ ধরনের প্রতিবন্ধিতার কথা বলা হয়েছে। এগুলো হচ্ছে অটিজম বা অটিজমস্পেকট্রাম ডিজঅর্ডারস, শারীরিক, মানসিক অসুস্থতাজনিত, দৃষ্টি, বাক, বুদ্ধি, শ্রবণ, শ্রবণ-দৃষ্টি, সেরিব্রাল পালসি, ডাউন সিনড্রোম, বহুমাত্রিক ও অন্যান্য প্রতিবন্ধিতা। যশোরে প্রতিবন্ধীর সংখ্যা যশোর জেলায় কতজন প্রতিবন্ধী ব্যক্তি আছেন, তাদের প্রতিবন্ধিতার ধরন কি, কে কোন লিঙ্গের এ পরিসংখ্যান জানা যায়নি। একেক সরকারি অফিস একেক রকম পরিসংখ্যান দিয়েছে। তাও সে পরিসংখ্যান শুধুমাত্র সংখ্যার মধ্যেই সীমাবদ্ধ। যদিও টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (এসডিজি) অর্জনে প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের সঠিক পরিসংখ্যান থাকা জরুরী। সমাজসেবা কার্যালয় থেকে প্রাপ্ত তথ্য অনুসারে জেলার আটটি উপজেলায় মোট অস্বচ্ছল প্রতিবন্ধী ভাতা প্রাপ্ত মানুষের সংখ্যা ৬৯ হাজার সাতশ’৫৮ জন। এরমধ্যে নিয়মিত ভাতা পান ৬০ হাজার পাঁচশ’৬১ জন। আর অতিরিক্ত ভাতাপ্রাপ্তের সংখ্যা নয় হাজার একশ’ ৯৭ জন। একই ব্যক্তি প্রতিবন্ধীভাতার সাথে সাথে অতিরিক্ত ভাতা পাচ্ছেন কিনা সে বিষয়েও কোনো ধারণা দিতে পারেনি সমাজসেবা কার্যালয় কর্তৃপক্ষ। এদিকে জেলা পরিসংখ্যান অফিস ২০২২ সালের জনশুমারি ও গৃহগণনা অনুসারে তথ্য দিয়েছে, যশোর জেলায় প্রতিবন্ধীর সংখ্যা ৪৫ হাজার তিনশ’ ৯৮ জন। ঘরের ভিতরে লুকানো বাস্তবতা যশোর বারান্দীপাড়ার বহ্নি ( ছদ্মনাম) যেদিন এই পৃথিবীতে এলো, সেদিন ওর বাবা-মাসহ পুরো পরিবার এমনকি এলাকাতেও বয়ে যায় আনন্দের বন্যা। বিয়ের বিশ বছরেরও বেশি সময় পর সংসারে নতুন অতিথির আগমনে বহ্নির মা বাবা ছিল অনেক খুশি। মেয়ে বড় হওয়ার সাথে সাথে বোঝা যায় সে অটিজমস্পেকট্রাম ডিজঅর্ডারে আক্রান্ত। বাবার মৃত্যু হয়েছে দশ বছর। প্রাথমিক স্কুলের গন্ডি পেরিয়ে মাধ্যমিকে যাওয়ার পর বহ্নির মা তাকে এক প্রকার ঘরবন্দী করে রেখেছেন। যে সন্তানের আগমনে একদিন মহাসমারোহে হয়েছে অনুষ্ঠান তাকে এখন লুকিয়ে রাখা হয়। প্রতিবন্ধী নাগরিক পরিচয়ে তার সরকারি ভাতাসহ শিক্ষা ও কর্মসংস্থানে পাওয়ার কথা বাড়তি সুযোগ। কিন্তু পরিবারের অনাগ্রহ আর অবহেলায় সে এখন স্বাভাবিক জীবন যাপনের সুযোগ বঞ্চিত। শুধু বহ্নির পরিবার নয় যশোরে এমন অসংখ্য পরিবার রয়েছে তাদের প্রতিবন্ধী সন্তানদের পরিচয় ‘লুকিয়ে’ রাখছেন। তুলনামূলক শিক্ষিত ও সামাজিকভাবে প্রতিষ্ঠিত পরিবারের মধ্যে এ প্রবণতা বেশি বলে অনুসন্ধানে উঠে এসেছে। যদিও অনেক মা বাবা দাবি করেন, তার সন্তানকে প্রতিবন্ধী পরিচয়ে বড় করতে চান না। তবে প্রতিবন্ধী সন্তানটিকে স্বাভাবিকভাবে বড় করে তোলার প্রচেষ্টার অংশ হিসেবে তাকে স্কুল ভর্তি, প্রয়োজনীয় থেরাপি ও সমাজে সক্রিয় অংশগ্রহণে উৎসাহদানমূলক কর্মকান্ড তেমন চোখে পড়ছে না।
মন্তব্য করুন