
যুক্তরাষ্ট্রে উচ্চশিক্ষার জন্য যাওয়া দুই বাংলাদেশি শিক্ষার্থী জামিল আহমেদ লিমন ও নাহিদা সুলতানা বৃষ্টির মর্মান্তিক মৃত্যুর ঘটনায় শোকের ছায়া নেমে এসেছে দেশের বিশ্ববিদ্যালয় অঙ্গনে। খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী জামিল লিমনের ক্ষতবিক্ষত মরদেহ উদ্ধারের একদিন পর নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক শিক্ষার্থী নাহিদা সুলতানা বৃষ্টির মৃত্যুর খবরও নিশ্চিত হয়েছে। তদন্তকারীরা বলছেন, দুইজনই হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়েছেন।
গত ১৬ এপ্রিল থেকে নিখোঁজ ছিলেন যুক্তরাষ্ট্রের সাউথ ফ্লোরিডা বিশ্ববিদ্যালয়ের দুই বাংলাদেশি শিক্ষার্থী জামিল আহমেদ লিমন ও নাহিদা সুলতানা বৃষ্টি। জামিল লিমন ভূগোল, পরিবেশবিজ্ঞান ও নীতি বিষয়ে পিএইচডি করছিলেন। অন্যদিকে নাহিদা বৃষ্টি কেমিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগে স্নাতকোত্তর পর্যায়ে অধ্যয়নরত ছিলেন।
পুলিশ ও পরিবার সূত্রে জানা যায়, ১৬ এপ্রিল সকাল ৯টার দিকে ফ্লোরিডার ট্যাম্পায় নিজ বাসা থেকে সর্বশেষ দেখা যায় জামিল লিমনকে। একইদিন সকাল ১০টা থেকে দুপুর ১২টা ৩০ মিনিটের মধ্যে বিশ্ববিদ্যালয়ের ন্যাচারাল অ্যান্ড এনভায়রনমেন্টাল সায়েন্সেস ভবনে শেষবার দেখা যায় নাহিদা বৃষ্টিকে। এরপর থেকেই তাদের সঙ্গে আর কোনো যোগাযোগ হয়নি। বিকেল ৫টার দিকে নাহিদার মোবাইল ফোনও বন্ধ হয়ে যায়।
লিমনের নিখোঁজ হওয়ার ঘটনায় হিলসবরো কাউন্টি শেরিফ কার্যালয়ে সাধারণ ডায়েরি করা হয়। তদন্তের একপর্যায়ে শুক্রবার সকালে ট্যাম্পার হাওয়ার্ড ফ্র্যাঙ্কল্যান্ড ব্রিজ এলাকা থেকে মানবদেহের অবশিষ্টাংশ উদ্ধার করে পুলিশ। পরে তা জামিল আহমেদ লিমনের মরদেহ বলে শনাক্ত করা হয়।
এই ঘটনায় লিমনের সঙ্গে একই বাসায় থাকা রুমমেট ২৬ বছর বয়সী হিশাম সালেহ আবুঘারবিয়েহকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। হিলসবরো কাউন্টি শেরিফ অফিস জানায়, তার বিরুদ্ধে পারিবারিক সহিংসতা, মিথ্যা কারাবাস, প্রমাণ নষ্ট করা এবং মৃত্যুর তথ্য গোপনের অভিযোগ আনা হয়েছে। তদন্তকারীদের ধারণা, সে একাই এই হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছে।
শেরিফ অফিস জানায়, লেক ফরেস্ট উপবিভাগে পারিবারিক সহিংসতার একটি কল পেয়ে ডেপুটিরা ঘটনাস্থলে পৌঁছান। বাড়ি থেকে অন্যদের নিরাপদে বের করে আনা হলেও হিশাম বের হতে অস্বীকৃতি জানায়। পরে সোয়াট টিম মোতায়েন করা হলে সে আত্মসমর্পণ করে।
এদিকে নাহিদা সুলতানা বৃষ্টির খোঁজে অভিযান চালাতে গিয়ে সন্দেহভাজনের বাসার ভেতরে রক্তের মধ্যে পাওয়া মানবদেহের একটি অংশের ডিএনএ পরীক্ষায় তার সঙ্গে মিল পাওয়া যায়। শনিবার সকালে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নাহিদার ভাই জাহিদ হাসান প্রান্ত মৃত্যুর বিষয়টি নিশ্চিত করেন।
তিনি লেখেন, “আমার বোন আর আমাদের মাঝে নেই। ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন।”
তিনি আরও জানান, মার্কিন পুলিশ ফোন করে মৃত্যুর বিষয়টি নিশ্চিত করেছে। তবে নাহিদার শরীরের পূর্ণাঙ্গ অংশ উদ্ধার করা সম্ভব হবে কি না, সে বিষয়ে পুলিশ এখনো নিশ্চিত কিছু জানায়নি।
এর আগে নাহিদার ভাই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এক পোস্টে জানিয়েছিলেন, বৃহস্পতিবার দুপুর ১২টা ৩০ মিনিটের পর থেকে তার বোন নিখোঁজ ছিলেন। বিকেল ৫টার দিকে তার ফোন বন্ধ হয়ে যায়। তিনি সবাইকে গুজব ও যাচাইবিহীন তথ্য না ছড়ানোর অনুরোধ জানিয়েছিলেন।
ওয়াশিংটন ডিসিতে বাংলাদেশ দূতাবাসের প্রেস মিনিস্টার গোলাম মর্তুজা এক ফেসবুক পোস্টে জানান, সন্দেহভাজনকে জিজ্ঞাসাবাদের মাধ্যমে পুলিশ জামিল লিমনের মরদেহ উদ্ধার করেছে এবং নাহিদা বৃষ্টির বিষয়েও তদন্ত চলছিল। নাহিদা সুলতানা বৃষ্টি নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের অ্যাপ্লাইড কেমিস্ট্রি অ্যান্ড কেমিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের ১৩তম ব্যাচের শিক্ষার্থী ছিলেন। পরে তিনি যুক্তরাষ্ট্রে উচ্চশিক্ষার জন্য যান।
অন্যদিকে জামিল আহমেদ লিমন খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের নগর ও গ্রামীণ পরিকল্পনা (URP) বিভাগের ১৭তম ব্যাচের শিক্ষার্থী ছিলেন। উচ্চশিক্ষার স্বপ্ন নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রে গেলেও তার সেই যাত্রা শেষ হলো নির্মম মৃত্যুর মধ্য দিয়ে।
এক সপ্তাহের ব্যবধানে দুই মেধাবী বাংলাদেশি শিক্ষার্থীর এমন মর্মান্তিক মৃত্যু শুধু দুই পরিবারকেই নয়, দেশের শিক্ষা অঙ্গনকেও স্তব্ধ করে দিয়েছে। হত্যার প্রকৃত কারণ উদঘাটনে তদন্ত চালিয়ে যাচ্ছে মার্কিন প্রশাসন।
মন্তব্য করুন