বুধবার
০১ জুলাই ২০২৬, ১৭ আষাঢ় ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
বুধবার, ০১ জুলাই ২০২৬, ১৭ আষাঢ় ১৪৩৩

মঞ্চ কাপানো যাত্রা শিল্পী পরিমলের খবর রাখেনা কেউ

এস আর এ হান্নান, মহম্মদপুর
প্রকাশ : ১৪ জুন ২০২৬, ০৬:৫৫ এএম
মঞ্চ কাপানো যাত্রা শিল্পী পরিমলের মানবেতর জীবন

এক সময় আলো ঝলমলে মঞ্চে তাঁর উপস্থিতি মানেই ছিল দর্শকদের টানটান উত্তেজনা। কখনো ‘শ্রীকৃষ্ণ শকুনি’ পালার সহোদেব, কখনো ‘নবাব সিরাজউদ্দৌলা’র মিরন কিংবা মীরজাফরের দোসর, আবার কখনো ‘কারবালার কান্না’-এর নিষ্ঠুর খলনায়ক। তাঁর নিখুঁত ও জীবন্ত অভিনয় দেখে ক্ষুব্ধ দর্শকেরা সত্যি সত্যি ভেবে বসতেন; এই লোকটাই সব নষ্টের মূল। ক্ষোভে-আক্রোশে মঞ্চে ছুড়ে মারতেন ঢিল, জুতা-স্যান্ডেল। আর তাতেই তৃপ্তির হাসি হাসতেন মঞ্চের এক খাঁটি শিল্পী। ভাবতেন, দর্শককে তো চরিত্রের গভীরে ডোবাতে পেরেছেন। এটাই তো অভিনয়ের সার্থকতা।

সেই করতালি, সেই দর্শক আর আলো ঝলমলে মঞ্চ আজ অতীত। মাগুরার মহম্মদপুর উপজেলার কানাইনগর গ্রামের এক জরাজীর্ণ ঘরে এখন কাটে তাঁর নিঃসঙ্গ দিন। তিনি পরিমল কুমার বিশ্বাস। বয়স ৭১ বছর। এক কালের মঞ্চ কাঁপানো সেই দাপুটে খলনায়ক আজ জীবনের নিষ্ঠুর বাস্তবতার মুখোমুখি দাঁড়িয়ে এক অসহায় ‘পরাজিত নায়ক’।

১৯৫৫ সালের ১২ নভেম্বর মৃত: পঞ্চানন বিশ্বাসের ঘরে জন্ম নেয়া পরিমলের নাট্যজীবন শুরু হয়েছিল ১৯৭৪ সালে, মাত্র ১৯ বছর বয়সে। সেই টগবগে তরুণ বয়সে স্থানীয় আবু সরকার, সুলিল সরকার, বাসু তেওয়ারী, আলী রেজা খোকন, সিদ্দিক শিকদার, আতিয়ার শিকদার, আবুল হোসেনসহ অনেকের সাথেই মঞ্চে গান ও যাত্রাপালায় অভিনয় শুরু করেন পরিমল কুমার বিশ্বাস। তবে পেশাদার যাত্রাভিনেতা হিসেবে তাঁর আনুষ্ঠানিক অভিষেক ঘটে ১৯৭৫ সালে, গোপালগঞ্জের বিখ্যাত ‘নব দিপালী অপেরা’য় অডিশন দেয়ার মাধ্যমে। মাসে মাত্র ২০০ টাকা বেতনে শুরু হওয়া সেই যাত্রা আজও তাঁর জীবনের শ্রেষ্ঠ স্মৃতি।

এরপর আর পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি। এক দশক ধরে ফরিদপুরের ‘নিউ বাসন্তী অপেরা’, মানিকগঞ্জের ‘জোনাকী অপেরা’, যশোরের ‘গীতশ্রী অপেরা’ এবং চট্টগ্রামের ‘বাবুল অপেরা’র মতো দেশের নামী-দামি পাচ-সাতটি যাত্রাদলে দাপিয়ে বেড়িয়েছেন। ১৯৭৮ সালে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার ‘বাসন্তী অপেরা’র হয়ে ঢাকা শিল্পকলা একাডেমির মঞ্চে ‘মা, মাটি ও মানুষ’ যাত্রাপালায় তাঁর অভিনয় উচ্চ প্রশংসিত হয়েছিল। ‘সমাজ’, ‘গলি থেকে রাজপথ’, ‘হাসির হাটের কান্না’, ‘গঙ্গা থেকে বুড়িগঙ্গা’, ‘‘কাহিনূর’, ‘বীর বাঙালি’ ‘সোহরাব-রুস্তম’, ‘শ্রীকৃষ্ণ শকুনি’, ‘সাবিত্রি সত্যবান’, ‘কারবালার কান্না’, ‘অচল পয়সা’ এবং ‘নাবব সিরাজউদ্দৌলা’সহ অসংখ্য জনপ্রিয় পালায় খল চরিত্রে তাঁর অভিনয় শৈলী দর্শকদের হৃদয়ে দাগ কেটে আছে।

বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির উৎকর্ষে বিনোদন যখন মুঠোফোনে বন্দি হলো, তখন ধীরে ধীরে তলিয়ে গেল বাংলার হাজার বছরের ঐতিহ্যবাহী যাত্রাশিল্প। নিরুপায় হয়ে ১৯৮৫ সালে স্থায়ীভাবে গ্রামে ফিরে আসেন পরিমল কুমার বিশ^াস। ১৯৮৬ সালে স্থানীয় শিল্পীরা সমন্বিতভাবে বর্তমান সংস্কৃতি মন্ত্রী নিতাই রায় চৌধুরীর সহধর্মিণীর নামে ‘ঝুমুর অপেরা’ গঠন করে শিল্পকে বাঁচিয়ে রাখার শেষ চেষ্টা করেছিলেন। কিন্তু ভাগ্যের নির্মম পরিহাস, যাত্রাপালা আজ কোণঠাসা, আর শিল্পী সমাজ আজ অবহেলিত।

২০২৪ সালের শুরুর দিকে হঠাৎ এক স্ট্রোক পরিমল বিশ্বাসের জীবনের গতি চিরতরে থামিয়ে দেয়। শরীরের বাম পাশটা প্যারালাইজড বা অবশ হয়ে গেছে। যে পা দিয়ে এক সময় মঞ্চে উঠতেন, আজ সেই পায়ে ভর করে ঠিকমতো দাড়াতেই পারেন না। স্ত্রী মালতি বিশ্বাসের কাঁধে ভর দিয়ে কিংবা হাতের লাঠিতে ভর করে তাঁকে বাথরুম বা গোসলে যেতে হয়। ঘরের উঠোনে নামতে হলেও দরকার হয় অন্যের সাহায্য। অর্থের অভাবে থমকে গেছে তাঁর চিকিৎসা। দুই ছেলের মধ্যে বড় ছেলে পরিতোষ বিশ্বাস একটি বেসরকারি কোম্পানিতে অল্প বেতনে চাকরি করেন, আর ছোট ছেলে প্রশান্ত বিশ্বাস মাস্টার্স শেষ করে চাকরি না পেয়ে এখন অসুস্থ বাবার সেবায় দিন কাটাচ্ছেন।

বাংলার লোকসংস্কৃতির সোনালী দিনের এই জীবন্ত কিংবদন্তি কি এভাবেই বিনাচিকিৎসায় ধুঁকে ধুঁকে হারিয়ে যাবেন। রাষ্ট্রের কাছে, সংস্কৃতির ধারক-বাহকদের কাছে-আজ এই একটিই বড় প্রশ্ন।

পরিমল বিশ্বাস আক্ষেপের সুরে বলেন, “এক সময় আলো ঝলমলে মঞ্চে অভিনয় করে মানুষকে আনন্দ দিয়েছি, আজ আমি জরাজীর্ণ ঘরে অসহায় অবস্থায় দিন কাটাচ্ছি। কেউ আমার খোঁজ-খবর নেয় না।”

তাঁর স্ত্রী মালতি বিশ্বাস ও ছোট ছেলে প্রশান্ত বিশ্বাসের আকুল আবেদন; মাননীয় প্রধানমন্ত্রী এবং বর্তমান সংস্কৃতি মন্ত্রী নিতাই রায় চৌধুরী যেন এই প্রবীণ ও দরিদ্র শিল্পীর সুচিকিৎসা এবং জীবনধারণের জন্য আর্থিক সহায়তার হাত বাড়িয়ে দেন।

আমাদের ইউটিউব চ্যানেল সাবস্ক্রাইব করুন

মন্তব্য করুন

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

৪০ বছর পর বিশ্বকাপের নকআউটে জিতে শেষ ষোলোয় মেক্সিকো

আজ ১ জুলাই: / যেভাবে শুরু হয়েছিল জুলাই আন্দোলন থেকে গণঅভ্যুত্থানে

বিশ্বকাপের নকআউট ম্যাচসহ টিভিতে আজকের খেলার সুচি

কেন আল্লাহর কাছে গোপন ইবাদত সবচেয়ে প্রিয়?

ব্রাজিলের সামনে নরওয়ে: কেমন হবে লড়াই?

বয়স ধরে রাখতে চাইলে পান করুন আমলকীর রস

হালান্ড কি আসলেই মানুষ, নাকি গোলমেশিন ?

এমবাপের জোড়া গোলে সুইডেনকে উড়িয়ে শেষ ষোলোয় ফ্রান্স

এআই কি চাকরি কমাচ্ছে নাকি নতুন কর্মসংস্থান তৈরি করছে?

১ জুলাই: ইতিহাসের উল্লেখযোগ্য ঘটনাবলি

আগ্নেয়গিরি থেকে বছরে কোটি কোটি টাকার স্বর্ণ ছড়ায়

অযোধ্যার রাম মন্দিরে অনুদান তছরুপের অভিযোগ, দান কমাচ্ছেন ভক্তরা

আইভরিকোস্টকে বিদায় করে শেষ ষোলোয় নরওয়ে, প্রতিপক্ষ এবার ব্রাজিল

৮৬ মিনিটে হলান্ডের ম্যাজিক, এগিয়ে গেল নরওয়ে

দিয়ালোর জাদুকরী গোল / নরওয়ের বিপক্ষে আইভরিকোস্টের দুর্দান্ত প্রত্যাবর্তন

নুসার জাদুকরী গোল, বিরতির আগেই লিড নিল নরওয়ে

সবার সঙ্গে ঘটনাস্থলে যান মুয়াজ্জিন, অথচ তিনিই ছিলেন হত্যাকারী

ঝিনাইদহে তিন ফসলি জমিতে অটোরাইস মিল নির্মাণ বন্ধের দাবিতে মানববন্ধন

শৈলকুপায় প্রতিপক্ষের হামলায় আহত ভ্যানচালকের মৃত্যু

সুনামগঞ্জ মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল চালুর দাবিতে টানা আন্দোলন, দ্বিতীয় দিনে রোড ব্লক কর্মসূচি

X